টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চলচ্চিত্র ‘মুহাম্মদ’ (সা.) ইরানে বিপুল প্রশংসিত

capture2_94322চট্টগ্রাম, ২৯আগস্ট (সিটিজি টাইমস) :: ইরানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি ‘মুহাম্মদ’ (সা.) অবশেষে মুক্তি পেয়েছে। ইসলাম ধর্মের পথপ্রদর্শক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছেলেবেলার সময়টুকুকে অবলম্বন করে নির্মিত এই ছবি ইরানে দর্শকদের বিপুল প্রশংসা লাভ করেছে। নন্দিত চলচ্চিত্রকার মাজিদ মাজিদি ছবিটি পরিচালনা করেছেন।

নান্দনিকভাবে চিত্রায়িত এই ছবিটির দৈর্ঘ্য ১৭১ মিনিট। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় চার কোটি মার্কিন ডলার। ছবিটি আংশিকভাবে অর্থায়ন করেছে দেশটির সরকার। ছবিটি নির্মাণে সময় লেগেছে সাত বছরেরও বেশি।

মাজিদ মাজিদি বিশ্বজুড়ে নামডাকওয়ালা এক পরিচালক। তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ছবিটি হতে যাচ্ছে একটি ট্রিলোজির প্রথম পর্ব। এর মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চান তিনি, উগ্রবাদীদের আচরণে যা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এই কাহিনীর ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরো দুটি ছবি ছবি নির্মাণ করতে চান তিনি।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগের সৌদি আরবের চিত্র বেশ দক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চিরাচরিত মরুভূমিতে উটে সওয়ার আরব বাসিন্দা নয়, বরং এই ছবির চিত্রায়ণ ছিল অনেকটাই বিষয়ানুগ। মহানবীর (সা.) অভূতপূর্ব জন্ম এবং কৈশোরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়টুকু এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দক্ষ নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে।

একটি দৃশ্যে দেখানো হয়, উপজাতীয়দের একটি সশস্ত্র দল পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে ধেয়ে আসার পথে একঝাঁক কাকের ছুড়ে মারা পাথরেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই দৃশ্যের সঙ্গে সংযুক্ত তীব্র আবহসঙ্গীত প্রশংসনীয়। আরেকটি হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যে দেখা যায়, বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতের অলৌকিক স্পর্শে তাঁর ধাত্রী সুস্থ হয়ে ওঠেন। পুরো ছবিতে মহানবীর মহিমা এভাবেই বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রায়ন করা হয়েছে।

দর্শকরাও দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন ছবিটি। ‘ছবিটি আমাদের জন্য খুবই প্রেরণাদায়ক’, এভাবে বলেন মাশা রসৌলজাদেহ্। মধ্যবয়স্ক এই নারী তেহরানের একটি সিনেমা হলে তাঁর মা এবং কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ছবিটি দেখেছেন।

ছবিটি দেখার পর ইরানে বসবাসকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক আশরাফ রহমান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,

‘‘দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে দেখলাম ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র ‘মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.)’। বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে শুরু হওয়া মুভিটি দেখলাম তেহরানের Kourosh cineplex-এ। এটা ইরানের সবচেয়ে বড় সিনেপ্লেক্স। এখানে ১৪টি সিনেমা হল রয়েছে। আসন সংখ্যা ২৮০০টি। সম্পূর্ণ ডি-সিনেমা স্ট্যান্ডার্ড পর্দায় ছবির কোয়ালিটি হলো টু-কে। হলের সাউন্ড সিস্টেম ডলবি-৭.১।

মুভিতে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের আরবের চিত্র বেশ দক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিরতিহীনভাবে চলা প্রায় তিন ঘণ্টার মুভিটি কখন যে শেষ হয়ে গেল টেরও পেলাম না! নিঃসন্দেহে এটা আমার জীবনে দেখা সেরা চলচ্চিত্র। মুভিটির ঘটনাপ্রবাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তাঁর চরিত্রে অভিনয়কারী শিশুটির মুখম-ল দেখানো হয়নি। এমনকি যে শিশুটি মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্রে অভিনয় করেছে তার নামও দেখানো হয়নি। ফলে এতদিন যেসব অপপ্রচার চলছিল তা মিথ্যা প্রমাণিত হল। তবে, মুভিতে আবদুল মোত্তালিব, আবু তালিব, রাসূলের মা আমিনা, দুধমাতা হালিমা, আবু সুফিয়ান, আবু লাহাবসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দের চরিত্রে অভিনয়কারীদের দেখানো হয়েছে।

