টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

এবারও হচ্ছে না গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা

eduচট্টগ্রাম, ১১ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) : এবারও হচ্ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ (ক্লাস্টার) পদ্ধতির পরীক্ষা। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী গুচ্ছ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা চাইলেও, শুধুমাত্র আয় কমে যাবার অজুহাতে বিষয়টির বিরোধিতা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা।

সরকার প্রায় অর্ধযুগ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা চালুর চেষ্টা চালাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ‘অ্যাপেক্সবডি’খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ প্রস্তাবনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ৮টি গুচ্ছে এ পরীক্ষা নেয়া যায়।

এরই অংশ হিসেবে প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৩টি গুচ্ছ ছাড়াও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ৫টি গুচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যায়।

সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি গুচ্ছ হচ্ছে- বিজ্ঞান অনুষদ, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানসহ অন্যান্য অনুষদের জন্য আলাদা গুচ্ছে পরীক্ষা।

এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীদের এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ, আলাদা ফরম কেনা ও পরীক্ষায় বসার জন্য সময়, শ্রম, অর্থ গচ্চা এবং ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে একমত হতে না পারায়, গুচ্ছ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন মনে করছে, একসাথে ভর্তি পরীক্ষা নিলে শিক্ষকদের আয় কমে যেতে পারে, এমন শঙ্কায় তারা গুচ্ছ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস্টারের আওতায় আনা সম্ভব নয়। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বজায়ে রাখতে হবে। সবাই এখানে ভর্তি হতে চায়। তাই এখানে নিজস্ব পরীক্ষা পদ্ধতি থাকতে হবে।

তিনি বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি চায় তাহলে তারা ক্লাস্টার পদ্ধতির আওতায় আসতে পারে। সেটা করলে ভাল হয় বলে তিনি মনে করেন।
প্রস্তাবিত গুচ্ছ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায় মেডিকেলের মতো, প্রকৌশল বিষয় কোর্সগুলোর জন্য একটি, কৃষি বিষয়ক কোর্সগুলোর জন্য একটি এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার পরামর্শ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভর্তি পরীক্ষা নিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একজন শিক্ষককে গড়ে ১৭ থেকে ২৬২ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়, যা অনায়াসে একজন শিক্ষক পড়ানোর কাজে ব্যয় করতে পারেন।

অন্যদিকে, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, ভর্তি ফরম কেনা এবং পরীক্ষা দিতে যাওয়া-আসা বাবদ একজন শিক্ষার্থীকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়।

সেই সাথে রয়েছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার হয়রানি। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই চায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হোক।

শিক্ষার্থীদের চাওয়া এবং তাদের সমস্যা বিবেচনায় রেখে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন গুচ্ছ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরামর্শ দেয়।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  বলেন, ক্লাস্টার পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলেও ভাল হয়। পরীক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব হবে। আর্থিক ক্ষতি রোধ হবে। তবে এর নেতিবাচক দিকও আছে। এক পরীক্ষার্থী হয়তো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল সাবজেক্ট পায়নি। কিন্তু সে আরেক বিশ্ববিদ্যালয় ভাল সাবজেক্ট পেতে পারে।

ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষার সূচি ঘোষণা করতে শুরু করেছে। এবারও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড় দিতে হবে ভর্তি পরীক্ষার জন্য। এতে ব্যয় হবে অর্থ, ক্ষেপণ হবে মূল্যবান সময়ও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি নিজেরাই ঠিক করবে।

২০১২ সালে প্রণীত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম বর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়ার গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যয়বহুল উল্লেখ করে এতে আমূল সংস্কারের সুপারিশ করা হয়।

বিদ্যমান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের একাধিক ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হওয়া ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকার বিষয়টি উঠে আসে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের সংগঠন ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ’র তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সরকারি ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮টিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে।

নিজস্ব পদ্ধতিতে পৃথক দিনে নিজ নিজ ক্যাম্পাসে পরীক্ষা নেওয়ায় অক্টোবর থেকে কমপক্ষে ছয় মাস ধরে চলে ভর্তি পরীক্ষা। এই দীর্ঘ সময়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে একজন শিক্ষার্থী, তার অভিভাবককে ব্যয় করতে হয় মূল্যবান সময় ও অর্থ। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি নতুন স্থানে পরীক্ষা দিতে গিয়ে নানা রকম মানসিক চাপে থাকেন এইচএসসি উত্তীর্ণরা।

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তির সুযোগ বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু মাহবুব হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংস্কার নিয়ে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তাব দেন।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এই প্রস্তাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নাকচ করে দেয়। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিক কমিটি এবং সিন্ডিকেটে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্তের কথা জানাতে চেয়ে সময়ক্ষেপণ করে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৩ সালে উপাচার্যদের নিয়ে বৈঠকে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই গুচ্ছভিত্তিক ভর্তির পক্ষে মতামত দিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেয়।

ওই বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অভিন্ন পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণাও দেয়, কিন্তু সিলেটের স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার মুখে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।

গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষায় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যায়, বিশেষায়িত যেমন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্যাটাগরি ভিত্তিতে পরীক্ষা নিতে পারবে, এতে একাধিক বিশ্ববিদ্োলয়ে আলাদা পরীক্ষার প্রয়োজন পড়বে না।

গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমে আসবে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান একে আজাদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, বড় বড় বিশ্ববিদ্যারয়গুলো নিজেদের মত করে পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট নিজেদের স্বতন্ত্র মান বজায় রাখতে চায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।-ঢাকাটাইমস

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত