টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

শরীরে বিষ মাখছেন না তো!

Fraud cosmetics 4চট্টগ্রাম, ০৫ জুলাই (সিটিজি টাইমস): ব্যাংক কর্মকর্তা নাজনীন আকতার। খুব একটা সাজগোজ করেন না। হালকা কাজল আর লিপস্টিক হলেই সারা। সাধারণত বড় দোকান থেকে চড়া দামেই এসব কেনেন। রাজধানীর গুলশানের একটি সুপারমল থেকে কিনে আনেন লিপস্টিক। কিন্তু এক দিন না যেতেই ঠোঁটে এলার্জি দেখা দিল। প্রথমে বুঝতে না পেরে পরপর কয়েকবার ব্যবহার করে বসেন। এলার্জি ভাল না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গেলে জানতে পারেন লিপস্টিকই নষ্টের গোড়া। পরে আগে তার কাছে থাকা ব্রান্ডের লিপস্টিকের সাথে নতুন কেনাটা মিলিয়ে দেখেন সামান্য পার্থক্য আছে দুটো। খোলাচোখে যে পার্থক্য ধরা কঠিন। অনুসন্ধানে জানা গেল নিম্নমানের কাঁচামালের সঙ্গে আটা-ময়দা ও কমদামি রং মিশিয়ে বানানো হয়েছে এ নকল লিপস্টিক ।

এসব নকল প্রসাধনের আখড়া হলো পুরান ঢাকার চকবাজার। লিপস্টিক থেকে শুরু করে আইলাইনার ও বডিস্প্রে পর্যন্ত নকল খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে। দেশি পণ্য যেমন আছে তেমন আছে বিদেশি দামি ব্র্যান্ডের নকল। এগুলো এখান থেকে সরাসরি চলে আসছে রাজধানীর শপিং মলগুলোতে। ১৫০ টাকায় কেনা নকল গার্নিয়ার ক্রিম শপিং মলে এসে আসল পরিচয়ে বিক্রি হচ্ছে ৭শ টাকায়। বাসায় গিয়ে সেটা মেখে সমস্যা হলে ক্রেতা ভাবছে ওটা তার ত্বকে ‘স্যুট’ করছে না।

অথচ এগুলোতে লুকিয়ে আছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসকরা বলেছেন, এসব এলার্জি ক্যান্সারের কারণও হতে পারে।

চকবাজারের মতো মিটফোর্ডের দিকে গেলেও খোঁজ মিলবে লিপস্টিক আর বডি স্প্রের কারখানা। তবে বাইরে থেকে বোঝার কোনই উপায় ভেতরে কী চলছে। একতলা-দোতলা বাড়ির মধ্যে ছোট খুপড়ি ঘরে তৈরি হচ্ছে লরেল, জর্ডানের মতো নামজাদা কোম্পানির নকল। আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বডি স্প্রের খালি কনটেইনার। ওগুলো সংগ্রহ করে তাতে স্পিরিট ও কাছাকাছি মানের সুগন্ধি ঢোকালেই হলো। এই স্পিরিটের কারণে বডিস্প্রে শরীরে দিলে জ্বলবে বেশি, কখনও স্প্রে লাগার জায়গায় ক্ষতও দেখা যায়।

এসব কারখানার উদ্যোক্তাদের কাউকে না পাওয়া গেলেও যারা কারখানায় রাতের বেলা কাজ করেন তাদের সাথে কথা হয় দুপুরে মিটফোর্ডের একটি ভাতের হোটেলে। ৩৩ বছর বয়সী রমজান বলেন, তাদের বলে দেওয়া হয় কিভাবে কাজ করতে হবে। মাসিক ভিত্তিতে কাজ করে তারা। রমজানরা কেউই জানেন না কারা এর মালিক। তবে ‍দুইজন আছে যারা প্রতি পনেরো দিন পর পর কাঁচামাল দিয়ে যায়।

