টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক মা, বাকরূদ্ধ স্ত্রী: মামলা নিতে পুলিশের গড়িমশি

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি 

Mirsarai-Maduer-Photoচট্টগ্রাম, ০৩ জুলাই (সিটিজি টাইমস):  মিরসরাইয়ের আলফাজ হত্যাকান্ডের ৪দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা নিতে গড়িমশি করছে মিরসরাই থানা পুলিশ ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানা পুলিশ (জিআরপি)। ফলে আলফাজের হত্যাকান্ডের সঠিক রহস্য উন্মোচন হবে কিনা কিংবা তার পরিবার সঠিক বিচার পাবে কিনা এনিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার রাতে আলফাজের পরিবারের লোকজন মিরসরাই থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সেটি চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের কাছে পাঠায় মিরসরাই থানা পুলিশ। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনে কাটা পড়ে কেউ নিহত হওয়ার বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশকে খবর না দেওয়াতে তারাও এবিষয়ে মামলা নিতে কিংবা তদন্ত করতে আগ্রহী নয়। এদিকে আলফাজ হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনি প্রদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

শুক্রবার (৩জুলাই) সকালে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রহিম বক্স ভূইয়া বাড়িতে ফখরুল ইসলাম আলফাজের ঘরে গিয়ে দেখা যায় তাদের ঘর সহ পুরো বাড়িতে শুনশান নিরবতা বিরাজ করছে। বাড়ির সকলের মাঝে ছাপা কান্না বিরাজ রয়েছে। আলফাজের খুনিদের সবাই চিনলেও মুখ খুলে বলার সাহস পাচ্ছে না। আলফাজের চাচা নওশা জানান, সোমবার গভীর রাতে আলফাজ আমাদের পাশ্ববর্তী বাড়ির সুমনের মোবাইলে ফোনে কল দিয়ে বলে সে বিপদে আছে তাকে উদ্ধার করতে মিঠাছরার গড়িয়াইশ গ্রামের ব্রিকফিল্ডের রাস্তায় যাওয়ার জন্য বলে। কিন্তু সুমন তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বাড়ি চলে যায়। পরবর্তীতে সকালে রেল লাইন পরিদর্শনকারী ট্রেন যাওয়ার সময় রেল লাইনে আলফাজের লাশ পড়ে থাকতে দেখে ট্রেনের চালক ট্রেন থামিয়ে এলাকাবাসীকে খবর দেয়। পরে এলকাবাসী লাশটিকে আলফাজের লাশ বলেন সনাক্ত করে তার পরিবারের লোকজনের কাছে খবর দেয়। পরিবারের লোকজন গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। তিনি আরো বলেন, আলফাজকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করার পর খুনীরা পরিকল্পিতভাবে তাকে রেল লাইনে শুয়ে রাখে। কিন্তু রাত থেকে সকাল পর্যন্ত কোন ট্রেন না যাওয়াতে তার লাশ রেল লাইনেই পড়েছিলো। আলফাজের বাম হাত শরীর থেকে বিছিন্ন ছিলো। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছিলো ধারালো অস্ত্রের কোপ ও লাঠির আঘাত। তার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও থানায় খবর দিলেও ওই সময় প্রশাসন রহস্যজনক ভাবে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। পরবর্তীতে লাশের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া শুরু করলে তার লাশ দাপন করে ফেলা হয়। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার যথেষ্ট লক্ষণ দেখা গেলেও থানা পুলিশ বলছে রেলওয়ে পুলিশ দেখবে আর রেলওয়ে পুলিশ বলছে থানা পুলিশ দেখবে।

