টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬২০ টাকার মিটার বাবদ নিচ্ছে ২ হাজার টাকা!

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ২৮ জুলাই (সিটিজি টাইমস): মিরসরাইয়ে পল্লী বিদ্যুতের ৬২০ টাকার মিটার গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকায়। জানা গেছে গত ১৪-১৫ অর্থবছরে মিরসরাইয়ে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় ৮ হাজার ৯শ গ্রাহককে। চলতি ১৫-১৬ অর্থবছরে নতুন সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার। মিটারের জামানত ও সদস্য বিল বাবদ ৬২০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও গ্রাহক প্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৫’শ থেকে ২হাজার টাকা পর্যন্ত। পল্লী বিদ্যুতের অনুমোদিত ইল্কেট্রেশিয়ান, সমিতির পরিচালক ও সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরা ছাড়াও অতিরিক্ত টাকার একটি অংশ যায় পল্লী বিদ্যুতের অফিসের কর্মকর্তাদের পকেটে। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের মিটার দেওয়ার সময় অনুষ্ঠানের খরচ বাবদ ও সংযোগ পরীক্ষা করতে আসা লাইনম্যানের খরচের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবী করেন অধিকাংশ ইল্কেট্রেশিয়ান। গ্রাহদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণে সম্প্রতি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর অনুমোদিত ইল্কেট্রেশিয়ান ফারুকের। তিনি উপজেলার রহমতাবাদ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার দেওয়ার জন্য প্রতি গ্রাহক থেকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। ইল্কেট্রেশিয়ান ও সরকার দলীয় লোকদের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের অর্জন।

জানা গেছে, নতুন সংযোগ পাওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকদেরকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে হয় সমিতি বরাবর। অনলাইন খরচ বাবদ গ্রাহক প্রতি দিতে হয় ৮০-১০০ টাকা। অনলাইন আবেদন শেষে আবেদন কপি সহ অফিসে ১০০ টাকা জমা দিয়ে জমা স্লিপ নিতে হয়। গ্রাহকের নিজ খরচে ঘরের ওয়ারিং শেষে মিটারের জন্য আর্তিং রড বসাতে হয়। আর্তিং রডের দাম হলো ৪৮০-৫০০ টাকা। আর্তিং রড বসানোর পর মিটারের জন্য আবেদন করতে হয়। মিটারের জামানত ও সদস্য সংগ্রহের বিল বাবদ অফিসে ৬২০ টাকা জমা দিতে হয়। অফিসে শুধু আবেদন ফি এবং মিটারের জামানতের টাকাই দিতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় নতুন সংযোগ দেওয়ার সময় গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটার প্রতি নেওয়া হয়েছে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রায়পুর এলাকায় উদ্বোধন হওয়া ৮০টি পরিবারের প্রত্যেক থেকে মিটারের খরচ বাবদ নেওয়া হয় ১২শ ৫০ টাকা করে। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও আওয়ামীলীগ নেতা নবী মেম্বার বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানের খরচ বাবদ গ্রাহকদের থেকে নেন এই অতিরিক্ত টাকা।

উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের খিল মুরালী গ্রামে ৭’শ গ্রাহকের কাছ থেকে ১৪’শ টাকা করে সংগ্রহের খবর শুনে পল্লী বিদ্যুতের মিরসরাই-৩ নং এরিয়ার পরিচালক আলী আহসান খিল মুরালী গ্রামে একটি সাব-অফিস বসিয়ে তিন কিস্তিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬২০ টাকা করে মিটারের টাকা সংগ্রহ করেন। যে সকল গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়েছে তা ফেরত দেন।

জুলাই মাসের শুরুর দিকে উপজেলার রহমতাবাদ এলাকায় ৮’শ গ্রাহকের মাঝে বিদ্যুত সংযোগ দেওয়ার জন্য আর্তিং রড, ওয়ারিং, মিটারের খরচ বাবদ ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অনুমোদিত ইল্কেট্রেশিয়ান ফারুকের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ লাইসেন্স বাতিল করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে জিডি করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নের বড়ুয়া পাড়ায় ৭’শ ও হাশেম নগর এলাকায় ৪শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে ১৪শ-১৫শ টাকা পর্যন্ত মিটার প্রতি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য মিটারের খরচ বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান বলেন, ‘মিটারের জন্য অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে আমার কাছে উপজেলার পূর্ব বাড়িয়াখালী গ্রাম থেকে অভিযোগ এসেছে। এই বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার অন্য কোথাও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে আমি অবগত নই। অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে যদি আ’লীগের কোন নেতাকর্মী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিরসরাইতে চলতি বছরের মধ্যে প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে একটু দেরী হলে গ্রাহকরা অস্থির হয়ে পড়েন। তারা অতিউৎসাহী হয়ে এলাকার কিছু টাউট নেতাদের ধরেন দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য। ওইসব নেতারাই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়।’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর পরিচালক আলী আহসান বলেন, দুর্বলতার সুযোগ পেয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন কিছু দুষ্কৃতকারী। যেসব গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে তিনি তাদেরকে ডিজিএম বা সমিতির পরিচালকদের সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন।

গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটারের খরচ বাবদ অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম এমাজ উদ্দিন সরদার বলেন, নতুন সংযোগ দেওয়ার জন্য মিটারের খরচ বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬২০ টাকার অতিরিক্ত নেওয়া হয় না। কিছু কিছু এলাকায় মিটারের খরচ বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার খবর পেয়ে আমরা ওই সব এলাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেছি। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে গ্রাহকরা যদি অফিসে অভিযোগ করে তাহলে এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত