টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

তরল মাদক সনাক্তের প্রযুক্তি নেই চট্টগ্রাম বন্দরে

Cockne-চট্টগ্রাম, ১০ জুলাই (সিটিজি টাইমস):  চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরীক্ষণের একমাত্র উপায় হচ্ছে স্ক্যানিং। যাতে লোহা, সিলভার ও প্লাটিনাম জাতীয় পণ্য ছাড়া অন্য কোন পণ্য ধরা পড়ে না। বিশেষ করে তরল জাতীয় পণ্য এ পরীক্ষণের বাইরে থেকে যায়। তরল জাতীয় পণ্য পরীক্ষণে অন্য কোন প্রযুক্তিও নেই চট্টগ্রাম বন্দরে। এই সুযোগ নিয়েই এই বন্দর দিয়ে তেলের ড্রামে তরল কোকেন আনা হয়েছে বলে ধারণা করছেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

মাদকদ্রব্য পরীক্ষণে কোন রকম ব্যবস্থাই নেই বন্দরে। ফলে বন্দর দিয়ে প্রতিনিয়ত আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে হরেক রকম অবৈধ পণ্য ও মাদকদ্রব্য। এমন কথা স্বীকার করেছেন শুল্ক ও গোয়েন্দা দপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান।

সম্প্রতি বন্দরে তেলের সঙ্গে কোকেন পাচারের কথা তুলে ধরে মইনুল খান। বলেন, বন্দর তো দূরের কথা, বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মাদকদ্রব্য কোকেন পরীক্ষা করার মত কোন প্রযুক্তি চট্টগ্রাম বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেও নেই। ফলে প্রাথমিক পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি প্রমাণ করতে পারেনি বিভাগীয় অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা।

শেষমেষ ঢাকায় উন্নতমানের ল্যাবে পরীক্ষণের পর প্রমাণিত হয় আটক তেলে কোকেনের উপস্থিতি। যা এখন বিদেশে পরীক্ষার জন্যও পাঠানো হয়েছে।
মইনুল খান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে যে সব পণ্য আমদানি হয় তা বেশির ভাগই ঘোষণা নির্ভর। যা বন্দরের নিরাপত্তা, শুল্ক ও পরীক্ষণ কাজে নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা ইলেক্ট্রনিক্স ও কম্পিউটার স্ক্যানিং দ্বারা পরীক্ষা করে’।

শুল্ক ও গোয়েন্দা দপ্তরের মহাপরিচালক জানান, এ ধরনের স্ক্যানিং-এ লোহা, সিলভার ও প্লাটিনাম জাতীয় পদার্থের তৈরি পণ্যই ধরা পড়ে। পরীক্ষণের বাইরে থেকে যায় তরল জাতীয় পদার্থ। এর মধ্যে তৈল জাতীয় পদার্থ ও রাসায়নিক দ্রব্য পরীক্ষণের কোন সুযোগ নেই। ফলে এসব তেল ও রাসায়নিকের সঙ্গে মিশিয়ে অবৈধ মাদকদ্রব্য পাচার করার সুযোগ পাচ্ছে পাচারচক্র। এক্ষেত্রে কোকেনের মত মাদকদ্রব্যের কয়েকটি চালান মাঝে মধ্যে ধরা পড়লেও তা সংশ্লিষ্টদের গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই ধরা পড়ে।

বন্দর সূত্র জানায়, আকাশ ও স্থলপথে অবৈধ মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান যেমন হয়, তেমনি জলপথেও তা হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। বরং জলপথে আকাশ ও স্থলপথের চেয়ে অনেক বেশি অবৈধ পণ্য চোরাচালান হয়ে থাকে। যা পরীক্ষণের সুযোগ কম থাকায় ধরা পড়ছে না।

সূত্র আরও জানায়, বন্দরে অবৈধ পণ্য আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অবৈধ পণ্য পাচার করে আসছে। তবে এসব চোরাচালানের বেশিরভাগই ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে চলে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরকে তারা নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা ঠিক যে, তরল জাতীয় পণ্যসহ অনেক পণ্য আছে যা পরীক্ষণের মত প্রয়োজনীয় তথ্য প্রযুক্তি বন্দরের নেই। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তরল কোকোন আটকের পর আমাদের নিরাপত্তা ও পরীক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে এসব দ্রব্য পরীক্ষণের তথ্য-প্রযুক্তি সংগ্রহে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। আশা করি খুব দ্রুত এসব তথ্য প্রযুক্তি আমাদের হাতে এসে পৌঁছাবে’।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কর্মকর্তা দুলাল কৃষ্ণ সরকার এ প্রসঙ্গে বলেন, মাদকদ্রব্য পরীক্ষণ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। যাদের সার্বক্ষণিকভাবে এ কাজে নিয়োজিত থাকতে হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এ রকম কোন বিশেষজ্ঞ নেই। আবার তরল মাদক পরীক্ষণের জন্য যথাযথ রাসায়নিকের প্রয়োজন। কিন্তু বন্দরতো দূরের কথা এ রাসায়নিক খোদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেও নেই।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে সূর্যমুখি তেলের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা কন্টেইনারে ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামে তরল অবস্থায় কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ড্রামটিতে ১৮৫ কেজি তরল ছিল এবং তাতে এর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৬০ কেজি কোকেন রয়েছে বলে ধারণা করছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্যে কোকেনের চালানটি আনা হয়নি। কোকেনের চালানটি চট্টগ্রামে আসার পর ২৫ দিন সেটি বন্দরে পড়ে ছিল এবং যার নামে এসেছিল, তিনি এটি আমদানির কথা অস্বীকার করেন। ফলে এ চালানের পেছনে একটি আন্তর্জাতিক চক্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে হেরোইনসহ নানা ধরণের মাদক পাওয়া গেলেও কোকেনের প্রচলন কম ছিল। ২০১৩ সালে পাউডার কোকেনের বড় একটি চালান উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু দেশটির মধ্য দিয়ে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি আগে থেকেই রয়েছে, কারণ পৃথিবীর দুটি প্রধান মাদক উৎপাদনও চোরাচালানের কেন্দ্র গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের ঠিক মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান।

মতামত