রমজানের সহায়তায় সেই দুই কাঁচামাল সংগ্রহকারীর একজনকে কথা বলতে রাজি করানো গেলেও তিনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি। তবে তারা বড় বড় শপিংমলে নকল পণ্য সাপ্লাইয়ের পথ বের করেন বলে জানান। তিনি বলেন, কাঁচামাল থেকে সাপ্লাইকারী ও কারখানা থেকে হলোগ্রামসহ প্যাকেটজাতকরণ ও লোকাল বাজারে আসল বলে চালানোর পুরো প্রক্রিয়াটা একটা চেইনের মধ্য দিয়ে ঘটে।

রাজধানীর চকবাজার আলুটোলা, নবাবপুরের বেশকিছু এলাকা ঘুরে বেশ কয়েকটি কারখানার খোঁজ পাওয়া গেলো। এগুলো দিনের বেলা বন্ধ থাকে। এসব এলাকার নিজস্ব নিরাপত্তা এমনই কঠিন যে ফাঁক গলে সেখানে প্রবেশ কোনভাবেই সম্ভব না।

এমনই নামহীন এক কারখানার শ্রমিক স্বপন বললেন, তারা কেবল শ্যাম্পু তৈরি করেন। প্যান্টিন, হেড অ্যান্ড শোল্ডার আর গার্নিয়ার শ্যাম্পুগুলোর জন্য নিম্নমানের কাঁচামাল আসে গুলশানের এক দোকান থেকে। এর মূল কাঁচামাল হলো গার্মেন্ট কারখানার লিকুইড সাবান ও সুগন্ধি। প্যাকেট ও দামের স্টিকারসহ প্রতিটি প্যান্টিনে পাইকারি খরচ একশ টাকা। শপিং মলগুলোতে বিক্রি হবে ৩১০ থেকে ৩৯০ টাকায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার বুড়িশুর, মান্দাইলসহ বেশকয়েকটি এলাকায় শতাধিক নকল প্রসাধনীর কারখানা আছে। এদিকে পুরান ঢাকার চকবাজার, মৌলবীবাজার, বড়কাটরা, সদরঘাট, মিটফোর্ড, রহমতগঞ্জ, লালবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, শ্যামপুর, কদমতলী, পোস্তগোলা, ধোলাইখাল, সোয়ারীঘাটসহ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের পাগলার বেশ কয়েকটি জায়গায় নকল প্রসাধন তৈরির গুদাম ও কারখানা রয়েছে। চকবাজারের প্রসাধনী ব্যবসায়ী রহমান মোবিন জানান, ঢাকার গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় ভেজাল প্রসাধনসামগ্রীর আমদানিকারকদের অফিস আছে সেখান থেকেই মাল নিয়ে আসেন ভেজাল ব্যবসায়ীরা।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা জানান, আমরা দেখেছি এইসব নকল কারখানার কাছে বিভিন্ন কোম্পানির প্রকৃত হলোগ্রাম পর্যন্ত আছে। হলোগ্রাম লাগানো দেখার পর ক্রেতার সন্দেহ জন্মানোর কথা না। তিনি বলেন, ভেজাল প্রসাধনীর মধ্যে ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ও শ্যাম্পুর সংখ্যা বেশি।

বিএসটিআইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেকোনও ভেজাল পণ্য তৈরিতে জড়িতদের লঘুদণ্ড দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেই তারা আবারও এ পেশায় ফিরে আসে। তিনি বলেন, এসব পণ্য মানুষের জন্য ক্ষতিকর, তাই চরম শাস্তি হওয়া উচিত এবং সবকটি কারখানা একসাথে বন্ধ করে দেওয়া দরকার।

ভেজাল প্রসাধনসামগ্রীর প্রভাব সম্পর্কে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আহসান বলেন, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে প্রাথমিকভাবে চামড়া লাল হয়ে যায়, যা পরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বকের ক্যান্সারের আশঙ্কাও থাকে বলে তিনি জানান।-বাংলা ট্রিবিউন

মতামত