টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কক্সবাজারে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ : কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক যোগাযোগ বন্ধ

Banna pic-2
ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
টানা বর্ষণের কারণে জেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্ষেতখামার ও চিংড়ি প্রজেক্ট। উজান থেকে অতিরিক্ত পানি আসায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক সারা দিন বন্ধ ছিল। স্থবিরতা নেমে আসে সাধারণ পথ চলাচলেও। সদর উপজেলার লিংক রোড থেকে রামু উপজেলার খুনিয়াপালং পর্যন্ত অতিরিক্ত পানি জমে ওঠার কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেনি। অবিরত বৃষ্টি বর্ষণে অনেকের ঘরে চুলার আগুন ধরেনি। ফলে পবিত্র রমজানে সাহরী ও ইফতার নিয়ে মুসলমানরা কষ্টে পড়েছে। অনেকে উপুষ রোজা পালন করছে। ইফতার করেছে শুধু পানি দিয়েই। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলায় ৩১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জেলা আবহাওয়া অফিস জানায়।
গত তিন দিনের টানা বর্ষণে কক্সবাজার পৌরসভার অধিকাংশ জায়গা ডুবে গেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে। বাজারঘাটা, উপজেলা গেই, আলীর জাহাল, টেকপাড়া, নুনিয়ারছরা, বাহারছরাসহ শহরের অধিকাংশ সড়ক দিয়ে চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। সন্ধ্যা সাতটার পর বৃষ্টি সামান্য থামলে পানি নামতে শুরু করে। এরপর চলাচল স্বভাবিক হয়ে ওঠে।
কক্সবাজার যুব প্রশিক্ষন কেন্দ্র, পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউট, বিসিক শিল্প নগরী ও আরো বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি স্থাপনা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুন বেড়েছে। সাগর পাড়ের সড়ক উপ-সড়কগুলোতেও শুধু পানি আর পানি। চারিদিকে পানি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনা।
শহর ছাড়াও টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়ার অধিকাংশ নি¤œাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার টেকনাফ যাতায়তে বিকল্প সড়কপথ মেরিন ড্রাইভ রোডের কলাতলী মসজিদ এলাকা ও হিমছড়ি থেকে রেজু ব্রিজ পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে ভাঙ্গন ও পাহাড়ি মাটি এসে পড়ায় পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। অপর দিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রামু-মরিচ্যা সড়কেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
তিন দিনের ভারী বর্ষনে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। পানির নিচে তলিয়ে গেছে শতশত একর ফসলি জমি চিংড়ি ঘের ও লবণ মাঠ। বিভিন্ন স্থানে বেঁড়িবাধ ও অর্ধশত কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় পানিবন্দী লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক যোগাযোগ। এদিকে অব্যাহত ভারী বর্ষনে বুধবার ও বৃহষ্পতিবার দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকায় পর্যটন শহর কক্সবাজারের বেশ কিছু এলাকা। এতে চরম দুভোর্গে পড়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িরা।
শহর ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে ব্যাপক বর্ষনের কারণে শহরের বাজারঘাটা, বড়বাজার, গোলদীঘির পাড়, টেকপাড়া, পৌর এলাকার সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। শহরের প্রধান সড়কেও কোমর সমান পানি জমে থাকায় যান চলাচল অনেকটা বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও কক্সবাজার সদর, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া , পেকুয়া, টেকনাফ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চকরিয়া পৌরসভার কোচ পাড়ায় মাতামুহুরী নদীর শহর রক্ষাবাঁধ ভেঙ্গে পৌরসভার কোচপাড়া ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে বিএমচর ইউনিয়নের কইন্যারকুম ও কুরুল্যারকুম এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বেড়ীবাঁধে ।
শহরের বড় বাজার এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, বুধবার থেকে ভারী বর্ষণে দোকানে পানি ঢুকে প্রচুর মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কম পক্ষে ২/৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছেবলে তিনি জানান।
ব্যবসায়ী কবির হোসেন জানান, প্রতি বছর বর্ষা আসলে শহরের ব্যবসায়ীদের আতংকে থাকতে হয়।
তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে অনেক জনপ্রতিনিধি সরকারের কর্মকর্তরা দেখতে আসেন। তাদের আমরা আমাদের অভিযোগের কথা বলি উনারাও শুনে সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে যুগের পর যুগ চলে গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
শহরের টেকাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন, রমজান, নুরুল আবছার জানান,পৌরসভার নালাগুলো দখল মুক্ত করে পানি চলাচল নির্বিঘœ করতে হবে। তাহলে শহরে জলাবদ্ধতা কমে যাবে।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শহরে অনেক কাজ করা হয়েছে। আসলে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার কারনে জলাবদ্ধতা হয়েছে। এটা প্রাকৃতিক। তবে তিনি পাহাড় কাটা বন্ধ হলে অর্ধেক সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করেন।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আলম জানান, তিন দিনের ভারি বর্ষণে চকরিয়ার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। গতকাল বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মাতামুহুরী নেমে আসা ঢলের পানি। এতে নদী তীরের কয়েক হাজার পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে জানমাল রক্ষায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে।’
রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল্লাহ জানান, কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্নস্থানে কাঁচাঘর বিধ্বস্ত, পাহাড়ধ্বস, গ্রামীন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কসহ কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁকখালী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রামু তেমুহনী-জাদিমুরা সড়কের বুথপাড়া সংলগ্ন এলাকায় বিগত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধটি অতি ঝূঁকিপুর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কোন মূহুর্তে সড়ক সহ বাঁধটি ধ্বসে বসত ঘর ও ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। আতংকিত লোকজনকে গতকাল রাত পর্যন্ত পরিবারের সদস্য, গবাদিপশুসহ মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। এছাড়া হাইটুপী, উত্তর মেরংলোয়া,পশ্চিম মেরংলোয়া, হাসপাতালপাড়াসহ আরো কয়েকটি গ্রামের ফসলী জমি ও বসত ঘর প্লাবিত হতে শুরু করেছে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল, দক্ষিন মিঠাছড়ি ও চাকমারকুল ইউনিয়নে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ হোসেন রামু তেমুহনী-জাদিমুরা সড়কের বুথপাড়া সংলগ্ন এলাকায় ঝূঁকিপুর্ণ বেড়িবাঁধ দেখতে যান। এসময় তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত