টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মানিকছড়ি ও রামগড়ে বিতর্কিত ভূমিতে জবর-দখল ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন

আবদুল মান্নান
মানিকছড়ি প্রতিনিধি 

33চট্টগ্রাম, ১৪ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) : তিন পার্বত্য জেলার ন্যায় খাগড়াছড়ির চিরসবুজ মানিকছড়ি ও রামগড় উপজেলায় ১৯৭৯-৮৪ এ সময়ে তৎকালীণ সরকার সমতলের ভূমিহীন জনগোষ্ঠিকে শরনার্থী হিসেবে পূর্ণবাসন করে। প্রত্যেক পূর্নবাসিত পরিবারকে ৫ একর ভূমি কবুলিয়ত মূলে বন্দোবস্তী প্রদান করা হয়। আর এ পূর্ণবাসনকে ঘিরে পরবর্তীতে পাহাড়ে শুরু হয় অশান্তির লীলাখেলা। দেশে-বিদেশে পরিচিত লাভ করে অগ্নিগর্বা পার্বত্যাঞ্চল হিসেবে। এ অঞ্চলের মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা নেতারা পূর্ণবাসিত শরনার্থী আগমনের বিষয়টিকে সাদরে গ্রহন করেনি তখন ! যার কারণে আশির দশকের মাঝামাঝিতে তৎকালীণ শান্তিবাহিনী অউপজাতি (পূর্ণবাসিত শরনার্থী) জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে অসংখ্য মানুষের অকালে প্রাণ ঝড়ে! এক পর্যায়ে নিরাপত্তার অজুহাতে সরকার ১৯৮৮ সালে পূর্ণবাসিত শরনার্থীদেরকে গুচ্ছগ্রাম নামক বন্দিশালায় আবদ্ধ করে। কিন্তু তাদের বাড়ী-ঘর পরিত্যক্ত থেকে যায়। ভাগ্যে জুটে বন্দিশালার মানবেতর জীবন! কিন্তু আজ ২৭ বছর পরও তাদের কপালে সুখ জুটেনি! সরকার প্রদত্ত ভূমিতে সৃজিত ফল-ফলাদির বাগান নিয়ে তারা এখন শংকিত! তৃণমূলের অসহায় জনগোষ্ঠিকে উপজাতি সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে তাদের নির্দেশিত পথে চলতে বাধ্য করা এবং নিয়মিত চাঁদাবাজি করে সর্বস্বান্ত করছে সাধারণ মানুষকে। সম্প্রতি আবার সেই পুরানো ষ্টাইলে ভূমি বিরোধের অজুহাতকে পুঁজি করে স্থানীয়দের মাঝে বিভেদ সৃষ্ঠির পাঁয়তারা করছে একটি চক্র। ইতোমধ্যে সন্ত্রাসীদের তান্ডলীলায় বাড়ী-ঘর ছাড়তে শুরু করেছে কৃষিজীবিরা। ফলে ভূমিতে সৃজিত ফল-ফলাদি ও তরু-তরকারি নিয়ে গভীর চিন্তিত গ্রামবাসীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্রগ্রামের বান্দরবান,রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বহুকাল ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির মিলনস্থল। মুসলিম, হিন্দু,বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের বসবাস এখানে পুরানো চিত্র। ১৯৭৯-৮৪ সময়ে তৎকালিন সরকার সমতলের ভূমিহীন জনগোষ্ঠির একটি অংশকে পাহাড়ী জনপদে পূর্ণবাসনের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলার অন্যান্য স্থানের ন্যায় মানিকছড়ি ও রামগড় জনপদে পূর্ণবাসিত শরনার্থীদের বসতি গড়ে ওঠে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মানিকছড়ি ও রামগড় উপজেলার নির্জণ জনপদ উত্তর ও দক্ষিণ হাফছড়ি, বকড়ী পাড়া, মনাধন পাড়া,ওয়াকছড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে থাকা পূর্নবাসিত লোকজন পার্বত্যাঞ্চলের বিরাজমান পরিস্থিতির শিকারে পড়ে গুচ্ছগ্রামে জনসবতি গড়ে তোলে। কিন্তু সরকার কর্তৃক বন্দোবস্তী প্রাপ্ত ভূমি পরিত্যক্ত রেখেই পূর্ণবাসিত লোকজন গুচ্ছগ্রামে এসে বসতি গড়ে তোলে। পরিত্যক্ত ভূমির পাশে বসবাসকারী অসহায় মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরারা জনগোষ্ঠি এক সময় পূর্ণবাসিত ব্যক্তিদের সম্পদ রক্ষায় সচেষ্ঠ থাকলেও কালের আর্বতে এখন ঠিক তার উল্টো! অভিযোগ রয়েছে যে, নিরীহ মারমা. চাকমা ও ত্রিপুরাসহ উপজাতি জনগোষ্ঠিকে এ অঞ্চলের অঘোষিত শাসনকর্তারা শাসন করছে রাজনীতির উদ্দেশ্যে। দরিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত জনগোষ্টিকে সন্ত্রাসীরা বাধ্য করছে তাদের নিদের্শিত পথে চলতে ও বলতে। ফলে পাহাড়ে সম্প্রীতির বন্ধনে এখন চির ধরেছে! ছোট-খাট ইস্যু নিয়ে স্থানীয়রা একে অপরের বিরুদ্ধে ঝগড়া-ঝাটি কিংবা সংর্ঘষে লিপ্ত হতে দ্বিধা করছে না। আর এসব কাজে ইন্দন যোগাচ্ছে একশ্রেণির কুচক্রিমহল।

অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফ গ্রামের নিরীহ মানুষকে যখন-তখন,প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সভা-সমাবেশে আসতে বাধ্য করে। শুধু তাই নয় এ অঞ্চলে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে গরু-ছাগল,হাঁস-মুরগী ও জায়গা-জমি বিক্রিতে ১০% এবং ফলস ফলাতে একর প্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় কৃষিজীবি সবাইকে। এ অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪শত কোটি টাকার অবৈধ চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে বলে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার হওয়ার পর সন্ত্রাসীরা ‘বনের রাজা’ সেজে রামরাজত্ব চালাচ্ছে এ অঞ্চলে এমন অভিযোগ তৃণমূলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির। বর্তমানে ইউপিডিএফ, জেএসএস ও সংস্কার নামীয় তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ আধিবিস্তার করে নিয়ন্ত্রণ করছে লোকালয়। সম্প্রতি মানিকছড়ি ও রামগড় উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ হাফছড়ি, বকরীপাড়া, মনাধন পাড়া ও ওয়াকছড়ির নির্জণ অরণ্যের স্থানীয়রা একে অপরের বিরুদ্ধে ভূমিদখল ও বেদখলের অভিযোগ আনলে প্রশাসন বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে সুরাহার উদ্যাগ নিলেও হঠাৎ রাজপথে নেমে আসে ইউপিডিএফ ও বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে গত ১০ আগস্ট রাতের অন্ধকারে হাতিমুড়ার ভিজা বাউন্তি নামক এলাকায় তান্ডব চালিয়ে ৩ কৃষিজীবি পরিবারের চারটি বসত ঘরে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে তাদের। নিরাপত্তার অভাবে শেষ পর্যন্ত ওই ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো ১২ আগস্ট লোকালয়ে চলে আসে। থেকে যায় সৃজিত ফল-ফলাদি ও বৃক্ষরাজি। অন্যদিকে বকরীপাড়া ও মনাধন পাড়ায় সৃষ্ঠ ঘটনার পর প্রশাসন সেখানে স্থিতবস্থা ঘোষণা করায় ওই জনপদে গুচ্ছগ্রামীবাসীদের শত শত একর টিলায় কচু, বরবটি, আনারস ফলের পাশাপাশি আম ও আকাশমনি বৃক্ষের সৃজিত বাগান অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে । গতকাল সরজমিনে দেখা গেছে, ওই সব পরিত্যক্ত টিলাগুলো পাহাড়ায় পুলিশ টহল দিচ্ছে। গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালীদের পক্ষে ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি মো. ইউছুফ লিডার বলেন, গুচ্ছগ্রামবাসীরা এখন শংকিত। কেননা তাদের পরিত্যক্ত টিলায় সৃজিত ফল-ফলাদি বাজারজাত করতে পারছেনা। বিশাল এলঅকা অরক্ষিত থাকার সুযোগে মেখানে সন্ত্রাসীরা অভয়ারণ্য গড়ে তোলেছে। এ সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কৃষিজীবি জানান, সৃজিত জমির ফসল আনতে হলে সন্ত্রাসীদেরকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হবে এমনটি ওরা ধারণা দিচ্ছে। এখানে গুচ্ছগ্রামবাসীরা ভূমিতে গিয়ে ঘর-দুয়ার না করার শর্তে এবং মোটা অংকের চাঁদা দিলে চাষাবাদ করতে বাঁধা নেই। শুধু বিপত্তি ঘর তৈরি কিংবা চাঁদা দিতে অপারগতা দেখালে।

মানিকছড়ি থানার ও.সি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলে সৃষ্ঠ উত্তেজনা নিরসন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় অস্থায়ী টহল হিসেবে পুলিশ নিয়োজিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত ও স্বাভাবিক।

মতামত