টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জব্দ স্বর্ণ নিয়ে মাথা ঘামায় না চোরাকারবারিরা!

চট্টগ্রাম, ২৩ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) :দেশের তিনটি বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও পোর্টে প্রায় দিনই কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সব ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ মামলাও দায়ের করে। তবে রহস্যজনক কারণে এ সব মামলায় লড়াই করে না চোরকারবারিরা। আর এ কারণেই এসব স্বর্ণ দ্রুত জমা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ জুলাই পর্যন্ত ২৭ মন (১ মেট্রিক টন ৬২ কেজি) স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় শতাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। এ সব ঘটনায় পুলিশ দায়ের করে ফৌজাদারি মামলা আর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দায়ের করে চোরালান মামলা। কাস্টমসের দায়ের করা মামলা তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়। কাস্টমসের দায়ের করা মামলা নিষ্পত্তির পর জব্দকৃত স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থায়ীভাবে জমা হয়। এর আগে অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই থাকে। এছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান ধরা পড়ার পর দাবিদার পাওয়া গেলে মামলার মাধ্যমে আদালত থেকে তারা স্বর্ণ ছাড়িয়ে নিতে পারে। তবে, সচরাচর চোরাচালানের স্বর্ণের দাবিদার পাওয়া যায় না।

সূত্র জানায়, দেশের তিনটি বিমানবন্দর- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আটক হওয়া সব স্বর্ণই কিছু প্রক্রিয়া শেষে পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে। জব্দকৃত স্বর্ণের বার কখনও নিলামে দেওয়া হয় না। অলঙ্কার শুধু নিলামে দেওয়া হয়। নিলাম কমিটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের একজন করে প্রতিনিধি থাকেন। নিলাম কমিটি বিক্রির টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। তবে এসব স্বর্ণের গ্রেড যদি আন্তর্জাতিক মানের হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাজার দরে তা কিনে নেয়। এ ক্ষেত্রেও বিক্রির টাকা জমা হয় সরকারি কোষাগারে।

তবে গত দুই বছরে জব্দকৃত স্বর্ণের ঘটনায় মামলা চলমান থাকায় সব স্বর্ণের রিজার্ভ দেখাতে পারে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, আটক হওয়া স্বর্ণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে জমা হওয়া ২৫৮ কেজি ৮৬৮ গ্রাম সোনার মধ্যে ২৪৫ কেজি ২৬৭ গ্রাম হলো বার। আর স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে ১৩ কেজি ৬০১ গ্রাম। এছাড়া ব্যাংকের ভল্টে অস্থায়ী খাতে থাকা ৭২৩ কেজি সোনার মধ্যে বার রয়েছে ৫২৭ কেজি ৮৪৩ গ্রাম। স্বর্ণালঙ্কার ১৯৫ কেজি ২৪ গ্রাম।

বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল অফিসের কারেন্সি অফিসার (মহাব্যবস্থাপক) মো. শহিদুর রহমান জানান, কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে জমা হয়। তবে রিজার্ভে যাওয়ার আগেও অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই স্বর্ণ জমা থাকে। আর কারও কাছে রাখার অধিকার নেই।

বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুফাকচার অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়শনের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে জব্দ স্বর্ণ নিলামে দেবে কি দেবে না। তবে এক্ষেত্রে কোনও বাধ্য বাধকতা নেই। অলঙ্কারগুলো মাঝেমাঝে নিলামে দিয়ে থাকে। তবে তাও অনেক আগে দিয়েছে। সম্প্রতি দেয়নি। পিওর স্বর্ণের বার হলে পাঁচ হাজার বছরও রিজার্ভে রাখা যায়। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই স্বর্ণ কেনে, নিলামে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কে মনোয়ার উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বিশ্বের প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কিনে রিজার্ভ করে। দেশের যখন মাথাপিছু আয় বেশি হয়, তখন তা বিক্রি করে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘তবে চোরাই পথে বা অবৈধ পথে আসা স্বর্ণ দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো না। চোরকারবারিরা কোটিকোটি টাকা পাচারের জন্য এই পথ অবলম্বন করে থাকে। রিজার্ভ বাড়লেও এর সমার্থন করা যাবে না।’

কাস্টমস যেসব মামলা দায়ের করে, সে সবের দেখভাল করেন কাসম্টস গোয়েন্দা ও তদন্ত অদিফতরের যুগ্ম পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ একটি স্বর্ণ চোরাচালান ধরার পড়ার পর দুটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। অন্যটি কাস্টমস শুল্ক বিভাগ করে থাকে। কাস্টমসের দায়ের করা মামলার বিচার করেন কমিশনার। চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকায় পৃথকভাবে এসব মামলার বিচার হয়ে থাকে। প্রতিটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। কাস্টমসের মামলা নিষ্পত্তি হলেই বাংলাদেশ ব্যাংক স্বর্ণকে স্থায়ী রিজার্ভ হিসেবে দেখাতে পারে। তাতে কোনও বাধা নেই।’

মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘গত দুই বছরে শতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এ সব ঘটনায় চার থেকে পাঁচটি ছোট চালানের মালিকানা দাবি করা হয়েছে। তবে তারা মামলায় জিততে পারেনি। কারণ, অবৈধভাবে আসা স্বর্ণ কখনও বৈধ করার উপায় নেই। স্বর্ণ আনতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি আগেই নিতে হবে। তাই, তাদের দাবি টেকে না।’

একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গত বছরের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ আলী নামে এক ব্যক্তি একটি স্বর্ণের চালানের দাবি করেছিলেন। পরে তার পুরানা পল্টনের ২৯/১ নম্বর ‘ঠিকানা’ অ্যাপার্টমেন্টের ৬ষ্ঠ তলার ৬/এ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় কাস্টমস ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। টানা তিন ঘণ্টার অভিযানে ফ্ল্যাটটি থেকে চার বস্তা দেশি-বিদেশি মুদ্রা এবং ৫২৮টি স্বর্ণের বারসহ অবৈধ কিছু মূল্যবান মালামাল উদ্ধার করা হয়। আটক স্বর্ণের ওজন প্রায় ৬২ কেজি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।’ বৃহৎ চোরাকারবারি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়েই জব্দকৃত স্বর্ণের দাবি করে না বলেও জানান তিনি।

কাস্টমস সূত্রটি জানায়, পাচার হওয়া স্বর্ণ ভারতকে টার্গেট করেই আনা হয়। বাহকরাও জানেন না ওই স্বর্ণ আসলে কাদের। তারাও কোনও তথ্য দিতে পারেন না।

বাংলাদেশে কেন এত সোনা চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে, এমন প্রশ্নে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, মূলত অবৈধ লেনদেন করতেই এই সোনা পাচারে ঘটনা ঘটে। কোনও গোষ্ঠী অবৈধ পণ্য কিনেছেন, সেই পণ্যের মূল্য ২ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ টাকা রাস্তায় নিয়ে বেরুনো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। ২ কোটি টাকার স্বর্ণবার খুব সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।- বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত