টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রাশিফল ও মানব জীবনের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব বিশ্বাস করলে কী হবে?

islamনক্ষত্র ও গ্রহ সংক্রান্ত গণনা অর্থাৎ জ্যোতিষশাস্রের চর্চাকে পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতেরা সামগ্রিকভাবে ‘তানযীম’ বলে অভিহিত করেন। এ বিষয়ের উপর ইসলামী বিধানকে বিশেষভাবে কার্যকর করতে তারা তানযীমকে তিনটি ভাগে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন।

১। প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীরা এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, সমগ্র বিশ্ব যেহেতু জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রভাবে প্রভাবিত, তাই ভবিষ্যতে ঘটবে এমন সব ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা সম্ভব। (তাইসীর আল-আযীয আল-হামীদ, ৪৪১ পৃষ্ঠা)

এটা বিশ্বাস করা সর্বসম্মতিক্রমে বড় ধরণের কুফরী এবং ইব্রাহীম(আ) এর জাতির শিরকের ন্যায় শিরক।

২। দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীদের দাবী এ রকম যে, ‘আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করেছেন, জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থানের ভিন্নতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সংঘটিতব্ব্য জাগতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করবেন।’ (তাইসীর আল-আযীয আল-হামীদ, ৪৪২ পৃষ্ঠা)

জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর উপর আল্লাহর ক্ষমতা আরোপিত হয়েছে এবং এদের বিভিন্ন অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হওয়ার দাবীদারেরা ভবিষ্যৎ জ্ঞানের অধিকারী বলে প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে থাকে, অথচ ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এই ধরণের কাজ যারা করে তাদেরকেই বলা হয় জ্যোতিষী। যা গণকের একটা অংশ। এদের কাছে শয়তানের আঘমন ঘটে এবং শয়তান তাদেরকে তাদের কথামত খবর প্রদান করে এটা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ; তাছাড়া এটা আল্লাহর সাথে প্রকাশ্য কুফরী।

তবে অনেক সময় দেখা যায় যে, এসব গণকদের কিছু কথা সত্য হয়ে যায়! এটা কিভাবে হয়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুসজ্জিত করেছি আর শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য, এবং প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি…………।” (সূরা মুলকঃ৫)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করেছেন যে, পৃথিবীতে সংঘটিতব্ব্য ঘটনাবলী নিয়ে আলাপ-আলোচনারত ফিরিশতাদের কথাবার্তা মাঝে মাঝে জিনেরা নিচের আসমান পর্যন্ত ভ্রমণ করে আড়ি পেতে শ্রবণ করে পৃথিবীতে ফিরে এসে জ্যোতিষীদের অবগত করত। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, অধিকাংশ সময় আড়িপাতা বন্ধে বেশিরভাঘ জিনদের প্রতি আল্লাহ তা’আলা কক্ষচ্যুত নক্ষত্র (উল্কাপিণ্ড) ব্যবহার করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘গণকদের ভবিষ্যদ্বাণী কিছু সত্যের সঙ্গে শত শত মিথ্যার সংমিশ্রণ বৈ কিছুই নয়।’ (বুখারী ৬৫৭)
এসব জিনদের মধ্যে যারাই উল্কাপিণ্ডের হাত থেকে বেঁচে আসে তারা তাদের ঐ মানুষ গণকের কাছে মিথ্যা মিশিয়ে খবর দেয় আর তখন সেটা সেই গনক আপনাদেরকে বলে আর আপনারা সেই শত কথার মাঝে দুই একটা সঠিক কথাকে ভিত্তি করে সেই গণককে বিশ্বাস করেন আর টাকা দেন। আপনারা জেনে দেখবেন যে, যারাই এসব কথা বলে তাদের সাথে জিন থাকে। জিনদের মাধ্যমেই তারা এসব ধোঁকাবাজির ঈমান ধ্বংসকারী ব্যবসা করে থাকে। আসলে আপনারা টাকার বিনিময়ে আপনাদের ঈমান বিক্রি করে দেন। অতএব হে মুসলিম! এদের থেকে সাবধান। আল্লাহ তা’আলার উপরই ভরসা করুন।

৩। তৃতীয় ও শেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত সে সব বিষয় যা নক্ষত্রের বিভিন্ন অবস্থান ও এর গতিবিধির উপর ভিত্তি করা সম্পর্কিত। এর দ্বারা মুসলিমরা কেবলা নির্ধারণ করে থাকে, সময় নির্ধারণ করে,নাবিক বা মরুভূমির পথিকেরা তাদের দিক নির্ণয় এবং কৃষকেরা তাদের শস্য রোপণের সময় নির্ধারণ ইত্যাদি করে থাকে।

এই প্রকার জ্যোতির্বিদ্যার উলামায়ে কেরাম সম্মতি প্রদান করেছেন। ফলে উক্ত প্রকার জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও আলোচনায় কোন অসুবিধা নেই। কারণ এটি হালাল হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সহীহ হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা সেগুলোর সাহায্যে জলে স্থলে অন্ধকারে পথের দিশা লাভ করতে পার।” (সূরা আনআমঃ ৯৭)

ইমাম বুখারী রহঃ তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেছেন, কাতাদাহ রাহিঃ বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা এসব নক্ষত্ররাজিকে তিনটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, (১) আকাশের সৌন্দর্যের জন্য, (২) আঘাতের মাধ্যমে শয়তান বিতাড়নের জন্য এবং (৩) দিক ভ্রান্ত পথিকদের নির্দেশনা হিসেবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্য ছাড়া এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিবে সে ভুল করবে এবং তাঁর ভাগ্য নষ্ট করবে। আর এমন জটিলতায় সে পড়বে যে সম্পর্কে তাঁর কোন জ্ঞানই থাকবে না। নিশ্চয়ই এ কাজ যারা সম্পাদন করে তারা আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।

আমার কিছু বান্দা আমার উপর বিশ্বাসী হয়ে এবং কিছু বান্দা অবিশ্বাসী হয়ে ভোরে ওঠে। যারা বলে, আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি বিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে অবিশ্বাসী। আর যারা বলে, অমুক অমুক গ্রহের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাসী’

যায়েদ বিন খালিদ আল-জুহানী [রা.] হতে বর্ণিত আছে যে, হুদায়বিয়াতে এক রাতে আকাশে একটি চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। সেদিন রাসূলুল্লাহ [সা.] ফজর ছালাত শেষে লোকদের দিকে ফিরে বসেন এবং বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা কি তোমরা জান’? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত।

তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার কিছু বান্দা আমার উপর বিশ্বাসী হয়ে এবং কিছু বান্দা অবিশ্বাসী হয়ে ভোরে ওঠে। যারা বলে, আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি বিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে অবিশ্বাসী। আর যারা বলে, অমুক অমুক গ্রহের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাসী’। [বুখারী হা/৮৪৬; মিশকাত হা/৪৫৯৬]

গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা বিশ্বাস করা যেমন কুফরী, তেমনি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফলের আশ্রয় নেওয়াও কুফরী। যে ব্যক্তি রাশিফলের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের কথা বিশ্বাস করবে, সে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তকে রাশিফলের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে সেগুলি পাঠ করা শিরক। তবে বিশ্বাস না করে কেবল মানসিক সান্ত্বনা অর্জনের জন্য পড়লে তাতে শিরক হবে না বটে, কিন্তু সে গোনাহগার হবে।

কেননা শিরকী কোন কিছু পাঠ করে সান্ত্বনা লাভ করা বৈধ নয়। তাছাড়া শয়তান কর্তৃক তার মনে উক্ত বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে কতক্ষণ? তখন এ পড়াই তার শিরকের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘গণকের নিকটে কোন ব্যক্তি গমন করে যদি তাকে কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তাহলে ৪০ দিন ও ৪০ রাত পর্যন্ত তাঁর সলাত কবুল হবে না।’ (সহীহ মুসলিম)

‘যদি কেউ গণকের বা জ্যোতিষীর নিকট গমন করে তাঁর কথায় বিশ্বাস করল, তাহলে সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অবিশ্বাস করল।’ (সুনান আবু দাউদ)

‘তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, (১) মাদকাসক্ত ব্যক্তি (২) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং (৩) যাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী।’(মুসনাদে আহমাদ)

হে মুসলিম! এসব হতে সাবধান! থাকুন। নিজে বাচুন , নিজের পরিবার পরিজনকে বাচান।  আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে তাওহীদের পরিপন্থী সকল প্রকার কর্ম হতে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুক। আমীন।

গ্রন্থপঞ্জী
১। তাওহীদের মূল নীতিমালা
২। কিতাবুত তাওহীদ ও এর ব্যাখ্যা

মতামত