টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সাকার রায় দ্রুত কার্যকর চান নূতন চন্দ্রের ছেলে

CTG-NEWSচট্টগ্রাম, ২৯জুলাই (সিটিজি টাইমস): মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে বহাল থাকায় রাউজানসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ স্বস্তি ও উল্লাস প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় মিষ্টিও বিতরণ করা হয়েছে। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার নূতন চন্দ্র সিংহের পরিবারসহ ভুক্তভোগী অন্য পরিবারগুলো। তাদের সবারই প্রত্যাশা দ্রুত এ রায় কার্যকর করবে সরকার।

বুধবার সকালে সাকা চৌধুরীর আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন।

শুধু গণহত্যাই নয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, বোয়ালখালী ও চট্টগ্রাম শহরে ধর্ষণ, লুটপাট, হিন্দুদের বাড়ি দখল ও তাদের দেশান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

সাকা চৌধুরীর নিজের এলাকা রাউজানে রায় ঘোষণার পর উল্লসিত জনতা মিছিল করে রাজপথে নেমে আসে। বিশেষ করে সাকার অন্যতম নির্যাতন ও খুনের সাক্ষী কুণ্ডেশ্বরী ভবনসহ রাউজান সদর, গহিরা, জগৎমল্ল পাড়া, উনষত্তরপাড়া, সুলতানপুর এলাকার জনগণ আনন্দ উল্লাস করে। তারা অবিলম্বে সাকার ফাঁসি কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সাকাবাহিনীর বর্বরতায় নিহত চট্টগ্রামের রাউজানের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহের ছেলে ও এই মামলার সাক্ষী প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি মনে করেছিলাম বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী সাকার ফাঁসি হয়ত জীবিত থাকতে আর দেখে যেতে পারব না। কিন্তু আজ আমি খুবই আনন্দিত ও উৎফুল্ল এই ভেবে রায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে। কারণ তার নির্মমতা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। যে তার ওই নিষ্ঠুর চেহারা দেখেনি সে কখনো বিশ্বাস করতে পারবে না তার স্বরূপ।

আর এক ভুক্তভোগী সাক্ষী ব্যবসায়ী সিএ্যান্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ম. সলিমুল্লাহ জানান, ‘৭১ তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাসভবন গুডস হিলে তার ছেলে সাকা বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম আমি। তার নির্যাতনের চিত্র চোখে ভেসে উঠলে এখনো শরীর কেঁপে উঠে। কিভাবে বেঁচে ফিরেছিলাম একমাত্র আল্লাহ জানেন। তবে এতোদিন শুধু তার মৃত্যুই কামনা করেছিলাম। এখন ভাল লাগছে তার মৃত্যু দেখে যেতে দিবেন মহান সৃষ্টিকর্তা। সাকার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দ্রুত কার্যকরের আহ্বান জানাচ্ছি সরকারের কাছে।

ভুক্তভোগী ও সাক্ষী শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানান, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ মোহাম্মদ আলমগীরকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে দিয়ে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন সাকা চৌধুরী। তাদের লাশ পর্যন্ত পাইনি আমরা। বাবা ও ভাইয়ের সেই শোক এখনো ভুলিনি। এতোদিন সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছিলাম। এখন তার ফাঁসি কার্যকর হবে সে অনেক আনন্দেও যা ভাষায় বুঝাতে পারব না। সাকার এই রায় বাংলাদেশে ইতিহাস হয়ে থাকবে। আর অন্য কোনো পশুও যাতে সাকার মতো মানুষকে নির্যাতন না করে।

অন্য সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা কাজী নুরুল আবসার জানান, যুদ্ধাপরাধী সাকার এ রায়ে খুব খুশি হয়েছি আমি। জাতি প্রত্যাশিত রায় পেয়েছে। সাকার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ন্যায্য রায় জনগণ পাবে কি না, শঙ্কায় ছিলাম আমরা। কারণ এ রায় নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কথা শুনেছিলাম। সরকার কোনো চক্রান্তের শিকার হতে দেয়নি। তবে অবিলম্বে এ রায় কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।

ক্যাপ্টেন মুক্তিযোদ্ধা এসএম মাহবুবুল আলম জানান, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর হলেও আমরা ন্যায্য বিচার পেয়েছি। সাকার নির্যাতনের শিকার হওয়া জনগণই কেবল জানে কত কঠিন ও নির্মম ছিল তার নির্যাতন। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে এ রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।

গণজাগরণ মঞ্চের সদস্য ও উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাশ বলেন, একজন গণধিকৃত যুদ্ধাপরাধী রাজনীতির নামে পুনর্বাসিত হয়ে মন্ত্রী-এমপি হয়েছিলেন এটা আমাদের জন্য লজ্জার। রায়ে সবচেয়ে বেশি খুশী হয়েছি আমরা। সকল প্রকার পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল রেখেছে এতেই আমরা আনন্দিত।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাকা চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী কাজী নূরুল আবসার বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের জঘন্য একজন নরঘাতক। আপিল বিভাগের এ রায়ে যেন দ্রুত সাকা চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়।

এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলার রায়ে চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে বুধবার ভোর থেকে নিরাপত্তা জোরদার করে প্রশাসন। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। রিজার্ভে রয়েছে শিল্প পুলিশ, এপিবিএন, স্ট্রাইকিং ফোর্সসহ বিজিবি।

মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই বছরের ২৯ অক্টোবর খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে আপিল করেন সাকা চৌধুরী। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ। গত ৭ জুলাই যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আপিল শুনানি শেষ হওয়ায় ২৯ জুলাই রায়ের দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ। গত ১৬ জুন শুরু হয়ে ১৩ কার্যদিবসে এ আপিল শুনানি শেষ হয়। ৫ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত তিন কার্যদিবসে সাকা চৌধুরীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এসএম শাহজাহান। গত ৩০ জুন এবং ১ ও ৭ জুলাই তিন কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা পঞ্চম আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হল। ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ১৭টির পক্ষে সাক্ষী হাজির করেন রাষ্ট্রপক্ষ। এগুলোর মধ্যে মোট ৯টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। বাকি আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে চারটিতে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে ২০ বছর এবং আরও দু’টি অভিযোগের প্রতিটিতে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব মিলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মোট ৭০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত