টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জাসদ বিতর্ক: কী রয়েছে নেপথ্যে?

jsdচট্টগ্রাম, ২৮ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) :: জাসদ নিছক বিতর্ক, শাসক জোটের ভঙ্গুর সমন্বয় নাকি অন্য কিছু? কী রয়েছে নেপথ্যে? ইতিহাসের অমীমাংসিত সত্যের সুরাহা নাকি জাসদ ও গণবাহিনী নেতা হাসানুল হক ইনুকে সরকার থেকে মাইনাস করা? রাজনীতির অন্দরমহলে নানামুখী আলোচনার কবর দিয়ে জাসদ বিতর্কই এখন তুফান তুলেছে। পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন। হঠাৎ কেন ৪০ বছর পর এই বিতর্ক? খোদ আওয়ামী লীগ সরকারের অতি অনুগত তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও তার জাসদ নিয়ে? জাসদ নেতার জন্য সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের এ কেমন উপহার? শোকাবহ আগস্ট মাসেই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির অভিযোগে মুজিব সরকার উৎখাতে গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের সেকেন্ড ইন কমান্ড ইনু ও তার জাসদকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুব উল আলম হানিফ ও ক্যাপ্টেন অব. এবিএম তাজুল ইসলাম সিরিজ আক্রমণে অস্থির করে তুলেছেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ নিছক বিতর্ক নয়। ইতিহাসের নির্মম সত্যকে টেনে আনার চেষ্টাও নয়। মন্ত্রিসভা থেকে জাসদ সভাপতিকে সরিয়ে তার দলকে আগামী দিনের নির্বাচনী ময়দানে ঠেলে দেয়ার সরকারি পরিকল্পনারই অংশ। ইনু নিজের ও দলের কোন গণভিত্তি না থাকলেও দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে বলেছিলেন। সেই ইনুকেই আজ সরকার থেকে মাইনাসের নকশা অনুসারে এই বিতর্কের ঝড় তোলা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্বাধীনতা উত্তরকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ মুক্তিযুদ্ধে উদ্ভাসিত মেধাবী তারুণ্যের বড় অংশটিকেই ছাত্রলীগের সম্মেলন ঘিরে ভাঙনের পথ ধরে জাসদের জন্ম দেয়া হয়েছিল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলাফলে এমনটি ঘটেছিল বলে তারা মনে করেন। কারণ, এই বিভক্তির পথ ধরেই জাতীয় ঐক্যের দরজা ভেঙে দেয়া হয়। যুদ্ধোত্তর সমস্যা কবলিত বাংলাদেশে বিভ্রান্তির পথ হাঁটা তীব্র হয় এখান থেকেই। দেশের সব যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আগেই, মানুষের খাবার-বাসস্থানের মতো দুর্যোগকে মোকাবিলা না করেই ’৭২ সালের জুলাই মাসে ছাত্রলীগের তড়িঘড়ি সম্মেলন ছিল সেই ষড়যন্ত্রের শুভসূচনা। একটি জাতি, তার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ আজীবন গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হাঁটলেও স্বাধীন বাংলাদেশে কোনপক্ষই গণতন্ত্রের পথ ধরে রাখতে পারেনি। শাসক আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করলেও শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠতে দেয়নি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশেষ করে জাসদের প্রতি দমন নির্যাতন আর ক্ষমতার উন্মাষিকতা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি একটি সদ্য স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের রোমান্টিক স্বপ্ন নিয়ে উগ্র রোমান্টিক পথটি নিয়েছে জাসদ। দলটিকে রাজনৈতিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হতে দেয়নি। হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, নৈরাজ্যের অন্ধকার পথ নিতে গিয়ে সরকারকে অস্থির ও অশান্তই রাখেনি, দলের কর্মীদেরও মৃত্যুর অন্ধকার পথে ঠেলে দিয়েছে। কর্নেল তাহেরের জন্য জাসদ তার প্রথম অক্টোবর সম্মেলনে সহ-সভাপতির পদটি শূন্য রাখলেও তাকেই গণবাহিনীর প্রধান করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর সৈনিকদের নিয়ে শ্রেণীবিপ্লবের স্লোগান তুলে সৈনিক সংস্থা গঠন করে গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের পথে মুজিব সরকার উৎখাতে পথ নিয়েছিল জাসদ। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার মতো হঠকারী কর্মসূচি দিয়ে যে জাসদের উগ্র রাজনীতির সূচনা, তার পরিণতি ছিল দেশ ও দলের জন্য বিয়োগান্তক। জাসদের ইতিহাস হয়ে উঠেছিল দল ও দেশের জন্য রক্তাক্ত দলিল। