টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পূর্বাঞ্চলে অনিয়মেই হচ্ছে ট্রেন দূর্ঘটনা, দায়িত্বে দায়সারা কর্মকর্তারা

নুরুল ইসলাম

tranচট্টগ্রাম, ০৮ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) :   আশংকাজনকভাবে রেল দূর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন কোন না কোন স্থানে রেলক্রসিংয়ে চলন্ত ট্রেনের সাথে যাত্রীবাহী লেগুনা বাস, ট্রাক ও টেম্পুর মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হচ্ছে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় ট্রেন লাইনচ্যুত্যের ঘটনাও।

রেলের পরিসংখ্যানে তেলবাহি ওয়াগন দূর্ঘটনাসহ গত ৯ মাসে ১১১ টি দূর্ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে নিহত হয়েছেন পথচারিসহ ১৩ জন ও আহত হয়েছেন ৪৮ জন সাধারণ মানুষ। শেষ কয়েক মাসে নিহত ও ট্রেন লাইনচ্যুতের ঘটনা বেশী ঘটেছে। ফলে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের দূর্ভোগও বাড়ছে। তবে পূর্বাঞ্চলের জিএম মো. মোজাম্মেল হকসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও মনিটরিং এর কারণে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

দায়িত্বশীল রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। মহাপরিচালক দেশের বাইরে আছেন, তিনি আসলেই বিস্তারিত বলতে পারবেন। মিডিয়ার সাথে কথা বলার আমি অথরিটি না।’- এটা বলেই ফোন কেটে দেন। অভিযোগ রয়েছে, এডিজি হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও নানান অভিযোগের কারণে ওএসডি করা হয়েছিল। নিজের অপকর্মকে লুকিয়ে ‘কৌশলে পদোন্নতি নিয়েছেন মোটা অংকের বিনিময়ে। তার বিরুদ্ধে দুদকেও তদন্ত চলছে।

গতকাল শনিবার কুমিল্লার সদর রসুলপুর নামক স্থানে ‘রংপুর গেইন’ নামের একটি ট্রেনের তিনটি খাবারের বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে একটি বগি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ৪টায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্তও চট্টগ্রাম-ঢাকা, চট্টগ্রাম-সিলেটসহ সারাদেশের সাথে ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

আবার চালক ও গার্ডরা অভিযোগ করে জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও বগির কারণেও ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে। একই সাথে রেললাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ক্রুটি, লাইন ক্ষয়, নষ্ট স্লিপার, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকার কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। আর দুর্ঘটনার পর পরই দায় এড়াতে তাদের কাউকে কাউকে লোক দেখানোভাবে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে কিছুদিন পরেই তা স্বাভাবিক হয়ে আসে। তারা আরো বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলেই জনমনের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরাতে নিরীহ ট্রেনচালক ও গার্ডকে বলির পাঠা বানানো হয়। অথচ রেলের নিয়মানুসারে প্রতিদিন ৩ বার পর্যায়ক্রমে পুরো লাইন, সিগন্যাল ও ব্রিজ পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। একই সাথে প্রতিটি ট্রেন ছাড়ার আগে ইঞ্জিন ও প্রতিটি বগির বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ ও চাকা চেক করার কথা। এগুলো কিছুই করেন না দায়িত্বশীলরা।

রেল শ্রমিক নেতা কামাল পারভেজ বাদল বলেন, এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত হচ্ছে। রেল কর্মকর্তারা শুধু কর্মচারিদের দোষ খুঁেজন। নিজেরাই দায়িত্বহীনভাবে কাজ করেন, মনিটরিং করেন না, শুধু লীজ ট্রেন, টেন্ডারসহ অবৈধ কাজ করতে ব্যস্ত থাকেন। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেকেই পদোন্নতি নিয়ে অনিয়ম শুরু করেছেন। যা নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বের হবেই।

রেলওয়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত তেলবাহি ওয়াগন দূর্ঘটনাসহ গত ৯ মাসে ১১১ টি দূর্ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে বিভিন্ন স্থানে নিহত হয়েছেন পথচারিসহ ১৩ জন ও আহত হয়েছেন ৪৮ জন সাধারণ মানুষ। দূর্ঘটনায় ঢাকা বিভাগে নিহত হয়েছে ১১জন, মোট ৪৯টি দূর্ঘটনার মধ্যে মেইন লাইনে ৩৮টি, লুপ লাইনে ১টি, শাখা লাইনে ১টি, ইয়ার্ডে ৯টি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬২টি দূর্ঘটনার মধ্যে নিহত হয়েছেন ২জন, মেইন লাইনে ২৮টি, লুপ লাইনে ২টি, শাখা লাইনে ৭টি, ইয়ার্ডে ২৫টি। এগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩২টি ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৪টি লাইনচ্যুতের ঘটনা ঘটে। এতে এলসি গেইটে দূর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকায় ৬টি ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৭টি এবং বিবিধ দূর্ঘটনা ১২টি। এ দূর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ওভার সূটিং ৭টি, ট্রেন পার্টিং ৬টি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ যথাযথ কোনো ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হচ্ছে না। দুর্ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন বা সংশ্লিষ্টদের তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত করে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছেন। কিন্তু গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর কোনো প্রতিবেদনই কোনোদিন আলোর মুখ দেখছে না। কিছু কিছু দেখা গেলেও পরস্পরকে রক্ষা করেই দায়সারাভাবেই দেয়া হয়েছে।

গত ১৯ জুন দুপুরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বেঙ্গুরা এলাকায় রেলের ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। এরপর গত বুধবার বিকালে ভেঙে যাওয়া ২৪ নম্বর ব্রিজটি মেরামত করে রেলের প্রকৌশল বিভাগ। দুর্ঘটনার পর পরই রেলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ঘটনায় রেলের দুই প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এতে তিনদিনের তদন্ত রিপোর্ট ২৭দিনে জমা দিলেও রিপোর্টটি দায়সারা গোসের হওয়ায় প্রধান সংকেত কর্মকর্তাকে আহবায়ক করে পুন:তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে ৩০ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত জমা দেননি বলে জানান আহবায়ক চন্দন দে। এর আগে বড় আরেকটি ঘটনার মধ্যে গত ২২ জুন গেহুারিয়া-ফতুল্লায় লেগুনার সাথে ট্রেনের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৫জন নিহত হয়েছিল। এতে লেগুনার গাড়ি চালককে দায়ি করে তদন্ত কমিটি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত