টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

একটি ভিডিও বদলে দেয় মুস্তাফিজকে!

spচট্টগ্রাম, ০৪ আগস্ট (সিটিজি টাইমস) : বল হাতে যতটা দুর্বোধ্য, বল ছাড়া ততটাই সহজ। সরল। তবে অভিষেক দিনের সেই মুস্তাফিজ আর এই মুস্তাফিজে ঢের তফাৎ। এখন তার কথাবার্তায় ফুটে ওঠে ‘পোড় খাওয়া যোদ্ধা’র দর্শন। গতকাল ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে নিজেকে নিয়ে বললেন অনেক অজানা কথা। হোটেল সোনারগাঁওয়ের লবিতে যেন ফুটে উঠলেন অন্য এক মুস্তাফিজ হয়ে।

পাঠকদের জন্য মুস্তাফিজের এই কথোপকথনটি তর্জমা করেছেন অমৃত মলঙ্গী:

-সোনারগাঁ হোটেলে তখন বাড়ি ফেরার আমেজ। টানা খেলার ভেতর থেকে সাকিবরা ঘরে ফিরতে ব্যকুল। সফরকারীরাও। সৌম্য, মুশফিকরা কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। কেনাকাটা করতে। মুস্তাফিজ আসলেন। চেয়ার টেনে বসলেন। ধারণা ছিল ১৫-২০ মিনিট হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। কিন্তু মুস্তাফিজ অবাকই করলেন। ঘণ্টাব্যাপী কথা বলে গেলেন।

আলাপের শুরুতে উঠল ‘কাটার’ প্রসঙ্গ। যা বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে তার কল্যাণেই। মুস্তাফিজ যখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলতেন, তখন কিন্তু তার কাটার এতটা ধারালো ছিল না। সে কথা মনে করিয়ে দিতে বললেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৯ এ একটা সময় ছিল, যখন আমি ওভারে পাঁচটা ইয়র্কার মারতে পারতাম। নতুন বল হোক আর পুরনো হোক, সেটা আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না। আমি প্রথম বল থেকেই ইয়র্কার দিতে পারতাম। মাঝে মাঝে (সরওয়ার) ইমরান স্যার আমাকে বুঝাতেন এত ইয়র্কার মারলে বল নষ্ট হয়ে যাবে। আমি শুনতাম না। নতুন কোনো ব্যাটসম্যান ক্রিজে আসলেই আমি ইয়র্কার মারতাম। কিন্তু আমি মনে করি স্যারই ঠিক, তিনি চাইতেন আমি যেন বল সুইং করাই।

মালিঙ্গার ওভাবে বল করার পেছনে আলাদা একটা কারণ আছে। ছেলেবেলায় তিনি সমুদ্র সৈকতে বল করতেন। খুব বাতাস হতো। বলের গতি বাড়াতে একটু টেনে ডেলিভারি দিতেন। সেই থেকে ওই অভ্যাসটা তার অবচেতন মনে গেঁথে যায়। মুস্তাফিজেরও এমন একটা কাহিনী আছে, ‘গ্রামে আমার স্কুলের ফুটবল মাঠে এক কোনায় আমি বল করতাম। ওখানে স্ট্যাম্পের সামনে দাগ কেটে মারুতি (বিশেষ এক ধরনের শক্ত বল) বল দিয়ে প্রাকটিস করতাম। একটা দাগ কাটতাম গুড লেন্থের জন্য, আরেকটা ইয়র্কারের জন্য। প্রতিটি দাগে আমি দশটা করে বল ফেলতাম। ওই অভ্যাসটাই আমাকে সাহায্য করেছে। যত ভালো ব্যাটসম্যানই হোক না কেন, সঠিক যায়গায় বল ফেলতে পারলে তাকে সমস্যায় পড়তেই হবে।’

আজ যে কাটার দিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন, সেই কাটার কিন্তু তাকে কেউ শেখাননি। একবার জাতীয় দলের নেটে এনামুল হক বিজয় এবং শামসুর রহমান শুভকে বল করার সময় হঠাৎ কাটার দেয়া শুরু করেন। সেদিন বল কাট করানোর চেষ্টা করতে বলেছিলেন বিজয়। এ কথা মুস্তাফিজ আগেও গণমাধ্যমে বলেছেন।