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ’৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের নামে কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুরা সেনাবাহিনীতে সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী দিয়ে যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় তাদের শক্তিকে প্রকাশ্যে এনেছিলেন। ১৫ই আগস্ট না ঘটলেও গণবাহিনী মুজিব সরকার উৎখাতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতো। ১৫ই আগস্টের খুনিচক্র আগাম ঘটিয়ে ফেলায় জাসদের বিপ্লবের পরিকল্পনা ৭ই নভেম্বর উন্মোচিতই হয়নি, ভুল ফাঁদেও পড়েছে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য জাসদের কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও মস্কোপন্থি কমিউনিস্টরা কখনও আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখেনি। দুই বিশ্ব মোড়লের ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে আজীবন গণতন্ত্রের সংগ্রামে পথ হাঁটা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে একদলীয় বাকশালের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের পথে ঠেলে দিয়ে সব দল ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ আরেকটি হঠকারিতা ছিল। সেই সঙ্গে সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির অন্ধকার রাজনীতি, আজকের সরকারের পার্টনার রাশেদ খান মেনন, দিলীপ বড়ুয়াদের চিনাপন্থি রাজনীতির তৎপরতাও কম ছিল না। সেদিন সিপিবি আর ন্যাপ গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে ক্ষমতার দাসত্ব বরণ করেছিল।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, ভাঙনের পথে পথে যে জাসদ রিক্ত-নিঃস্ব, তাকে মুজিব কন্যা নৌকায় তুলেই না সংসদে এনেছেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো মন্ত্রণালয় জাসদ সভাপতি ইনুর হাতে তুলে দিয়েছেন। এর আগে সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকেও মন্ত্রী করেছিলেন। সাম্যবাদী দল বঙ্গবন্ধু হত্যাকে সমর্থনও করেছিল। বর্তমান সরকারে রাশেদ খান মেননও রয়েছেন। ’৭৫ সালের পরেও এদের রাজনীতি ছিল বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ১৪ দল গঠনকালে জাসদের অতীত জেনেই জোটে নেয়া হয়েছিল। তাহলে আজ যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যে কোন ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকারি দলের মাঠনেতারা আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্তের হলি খেলছেন, শীর্ষ নেতারা বলছেন- ঐক্যই এখন বড় শক্তি হতে পারে। ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে না, ঠিক তখন মহাজোট সরকারের শীর্ষ নেতাদের মুখোমুখি অবস্থান- এমনকি নামে বিরোধী দল, কামে সরকারের অংশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদও বলেছেন, এই সরকারের আমলে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। গণমাধ্যম কথা বলতে পারছে না। সব বিতর্কের মুখে জাসদের পর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, হঠাৎ জাসদ বিরোধী বিষোদগার ১৪ দলের ঐক্য বিনষ্টের ষড়যন্ত্র। ১৪ দলও অর্থহীন বৈঠক করেছে। দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ, নেতাদের মুখোমুখি অবস্থান রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সেখানে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিএনপির ওপর সরকারের খড়গনীতি চরম পর্যায়ে নিয়ে দলটিকে যেভাবে মাটিতে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, সেখানে ১৪ দলের শরিকদের বিরোধী দলের মঞ্চে পাঠিয়ে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিকল্পনা শেষ করতে চায়। জাসদ বিতর্কের মধ্য দিয়ে ১৪ দলের ভাঙন ও হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভা থেকে আপাতত সরিয়ে তার দলকে সেই মঞ্চে দিতে চায়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে। সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও নৈতিক সমর্থন পায়নি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাসদ বিতর্কসহ আগামী দিনের রাজনীতির সরকারের দাবার চাল দেখতে আরেকটু সময় লাগবে।

সুত্রঃ মানব জমিন

মতামত