টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ইলেক্ট্রিক মেস্ত্রি থেকে ‘মানবপাচারের ডন’

Cox Abdullah Biddot-
ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
এক সময়ের ইলেক্ট্রিক মেস্ত্রি আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ, এখন জেলার ‘মানবপাচারের ডন’। কোটি টাকার মালিক তিনি। তার ইঙ্গিত ছাড়া জেলার কোন পয়েন্ট দিয়ে লোক পাচার হয়না। তার সাথে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনের গভীর সম্পর্ক। রয়েছে শক্ত নেটওয়ার্ক। সব কিছু ম্যানেজ করেই চলতেন তিনি। ইতিমধ্যে জেলা পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়। সুবিধাভোগী পুলিশ অফিসাররা অন্যত্র বদলী হয়ে যায়। এতে ভেঙে পড়ে আব্দুল্লাহ বিদ্যুতের চেইন।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জেলার শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ অন্যতম। ইনানী ও হিমছড়ি পুলিশের সাথে তার গভীর সখ্যতা। রামু থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে তার গলায় গলায় খাতির।
স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন খুনিয়াপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। সরকারী দলের গুরুত্বপূর্ণ পদটি তাকে আরো শক্তিশালী করে। বেপোরোয়া হয়ে ওঠে আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ। আগে পাচারকারীদের গোপনে সহযোগিতা করলেও সভাপতি হওয়ার পর প্রকাশ্যে শুরু করেন এ কাজ। তার কব্জায় চলে আসে জেলার ১২জন শীর্ষস্থানীয় পাচারকারী। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সোর্স নিয়োগ করে চলছে মানবপাচার।
ইতোমধ্যে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরের সন্ধ্যান। আসছে লাশের খবর। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়তে থাকে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ঘরে ঘরে চলছে আহাজারী। শুরু হয় জেলাব্যাপী পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। এ সময় ক্রসফায়ারে মারা যায় শীর্ষস্থানীয় ৫জন মানবপাচারকারী। ভিকটিমদের পরিবারের কাছ থেকে ওঠে আসে আব্দুল্লাহ বিদ্যুতের নাম। এরপর থেকে আতœগোপনে চলে যান তিনি।
আবদুল্লাহ বিদ্যুৎ এর উত্থান কাহিনী:
রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের দিনমজুর ফেরদৌসের বড় ছেলে আব্দুল্লাহ। এক সময় ইলেক্ট্রিকের কাজ করতেন তিনি। সে কারণে তার নামের সাথে ‘বিদ্যুৎ’ তকমা লাগায় এলাকাবাসী। তাকে ‘আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ’ হিসাবে সবাই চেনে। আট বছর আগের আব্দুল্লাহ বর্তমানে মানবপাচারকারী চক্রের ডন। এ কাজ করে তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার সম্পত্তি।
নিরক্ষর আব্দুল্লাহ ২০০৮ সাল পর্যন্ত উখিয়া উপজেলার সোনাপাড়ার সৌদিয়া হ্যাচারিতে ইলেক্ট্রিকের কাজ করতেন। বেতন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। ওই বছরেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে নাম লেখান রাজনীতিতে। এরপর থেকেই তার দৃশ্যমান কোন পেশা নেই।
দরিদ্র পরিবারের ছেলে আব্দুল্লাহ আলিশানভাবে জীবনযাপন শুরু করেন। কমুবনিয়ার সরকারি বনভূমির ১০ একর জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করার জন্য ইট, বালি মজুদ করেছেন। ইজারা নিয়েছেন হিমছড়ি পার্ক। ওই এলাকাতেই কিনেছেন কোটি টাকা মূল্যের জায়গা। নিজ ইউনিয়নের লোকজনের কাছ থেকে বন্ধক নিয়েছেন অর্ধকোটি টাকার জায়গা জমি। নিজের জন্য একটি ও ছোট দুইভাই আব্দুস সালাম ও আব্দুল কাদেরের জন্য কিনেছেন দু’টি এফ জেট মোটরসাইকেল। পাচারকারীদের কাছ থেকে নেওয়া কমিশন ও নিজের গ্রুপের পাচারের টাকায় এ সম্পত্তি কেনা।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের দরিয়ানগর থেকে পেঁচার দ্বীপের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। সড়কের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও পূর্বে উঁচু উঁচু পাহাড়ের আড়ালেই থাকেন এক ডজন মানবপাচারকারী চক্র। এর আটটি পয়েন্ট দিয়ে এক ডজন গ্রুপের হয়ে কাজ করেন আরো শতাধিক পাচারকারী। আর এই ১২টি গ্রুপের শতাধিক পাচারকারী চক্রের ক্ষমতাধর গডফাদারের নাম আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎ। এ অভিযোগ খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
এদিকে, বারবার উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী কিংবা আটক দালালদের কাছ থেকে গডফাদার হিসেবে তার নাম আসলেও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি থেকে গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যদিওবা ১২ মে সেন্টমার্টিনে ১১৬ জন মালয়েশিয়াগাম যাত্রী উদ্ধারের ঘটনায় তাকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ওই মামালার ৩৪ নম্বর আসামি আবদুল্লাহ বিদ্যুৎ। এছাড়াও তার নামে আরো কয়েকটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। মানবপাচার মামলা নিয়ে নিয়মিত রামুসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরাফেরা করলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে তাকে আটক করেনি। শুক্রবার রাতেও দুইজন আসামি ছাড়িয়ে নিতে রামু থনায় গিয়েছিলেন তিনি।
অবশেষে ৪ জুলাই শনিবার বিকালে আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৭। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মানবপাচারকারী। ইতোপূর্বে ৫টি মানবপাচার মামলার আসামী আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্প উপ-অধিনায়ক শরাফত হোসেন জানান, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে মানব পাচারের অভিযোগ ছিল। তাছাড়া তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত পাচারকারী। অভিযোগের ভিত্তিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ বলেন, জেলাব্যাপী সাড়াশি অভিযানের পর অনেক পাচারকারী আতœগোপনে চয়ে যায়। এ কারণে তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। মানবপাচারসহ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরোটলারেন্স’ ভুমিকা পালন করছে।

মতামত