টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কর্ণফুলীর সীমানা জরিপে আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা

chittagong চট্টগ্রাম, ১৫ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) :কর্ণফুলী নদীর সীমানা জরিপে বেরিয়ে এসেছে আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা।

আর, এস ও বি, এস দুই পদ্ধতির এই ভূমি জরিপের প্রতিবেদন ঢাকায় এটর্নী জেনারেলের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

এখন হাইকোটের নির্দেশনায় নির্ধারণ হবে কর্ণফুলীর সীমানা। পাঁচ বছর আগে কর্ণফুলী সীমানা নির্ধারণে জরিপকাজ স¤পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠানোর আদেশ দেন হাইকোর্ট ।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।’

তিনি জানান, চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদীকে গ্রাস করা এসব অবৈধ স্থাপনার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনাও রয়েছে। সাড়ে ৫শ ছোট-বড় শিল্প-কারখানা, বিভিন্ন শিল্প-বাণিজ্যিক প্লান্ট, দেশি-বিদেশি জাহাজ কোস্টার নৌযান ট্রলারের বিষাক্ত বর্জ্য, ময়লা-জঞ্জাল ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে কর্ণফুলী নদী। নৌ-চলাচলের মূল নেভিগেশনাল চ্যানেল, বহির্নোঙ্গরসহ বন্দর এলাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক ও নানামুখী দূষণ। এতে করে কর্ণফুলী চ্যানেলের নাব্যতা কমে আসছে দিনকে দিন।

অন্যদিকে ক্রমেই বিষিয়ে উঠেছে কর্ণফুলীর পানি। নদীর পানির স্বাভাবিক রঙ, গন্ধ ও স্বাদ আর নেই। ৬০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত চট্টগ্রাম নগরীর বিশাল অংশের নগর বর্জ্যের প্রধান ঠিকানা কর্ণফুলী। বিলুপ্ত হচ্ছে এ নদীর হাজারো জীববৈচিত্র। এককালে হরেক প্রজাতির চিংড়িসহ সুস্বাদু মাছের খনি এখন আর নেই। এখন এই নদী বলতে গেলে মাছশূন্য জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, কর্ণফুলী নদীতে অনায়াসে মিলতো মিঠা পানির ৬৬ প্রজাতির, মিশ্র পানির ৫৯ প্রজাতির এবং সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির মাছ। দূষণের কবলে পড়ে এরমধ্যে মিঠা পানির প্রায় ২৫ প্রজাতির এবং মিশ্রপানির ১০ প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্ত প্রায়। এছাড়া আরও ১০ থেকে ২০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ বিপন্ন। সবকিছু মিলে কর্ণফুলী নদী আজ বিপন্ন নদী।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মকবুল হোসেন জানান, কর্ণফুলী রক্ষায় তিন মাস কোনো ধরণের স্থাপনা নির্মাণ ও মাটি ভরাট না করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এছাড়া, জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে সীমানা নির্ধারণ করে ছয় মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশও দেয়া হয়। ২০১০ সালের ১৮ জুলাই বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছিলেন।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদের জনস্বার্থে করা রিটটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সরকারপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজরুল ইসলাম তালুকদার। রুলে কর্ণফুলী রক্ষায় নদীর অভ্যন্তরের সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না জানতে চাওয়া হয়।

তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমিসচিব, অর্থসচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, নৌপরিবহন সচিব, পানিস¤পদ সচিব, চট্টগ্রামের মেয়র, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের বিআইডব্লিটিএ চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।

শুনানিতে মনজিল মোরসেদ বলেন, দেশের বৃহত্তম বন্দর চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নদীর মাধ্যমে সচল রয়েছে। এ অবস্থায় কর্ণফুলীকে বিপন্ন হতে দেয়া যাবে না।

উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনা এতদিন সময়ক্ষেপণের মধ্যেই কেটে যায়। অবশ্য এরমধ্যে সীমানা নির্ধারণে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। আগ্রাবাদ সার্কেলের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আবু হাসান সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কাজ শুরু করে গত বছরের ৯ নভেম্বর থেকে।

সর্বশেষ গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কাছে দুইটি বই আকারে বাইন্ডিং করা এ প্রতিবেদন জমা দেন মোহাম্মদ আবু হাসান সিদ্দিকী। ওই প্রতিবেদনে উচ্চ আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে উল্লিখিত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে। নদীর দুই তীর ধরে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা নদী দখলের পাশাপাশি দূষণও ঘটাচ্ছে।

জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর মোহনা থেকে নগরীর মোহরা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকার নদীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণের কাজ হয়েছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে নগরীর মধ্যে নদীর দুই তীরে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। ১০ কিলোমিটার এলাকায় নদী দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে যার সবগুলোই অবৈধ। চিহ্নিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তিগত ঘরবাড়িও আছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর লালদিয়ার চর, শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন চাক্তাই, সদরঘাট এলাকার অংশে অবৈধ স্থাপনা বেশি। আর এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এদিকে দখলের কবলে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশস্থতা কমেছে উদ্বেগজনকহারে।

হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯-৯০ ব্রিজ ঘাট এলাকায় কর্ণফুলীর প্রস্থ ছিল ৮৭০ মিটার। একই জায়গায় ২০০৯-১০ জরিপ অনুযায়ী প্রস্থ ৬০০ মিটার। ১৯৯০ সালে চাকতাই খালের মুখ এলাকায় প্রস্থ ৬৫০ মিটার ছিল। ২০১১ সালে তা নেমে আসে ৬০০ মিটারে। সর্বশেষ হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অনুযায়ী পতেঙ্গা এলাকায় ৭০০ মিটার, ১নং জেটি ঘাট এলাকায় ৪০০-৪৫০ মিটার, সদর ঘাট এলাকায় ৬৫০ মিটার। গত ২৫ বছরে স্থানভেদে নদীর প্রশস্থতা কমেছে ৫০ থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত।

মতামত