টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাই ট্র্যাজেডি: ‘এখনো গভীর রাতে কানে ভেসে আসে কান্নার রোল’

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ১০ জুলাই (সিটিজি টাইমস): ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’এক বিভীষিকার গল্পের নাম। একে একে ৪৫টি জীবনের কঠিন নিয়তির গল্প। ৪৫টি পরিবারের সারাজীবনের অশ্রুপাতের গল্প। মুহূর্তেই হইচই পড়ে গেল ঘটনাস্থলে। আশপাশের সবাই ছুটে এলো ঠিকই, বাঁচানো গেল না পিকআপের তলানিতে আটকে পড়া কোনো খুদে ছাত্রকে। একে একে নিষ্প্রাণ হলো ৪৫টি তাজা জীবন। বিশ্বের আলোচিত মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৪র্থ বর্ষপূর্তি আগামীকাল ১১ জুলাই। ২০১১ সালে দিনটি ছিল সোমবার। দুপুরের কড়া রোদ মাথার ওপর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ ধরে ছুটে চলছিল পিকআপ। পিকআপে বিজয়োল্লাস। উল্লাসে মাতোয়ারা আবুতোরাবের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের পৌনে একশ শিশু-কিশোর। চালকের সামান্য ভুলে এতগুলো খেলাপাগল শিশু-কিশোর নিয়ে পিকআপ সোজা গিয়ে উল্টে গেল পাশের ডোবায়।

Mirsarai-Tazedi-Photo-1দেখতে দেখতে ঘটনার চারটি বছর পার হয়ে গেলেও এখনো কান্না থামেনি সন্তানহারা মায়েদের। এখনো ছেলের ছবি নিয়ে নিরবে নিভৃতে কাদেন গর্ভধারিনী মায়েরা। গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে আদরের সন্তানকে খুঁজে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকেন অভাগীনি মা। গভীর রাতে ভেসে আসে কান্নার রোল। স্মৃতি বলতে শুধুমাত্র ছবির ফ্রেমই রয়েছে। পুত্রহারা পিতা-মাতারা সেই ছবি নিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে আহজারী করতে থাকেন। আবার কখনো কখনো নীরব নিস্তব্ধ হয়ে একেবারেই নির্বাক। দেখতে দেখতে চার’বছর পার করে দিলো মিরসরাই ট্র্যাজেডি। সন্তান জন্ম নেয়ার পর অনেক বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানের জন্মদিন পালন করে থাকেন। কাটা হয় কেক। আয়োজন করা হয় হয়ে থাকে রকমারির খাবারের। কিন্তু কোন মা-বাবা কি আদরের সন্তানের মৃত্যু বার্ষিকী পালন করতে পারে!।

২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ঘটেছিলো তেমনি একটি ঝড়। যে ঝড় কেড়ে নেয় ৪৫টি তাজা প্রাণ। ঝড়ের কবলে পড়ে পিতার কাধে উঠেছিল আদরের সন্তানের লাশ। ট্র্যাজেডীতে নিহতদের বাড়িতে স্বজনদের খোঁজ খবর নিতে গিয়ে এক হৃদয় বিদায়ক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আদরের সন্তানের স্মৃতি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তারা। ট্র্যাজেডীতে নিহত আনন্দ দাস, সাইদুল, নয়ণশীল, ইফতেখার, কামরুলের হতভাগীনী মায়েরা সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন, ছেলে বাড়ি ফিরবে মা বলে ডাকবে এ আশায়।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির চার বছরের পূর্ণ হওয়ায় স্মৃতিচারন করতে গিয়ে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক বলেন, দুর্ঘটনায় আমাদের স্কুলের ৩৪ জন ছাত্র মারা গেছে। তাদের শূন্যতা কখনো পূরন হবার নয়। এখনো মনে হচ্ছে তারা আমার আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। বিশেষ করে আবু সুফিয়ান, ধ্রুব নাথ ও কাজল নাথকে আমার খুব বেশি মনে পড়ছে। এরা তিনজনই খুব মিধাবী ছিল।

তিনি আরো বলেন, ট্র্যাজেডির সময় শিক্ষা-সচিব এসে আবুতোরাব বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার ঘোষনা দিলেও অদ্যবদি কিছুই হয়নি। এছাড়া দূর্ঘটনাস্থলে স্মৃতিস্তম্ভ অন্তিম নির্মাণ না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নতুন ভাবে বিশ্ববাসী চিনেনিল মিরসরাইকে:
একটি দুর্ঘটনা মিরসরাইবাসীকে বিশ্বের বুকে পরিচিতি এনে দিল। বাংলাদেশের শক্তিশালী মিডিয়ার বদৌলতে বিশ্ববাসী বাংলাদেশ তথা মিরসরাই বাসীকে নতুন করে চিনে নিয়েছিল। দূর্ঘটনার পর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, ডেনমার্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মানবাধীকার কর্মী, নাট্যকর্মী এসে সমবেদনাসহ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ধেমে ছিল না দেশের সমাজ সেবকদের সাহায্যের হাত।

বিভীষিকাময় সেদিন যা ঘটেছিল :
১১ জুলাই ২০১১, সোমবার : মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে একটি মিনি ট্রাকে করে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা আবুতোরাব এলাকায় যাচ্ছিল। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডোবায় উল্টে যায় মিনিট্রাকটি। যার নং চট্টমেট্রো – ড – ১১-০৩৩৭। ডোবার জল থেকে একে একে উঠে আসে লাশ আর লাশ। পরে সে লাশের রথ গিয়ে থামে পঁয়তাল্লিশে গিয়ে। অপর দিকে ছেলের মৃত্যু হয়েছে ভেবে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন এক বাবা হরনাথ। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর রাত ৯ টায় নয়নশীলের প্রয়ান পর্যন্ত ৪৫টি মৃত্যু গুনতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডী। ৪৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৮ ডিসেম্বর চালক মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ উদ্দিনকে দুটি ধারায় মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত।