আলফাজের মা আক্তারের নেহা পুত্র শোকে নির্বাক হয়ে গেছেন। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। চারিদিকে ফ্যালফ্যাল চোখে খুঁজে বেড়াচ্ছেন আদরের সন্তানকে। ভাঙ্গা কণ্ঠে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আলফাজ ছিল খুবই শান্ত প্রকৃতির। বাড়ির কারো সাথে কিংবা এলাকার কারো সাথে তার কখনো মনমালিন্য হয়নি। সে সবসময় গরীব দুঃখীকে সহায়তা করত। বিদেশ থেকে আসার পর এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় পড়ে সে আর বিদেশ যাইনি। সে প্রতিদিনের মতো সোমবারও বিকেলে ঘর থেকে বের হয়। কিন্তু অন্যান্য সময় রাত ১০টার আগে সে বাড়ি ফিরলেও সোমবার আর ফিরেনি। মঙ্গলবার সকালে সে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। লাশ বাড়ি আনার পর আমরা স্থানীয় চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খোকাকে খবর দিই। তিনি এসে থানায় খবর দেন। কিন্তু থানা পুলিশ না আসাতে চেয়ারম্যান আমাদেরকে দ্রুত তার লাশ দাফনের জন্য বলেন। আমরা কিছু না বুঝেই তার লাশ দাপন করে ফেলি। চেয়ারম্যান কিংবা থানা পুলিশ যদি আমাদের লাশ দাপন না করে পোস্টমর্ডেমের জন্য বলত তাহলে আমরা অবশ্যই লাশ ময়না তদন্ত করতাম। কিন্তু ছেলের লাশ দাপন করার পর সবাই বলছে পোষ্টমর্ডেম না করে লাশ দাপন করাতে আমরা বিচার পাবো না। আমার ছেলের হত্যাকারী মিঠাছরার গড়িয়াইশ এলাকার ফরিদ ও সরোয়ার প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরতেছেনা। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। আমি চাই না আমার ছেলের মতো এভাবে আর কোন মায়ের বুক খালি হোক।

নিহত আলফাজের বড় ভাই আজিম উদ্দিন জানান, ‘আলফাজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করলেও পুলিশ এবিষয় মামলা নিতে বা তদন্ত করতে আগ্রহী নয়। আমি আমার ভাই হত্যার সুষ্ঠ বিচার চাই।’

দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খোকা বলেন, আলফাজের লাশ উদ্ধার করে বাড়ি আনার পর আমি থানায় খবর দিলে তারা বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশ দেখবে বলে জানায়। পরবর্র্তীতে রেলওয়ে পুলিশ না আসলে আলফাজের পরিবার তার লাশ দাপন করে ফেলে। আলফাজের হত্যাকারীদের ধরে সুষ্ঠ বিচার করার জন্য আমি প্রশাসনের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।

মিরসরাই থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, আলফাজ হত্যার ঘটনা নিয়ে তার পরিবার একটি অভিযোগ থানায় দিয়েছে। আমরা সেটি জিআরপি পুলিশের কাচে পাঠিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি যেহেতু রেলওয়ে পুলিশের তাই আমাদের এই বিষয়ে কিছু করার নেই।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার (জিআরপি) সেকেন্ড অফিসার এসআই রায়হান জানান, রেল লাইনে কেউ কাটা পড়লে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের চিঠি দেয়। কিন্তু মিরসরাইয়ের গড়িয়াইশ এলাকায় আলফাজ হত্যা নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের কোন চিঠি দেয়নি। তাই আমরা এই বিষয়ে তদন্ত করতেছিনা। মিরসরাই থানা থেকে কোন অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কোন অভিযোগ পাইনি।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুন সকাল ৭টায় উপজেলার মিরসরাই সদর ইউনিয়নের গড়িয়াশ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পাশে ফখরুল ইসলাম আলফাজ (২৫) লাশ দেখতে পায় এলাকাবাসী। সে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের রহিম বক্স ভূইয়া বাড়ির মৃত মোর্শেদ আলমের ছেলে। আলফাজের ১ ছেলে ও স্ত্রী রয়েছে। সে ৬মাস পূর্বে দুবাই থেকে বাড়িতে ছুটিতে এসেছিল।

মতামত