টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে ‘আবেগ’

CTG-NEWSচট্টগ্রাম, ১১ জুলাই (সিটিজি টাইমস):স্মৃতির বেদি ‘আবেগ’ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। হাসিখুশি সতেজ ৪৩ স্কুলছাত্র রয়েছে নিঃশব্দে নিরবে। তাদের কোথাও কোনোরকম সারাশব্দ নেই, রয়েছে শুধুই স্মৃতি। আজ কেউ আর স্কুল প্রাঙ্গণে খেলার ছলে ছুটাছুটি করে না।

সবার অজান্তে সকাল থেকে স্বজনরা এসে বুকের অজানা ব্যাথার কিছুটা যেন হালকা করে দিয়ে গেলেন। কে বুঝবে বাবার কাঁধে ছেলের লাশ যেমন পৃথিবীর সবচাইতে ভারি বোঝা, তেমনি মায়ের কাছে সন্তানের নিথর মুখখানি দেখার যন্ত্রণা।

২০১১ সালের ১১ জুলাই দিনটি শোক আর মাতমের। সেদিন ঝড়ে পড়েছিল ৪৫টি তাজা প্রাণ। আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ৪৫টি প্রোট্রেট আর কবিতা নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতির বেদি ‘আবেগ’ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে আজ।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ স্কুলছাত্র, এক গ্রামবাসী ও এক অভিভাবক মুহূর্তেই পাড়ি জমিয়েছিল মহাকালের তিমিরে। আর ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’ নামের কঠিন ওই ইতিহাস চার বছর অতিক্রম করে আজ পাঁচ বছরে পা দিল। হয়তো এক সময় একে একে গড়িয়ে তলিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে।

কিন্তু আজ (শনিবার) আরও একবার এলাকার পরিবেশ আর বাতাস ভারি হয়ে এসেছে সন্তানহারা মঞ্জুরা, আমেনা, রোকেয়া আর কল্পনাদের মত মায়ের কান্না ও আর্তনাদে। মিরসরাই আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে তৈরি হয়েছে শোকের আবহে গগনবিদারি কান্নার মঞ্চ। এভাবেই পালিত হবে আমরণ সেই শিশু-কিশোরের মা-বাবাদের কাছে। কান্নার ফাঁকে ভাবছেন নিজের ছেলেটি আজ বেঁচে থাকলে বয়স এখন হতো পনের, ষোল কিংবা সতের।

নিহত ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র রাকিবুল ইসলামের মা দিল আফরোজ বেগম ছেলের শোকে এখনো কান্নায় গলার শব্দ আটকে যায়। ছেলের কবরের পাশে গিয়ে নীরবে কাঁদেন মা।

মঘাদিয়া শেখের তালুক গ্রামের পাগলা ওয়ালী চৌধুরী বাড়ির এই মায়ের মত ৪৪ নিহতের মা-স্বজনরা মঘাদিয়া ও মায়ানী গ্রামে আজও পুত্রশোকে কাঁদেন।

তবে ওই ইতিহাসের রচয়িতা বাসচালক মফিজ এখন চট্টগ্রামের কারাগারে। পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে প্রায় চার বছর পার করে ফেলেছেন। আগামী বছর পূর্ণ না হতেই এই ৪৫ প্রাণঘাতক জেল থেকে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ৪৫ জন কি ফিরে আসবে, নাকি নিরাপদে সতর্ক গাড়ি চালাবে মফিজের মতো অন্য সব চালকরা?

মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কবির নিজামী জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিদ্যালয় মিলনায়তনে খতমে কোরআন এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল সাড়ে ১০টায় শোক র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শেখ আতাউর রহমানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন। র‌্যালি শেষে শহীদ স্মৃতিসৌধ ‘আবেগ’ এ পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।

আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক বলেন, নিজের সন্তানের শোক কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। শুধু স্মরণীয় করে রাখতে চাই সারাজীবন। সকালের অনুষ্ঠান শেষে বিকেল ৩টায় নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠিত হবে স্মৃতিচারণ সভা, ইফতার ও জেয়াফত।

এতে প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান।

এছাড়া দিনটিকে সামনে রেখে এ বছর টানা চারদিনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে শুক্রবার সকাল ১১টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সাংবাদিক এনায়েত হোসেন মিঠুর সম্পাদনায় ‘শোকের পলক’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এটি মোড়ক উন্মোচন করেন প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল আবছার। রবিবার অনুষ্ঠিত হবে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। সোমবার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণসভা, মিলাদ, দোয়া ও ইফতার মাহফিল। নিহতদের স্মরণে সর্বস্তরের মানুষের জন্য আয়োজন করা হবে ইফতার ও কাঙালিভোজের।

২০১১ সালের ১১ জুলাই সোমবার দুপুর দেড়টায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল ৪৫ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৪৩ জনই ছিল মঘাদিয়া ও মায়ানি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের শিক্ষার্থী। মীরসরাই স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা শেষে আনন্দ মিছিল নিয়ে একটি মিনি ট্রাকে করে যাচ্ছিল সবাই। হঠাৎ ট্রাকটি খাদে পড়ে উল্টে গেলে সকল শিশু কাদা আর পানির ভেতরে আটকা পড়ে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ৩৯ জন শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে আহতদের মধ্যে হাসপাতালে মারা যায় ছয়জনসহ সর্বমোট ৪৫ জন।

মতামত