‘এটা আমি নিজে নিজেই শিখেছি। অনূর্ধ্ব-১৯ এ খেলার সময় জাতীয় দলের নেটে বল করতাম। তখন ম্যাচে আমি বেশি কাটার দিতাম না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের সময় নেটে বিজয় আর শুভ ভাইয়ের বিপক্ষেই প্রথম কাটার দেয়া শুরু করি। আমার মনে হয়, জাতীয় ক্রিকেট লিগে আমার কাটার বেশি প্রভাব ফেলেছিল। পাঁচ ম্যাচে ওখানে ২১ উইকেট নিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে এর মধ্যে ১৫টি ছিল কাটার ডেলিভারিতে!’ বলেন মুস্তাফিজ।

মুস্তাফিজের কাটারের কথা বলতে যেয়ে ধোনি বলেছিলেন, ‘অবাক করার বিষয় হলো সে সমান গতিতে বল কাট করাতে পারে। যা একজন ব্যাটসম্যানের পক্ষে বোঝা কঠিন। বল আসার আগে বোঝাই যায় না বলটি স্লো হবে কি না।’

মুস্তাফিজও বললেন তিনি দুই ধরনের কাটার দিতে পারেন, ‘আমি দুই প্রকার কাটার পারি। একটা খুব দ্রুত আরেকটা একটু স্লো। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘণ্টায় ১৩৫-১৩৬ কিলোমিটারের পাশাপাশি ১২৮-২৯ কিলোমিটার গতিতে বল কাট করিয়েছি।’

স্লোয়ার কাটারটা সম্প্রতি শিখেছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি দ্রুত গতির কাটারই সবসময় করতাম। স্লোয়ারটা কিছুদিন আগে শিখেছি। বামহাতি ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বল করতে আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। তাই প্রাকটিসে সাকিব ভাই এবং সৌম্যকে বল করার সময় স্লোয়ার নিয়ে কাজ করি। আমি দেখছিলাম তারা কীভাবে খেলে। দুটি ডেলিভারিই ভিন্ন ভিন্ন। একটা করার সময় আমার মুভমেন্ট স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু আরেকটি করার সময় আমার হাত পুরোপুরি ঘুরে যায়। ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই প্রথম স্লোয়ার কাটার দেই। প্রথম ওয়ানডের পর দুই দিন বিশ্রাম ছিল। সেই ফাঁকে ওটা শিখে নেই।’

সতীর্থরা তার এই কাটার সম্পর্কে কী বলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতে মুস্তাফিজ বলেন, ‘মনে করেন আমরা চারজন পেসার এক সঙ্গে বসে আছি। তখন সাকিব ভাইরা বলেন ওখানে তিনজন পেসার আর একজন স্পিনার আছে! আমি টার্ন করাতে পারি, এজন্য মজা করে এটা বলেন।’

অভিষেকে নার্ভাস ফিল করেননি এমন ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাকিব তার অভিষেক ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৬৪ বলে ৩০ করেছিলেন। এরপর একটা সময় অভিষেকের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ওই দিন মনে হচ্ছিল বল খুব ভারি। যত জোরেই মারি যেন নড়ছিল না!’ মুস্তাফিজের বেলাও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বললেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের সময় ড্রেসিংরুম থেকে মাঠেই আসতে পারছিলেন না। শরীর কাঁপছিল। আবুল হাসান রাজুকে বলেন তাকে ধরে নিয়ে যেতে, ‘রাজু ভাইয়ের হাত ধরে মাঠে ওয়ার্ম-আপ করতে নামি। মনে হচ্ছিল আমি কিছু বুঝতে পারছি না। যেন স্বপ্ন। একসময় দেখি আমি মাঠে। ভেবেছিলাম শেষ দিকে বল করতে হবে। কিন্তু মাশরাফি ভাই আমাকে অবাক করে বললেন, তুই শুরু কর! আমি তাকে শুধু বললাম, শেষ দিকে করলে হয় না। কিন্তু ভাই কথা শুনলেন না। আমার হাতে বল তুলে দিলেন। দর্শকদের ওই গর্জন শুনে সত্যি আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম ডেলিভারির পর তারা যখন আমার জন্য চিৎকার শুরু করল, তখন সব ভয় উধাও হয়ে যায়। সেই থেকে উপভোগ করছি। আজও তা চলছে।’

মুস্তাফিজকে দেখে আসলে বোঝার উপায় নেই লিকলিকে এই ছেলেটা এত সাহস রাখেন। চোখেমুখে দৃঢ়তা এনে বললেন, ‘সাধারণত আমি কোনো ব্যাটসম্যানকে ভয় পাই না। আমি তার বিরুদ্ধেই বল করতে ভালোবাসি, যে হিট করতে ভালোবাসে। আইপিএল এ জন্য সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিজে থেকে অনেক কিছু করার থাকে। মাঝে মাঝে আইপিএল দেখলেও ক্রিকেট খেলা দেখতে আমার ভাল লাগে না। বরং খেলতে ভালো লাগে।’

‘জাতীয় দলের প্রাকটিসের সময় সাব্বির ভাই এবং বিজয় ভাইয়ের বিপক্ষে বল করতে ভালো লাগে। তারা সব সময় আক্রমণাত্মক শট খেলে। এ জন্যই স্বপ্ন দেখি ক্রিস গেইলের বিপক্ষে বল করার।’

ক্রিকেট বদলে দিয়েছে সাতক্ষীরার এই তরুণের জীবন। আগের মতো একা একা চলাফেরা করতে পারেন না। এ যেন খ্যাতির বিড়ম্বনা। প্রসঙ্গটা উঠতেই আপসোস ঝরে মুস্তাফিজের কণ্ঠে, ‘সবাই বলেন আমি নাকি তারকা হয়ে গেছি। আমি তাদের বলি, আমি আগের সেই মুস্তাফিজই আছি। পরিচিতরা এসব বলে কারণ তাদের আমি বেশি সময় দিতে পারি না। কিন্তু আমি এতটুকু বদলাইনি।’

মুস্তাফিজ এক সময় খুলনার অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে খেলতেন। তার আগে সেভাবে ক্রিকেট নিয়ে তার তাড়না শুরু হয়নি। বদলে যাওয়ার শুরু মাশরাফি এবং সাকিবের একটি ভিডিও দেখে, ‘শেখ সালাউদ্দিন স্যারের ল্যাপটপে একটা ভিডিও ছিল। একদিন তিনি সেটা আমাদের দেখান। কীভাবে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা অনুশীলন করে, ভিডিওতে সেটাই ছিল। আমি দেখি মাশরাফি ভাই এবং সাকিব ভাই ভিডিওতে বল করছেন। সেদিন থেকেই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখতে থাকি। ভাবি কবে যে খেলতে পারব!

কথার ফাঁকে মুস্তাফিজ বললেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম নিয়ে একটি রহস্যের কথা, ‘প্রথম প্রথম ড্রেসিংরুমের সোফায় বসতাম না। একটা চেয়ার থাকত, সেটাতেই বসতাম। কিন্তু সবাই বলতেন, তুমি এমন করছ কেন। সোফায় এসে বস। কোনায় একটা যায়গা ছিল, যেটাকে সবাই ‘আনলাকি কর্নার’ বলে। ওখানে কেউ বসতে চায় না। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নেই, ওখানে বসব। আমি আসলে জানি না কেন ওই কর্নারটাকে অপয়া বলা হয়। সিনিয়ররাই এমনটা বলেন। এটা জেনেও লিটন দাস এবং জুবায়েরের সঙ্গে আমি ওখানে বসি। আমি নিজেকে বলতাম, এই কোনার ভাগ্যটাকে পরিবর্তন করতে হবে।’

মাশরাফি কেমন? প্রশ্নটা করতেই চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ১৯ বছরের এই তরুণের, ‘ভাইয়ের কথা আর কী বলব। তিনি একটা অন্য জগতের মানুষ। দল বা কারো খারাপ সময়ে তিনি যেভাবে উৎসাহ দেন, তার তুলনা হয় না। যেদিন ২০০ উইকেট পেলেন, আমাকে বললেন, দেখিস তুই একদিন ৪০০ উইকেট নিবি…।’ এরপর মুস্তাফিজ আর কথা বলতে পারেন না। ঠোঁটে মৃদু কম্পন। চোখটা কেমন দেখা যায়। যেন ‘চোখে হাসি মুখে কাঁদন। কী যাদু-মন্ত্রে গড়া বাঁধন!’

মতামত