আলোর মুখ দেখেনি স্মৃতি স্তম্ভ¢ ‘অন্তিম’ :
মিরসরাই ট্র্যাজেডির চার বছর পার হয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি স্মৃতি স্তম্ভ¢ ‘অন্তিম’। ঘটনাস্থলে নির্মানের জন্য গত বছরের ১০ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন গৃহায়ন ও গনপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। কিন্তু এখন শুধু ভিত্তি ফলক পড়ে আছে।

ঘুম ভাঙে না সুজনের :
আবু রিদোয়ান আজো প্রতি ভোরে আড়মোড়া চোখে ছেলের ঘুম ভাঙাতে চলতে শুরু করেন। খানিক বাদে মনে পড়ে ছেলে তো আর নেই। পেছন ফিরে যখন দেখতে পান সুজনের মা স্বামীর ছেলেশূন্যতার করুণ দৃশ্য দেখে নিরবে চোখের জল ফেলছেন, তখন নিজেও আর ধরে রাখতে পারেন না। হয়তো তিনি ভুলেই যান সুজনের ঘুম আর কখনোই ভাঙবে না। শুধু কি ভোরেই মনে পড়ে সুজনকে? বিকেলেও তো তা-ই হয়। খেলার মাঠে ছেলেকে খুঁজতে যান, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরাবেন বলে। মাগরিবের নামাজ সেরে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দিবেন বলে। ছেলেকে নিয়েই ছিল তার জীবন-কর্ম। ছেলের প্রাত্যহিক রুটিন নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন। কোন সময় খেলবে, পড়বে, ইবাদত করবে। এসব রুটিনের কথা ভেবেও আজ তিনি কাঁদেন। তবে সবার সামনে একদম পারেন না। নইলে যে সুজনের মায়ের বুকটা ফেটে যাবে। ছেলেহারা এক নারীর কান্না তিনি কি করে সইবেন।

খেলার মাঠে ছেলেকে না পেয়ে পাড়ার অন্য কিশোরদের মধ্যে নিজের ছেলেকে খুঁজে বেড়ান রিদোয়ান। কিন্তু কে হবে তার সুজন? অন্যের ছেলে কি রিদোয়ানের নতুন সুজন হতে পারে? কিছুতেই না। কারণ আবু রিদোয়ানের কাছে সুজন তো সুজনই।

এখনো থমকে দাড়ায় পথিক :
‘ডোবা’ নামের যে মৃত্যুকূপে নিমেষই ৪৫ টি সপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে সেটির সামনে আসলে আজো থমকে দাঁড়ায় পথিক। দীর্ঘশ্বাসের ভেলায় চড়ে সেই ভয়াল ক্ষণটিতে ফিরে যায় চলতি পথের যে কোন পথিক। স্মরণ করে মর্মস্পর্শি সেই সড়ক দুর্ঘটনার মূহুর্তটিকে। মনে করার চেষ্টা করে তার চেনা মুখগুলোকে। আর সেই পথিক যদি হন নিহতের কোন আত্মীয় তাহলে তাদের দীর্ঘশ্বাসের মাত্রাটুকু বেড়ে যায় বহুগুনে। প্রিয়জনকে হারানোর স্থানটুকুর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটি একটি দীর্ঘশ্বাসই তাদের সম্বল হয়ে উঠে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের বড়তাকিয়া বাজার থেকে আবুতোরাব যাওয়ার পথে চোখে পড়বে ডোবাটি। এলাকাবাসী ডোবটিকে এখন মৃত্যুকুপ নামেই চিনে।

চতুর্থ বার্ষিকীতে কর্মসূচী:
ট্রাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবুতোরাব বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ১১ জুলাই দিনব্যাপী কর্মসূচী রয়েছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে সকাল দশটায় কালো বেইজ ধারণ ও শোক পাতাকা উত্তোলন, তারপরে নিহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া প্রার্থনা, সাড়ে দশটায় শোক র‌্যালী, সকাল ১১টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ পুষ্পস্তবক অর্পন, বিকেল ৩ টায় শিক্ষার্থীদের স্মরণে আলোচনা সভা এবং নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া প্রার্থনা। সর্বশেষ ইফতার ও যেয়াফত। আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। কোরআনখানী, মিলাদ মাহফিল, সনাতন ধর্মাবলম্বী নিহত ছাত্রদের স্মরণে প্রার্থনা, স্মৃতিফলক ‘আবেগ’ এ পুষ্পস্তবক অর্পণও স্মরণ সভা। এছাড়াও নিহতদের স্মরণে আবুতোরাব উচ্চ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত জীবনের গল্প’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

এছাড়া আগামী ১৩ জুলাই মিরসরাই ট্র্যাজেডি উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে নিহতদের স্মরণে কোরআনখানী, মিলাদ মাহফিল, সনাতন ধর্মাবলম্বী নিহত ছাত্রদের স্মরণে প্রার্থনা, স্মৃতিফলক ‘আবেগ’ এ পুষ্পস্তবক অর্পণও স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ে মিরসরাই ট্র্যাজেডি উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে নিহতদের স্মরণে প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ ‘স্মৃতির পালক’ এর মোড়ক উন্মোচন করেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন।

মতামত