মুহাম্মাদ (সা) এর জীবনীভিত্তিক ট্রিলজি’র প্রথম পর্বে রাসূলের জন্ম-পূর্ববর্তী কিছু ঘটনা ছিল ফ্ল্যাশ-ব্যাকে। ছবির শুরুটা হয়- শোয়াবে আবু তালিব উপত্যকায় মুসলমানদের অবরুদ্ধ জীবনের দুঃখ-কষ্টের চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে। কুরাইশদের নির্যাতনমূলক চুক্তির ফলে মুসলমানরা নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করে আবু তালিব উপত্যকায়। সে সময় বিবি খাদিজা বিভিন্নভাবে মুসলমানদের সহযোগিতা করেছেন। তবে মুভিতে হযরত খাদিজাকে দেখানো হয়নি।

শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনাপ্রবাহ ২০ মিনিট দেখানো হলেও রাসূল (সা.)কে একবারও দেখানো হয়নি। এক পর্যায়ে সূরা ফিলে বর্ণিত ঘটনা প্রবাহ দেখানো হয়। ইয়েমেনি বাদশাহ আবরাহার হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কায় আক্রমণ ও আবাবিল পাখির মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতিরোধ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আবরাহা’র পতনের প্রায় দুইমাস পর রাসূলেখোদার জন্ম হয়। জন্মের সময়কার কিছু অলৌকিক ঘটনা, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চক্রান্ত, তখনকার আরবে নারী শিশুকে জীবন্ত হত্যা, শিশুদের বলিদানের বিরুদ্ধে শিশু মুহাম্মদের অবস্থান, দাসপ্রথা, দাস মুক্তির বিষয়ে (মুহাম্মদ সা.)-এর ভূমিকা, দুধমাতা হালিমার কাছে শিশু মুহাম্মদকে হস্তান্তর, আবার মা আমিনার কাছে ফিরে আসা, আমিনার মৃত্যু, পাদ্রী বুহাইরার সঙ্গে রাসূলেখোদার সাক্ষাৎ, আবদুল মোত্তালিবের মৃত্যু এবং রাসূলের শৈশবের কিছু মুজিজা তুলে ধরা হয়েছে। মুভির শেষাংশে আবারো শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনা দেখানো হয়েছে যেখানে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশরা বনু হাশিম গোত্রের সঙ্গে যে নির্যাতনমূলক চুক্তি করেছিল সেই চুক্তির দলিল পোকায় খেয়ে ফেলে। ফলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং নির্বাসন মুসলমানরা মুক্তি পায়। মুভিটি শেষ হয়েছে একটি নাতে রাসূল দিয়ে।

ছবিটি না দেখেই যারা এতদিন সমালোচনা করেছেন, তারা যদি তা দেখেন তাহলে মাজিদ মাজিদিকে নিশ্চয়ই ধন্যবাদ দেবেন। ইসলামী ইরান এর আগেও বিভিন্ন নবী-রাসূলগণের জীবনীর ওপর চলচ্চিত্র ও সিরিয়াল নির্মাণ করেছে। যেমন: হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত মারিয়াম (আ.), হযরত সুলাইমান (আ.), হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত আইয়ুব (আ.) প্রভৃতি। কিন্তু মুহাম্মাদ (সা.) চলচ্চিত্রটির মতো এত চমৎকার ছবি ইরান কেন, গোটা মুসলিম বিশ্বে আর হয়নি। এই মুভির মাধ্যমে মাজিদ মাজিদি পাশ্চাত্যে রাসূল (সা) এর অবমাননাকর ছায়াছবি ‘ফিতনা’, ‘ইনসেন্স অব মুসলিমস’ ও ডেনিশ কার্টুনের উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন। ইসলাম যে সন্ত্রাসী ধর্ম নয়, তা রাসূলের চারিত্রমাধুর্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমি মনে করি, এ ধরনের কাজ আরো বেশি বেশি হওয়া দরকার।

বর্তমান বিশ্বে এখন পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ.) কে নিয়ে প্রায় ২৫০টি ফিল্ম, হযরত মুসা (আ.) কে নিয়ে প্রায় ১২০টি ফিল্ম এবং অন্যান্য নবী রাসূলদের নিয়ে প্রায় ৮০টি ফিল্ম এবং গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে প্রায় ৪০টির মতো ফিল্ম নির্মিত হয়েছে; অথচ সেখানে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) কে নিয়ে চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র দুটো! চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী এ মাধ্যম আরো বেশি করে ব্যবহার করা উচিত।

মহানবীর জীবনীভিত্তিক প্রথম ছায়াছবি নির্মাণ করেছিলেন সিরিয়-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা আক্কাদ। ওই ছায়াছবির নাম ‘দ্য ম্যাসেজ’। ১৯৭৬ সালে তা মুক্তি পাওয়ার পর মুসলমান বিশ্বের কোনো কোনো মহল তার কঠোর সমালোচনা করেছিল। সত্যি বলতে কী, সমালোচকদের কাজই হলো সমালোচনা করা। তারা ন্যায়-অন্যায় ও বিচারবুদ্ধির চেয়ে হিংসা ও পরশ্রীকাতরতাকে বেশি কাজে লাগায়। তারা ইসলাম অবমাননার জবাব দেয়ার ক্ষমতা রাখে না কিন্তু কেউ উপযুক্ত জবাব দিলে তারও সমালোচনা শুরু করেন! এর মাধ্যমে তারা মুসলমানদের ক্ষতি করার পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষীদের উপকার করে।

যাই হোক, ইরানে প্রদর্শন শেষে মুভিটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করি। রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য সাড়ে চারশ কোটি টাকা ব্যয়ে ছবিটি নির্মাণের জন্য পরিচালক মাজিদ মাজিদি ও ইরান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

তেহরান জমজমাট

বেলা ১১টার মধ্যেই জমজমাট হয়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। হাউসফুল না হলেও কমতি ছিল না দর্শকের। কিন্তু বেলা গড়াতে না গড়াতেই পরের সব শোর টিকেট ‘সোল্ড আউট’! এমনকি দর্শকদের বাড়তি চাহিদার কারণে শোর সংখ্যা বাড়িয়ে মাঝরাত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের সবাইসহ পুরো সাতজনের গ্রুপ নিয়ে এসেছিলেন ২১ বছরের তরুণ আবুল ফজল ফাতেহি।

তিনি বলেন, ‘ছবিটি ভালো লেগেছে আমাদের সবার। আমার ধারণা, যারা ইসলাম সম্বন্ধে সঠিকভাবে জানে না, এই ছবিটা দিয়েই তারা শুরু করতে পারে।’

একটি সিনেমা হলের কর্মী মেহ্দি আজর বলেন, ‘ছবিটা লম্বা বলে শুরুতে অনেকের মনে হতে পারে একটু একঘেয়ে, কিন্তু আসলে তা না। ভিজ্যুয়ালি ছবিটা দারুণ আকর্ষণীয়, দর্শককে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে এর।’

মোহাম্মদ মেহদি হেইদারিয়ান প্রযোজিত এই ছবির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ইরান ও দক্ষিণ আফ্রিকার শহর বেলা-বেলাতে।

বিশাল বাজেটের এই ছবিতে কাজ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তিনবার অস্কার জেতা ইতালির ভিত্তোরিও স্তোরেরো, এডিটিং করেছেন ইতালির রবার্টো পেরপিগনানি, স্পেশাল ইফেক্টের কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্কট ই অ্যান্ডারসন, মেকআপ করেছেন ইতালির গিয়ানেত্তো ডি রসি এবং সংগীত সংযোজনে কাজ করেছেন ভারতের অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এ আর রহমান।

তবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নিয়ে নির্মিত ছবি এটিই প্রথম নয়। নন্দিত মার্কিন চলচ্চিত্রকার মুস্তাফা আকদ ১৯৭৬ সালে বানিয়েছিলেন ‘মুহাম্মদ, মেসেঞ্জার অব গড’ নামের একটি ছবি। দারুণ সাফল্যও পেয়েছিল সেই ছবিটি।

তবে সবাই যে এই নতুন ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত, তেমন কিন্তু নয়। এদেরই একজন কোমিল আর্জমান্দি। ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ পড়ালেখা করছেন ফিল্ম ডিরেকশন নিয়ে। তিনি বললেন, ‘ছবিটা নিয়ে অনেক কথা শুনেছি এতদিন। সত্যি করে যদি বলি, যা দেখেছি তার চেয়ে আমার প্রত্যাশা আরো বেশি ছিল। মুস্তাফা আকদের ছবির চেয়ে এটা আরো উচ্চমানের হবে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল আমার।’

নির্মাতারা অবশ্য এই ছবিকে অন্য কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও এই ছবিকে আনা হয়নি। এ কারণে ইরানের অন্যতম চলচ্চিত্র উৎসব ফাজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটিকে প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে আলাদাভাবে প্রদর্শন করা হয়।

শিয়া অধ্যুষিত ইরানে ছবিটির পরবর্তী প্রদর্শনীর টিকেটও মোটামুটি সব বিক্রি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তবে সুন্নি সম্প্রদায়ের কাছে এই ছবিটি বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছবির শিল্পীদের নিয়ে পরিচালক মাজিদি এখন কানাডায়, মন্ট্রিল চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছেন তাঁরা। ‘মুহাম্মদ’ (সা.) ছবিটির প্রদর্শনীর মাধ্যমেই পর্দা উঠতে যাচ্ছে এই উৎসবের।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত