টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

টার্গেট এবার ‘মুস্তাওয়াশ’!

spচট্টগ্রাম, ২২ জুন (সিটিজি টাইমস)::ওয়ানডেতে অভিষেক ম্যাচেই মুস্তাফিজুরের বিধ্বংসী বোলিংয়ে ধরাশায়ী হয়েছিলো ভারত। তাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মুস্তাফিজুরের বল মোকাবেলা করতে অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। কিন্তু কোনও পরিকল্পনাই কাজে এলো না, দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও তার অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয় করলো টাইগাররা। অভিষেক ম্যাচে ৫ উইকেট এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে বিস্ময়কর বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন এই তরুণ পেস বোলার। ক্যারিয়ারে প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট শিকারের এ রেকর্ড মুস্তাফিজুরের আগে ছিল কেবল জিম্বাবুইয়ান বোলার ব্রায়ান ভিটোরির। দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে ভিটোরিকেও ছাড়িয়ে গেছেন মুস্তাফিজ।

মুস্তাফিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে টানা দুই ম্যাচে হেরে ভারত এরই মধ্যে সিরিজ হেরে খাদের কিনারায়। কিন্তু, তাতেই বা কেন সন্তুষ্ট হবেন ১৯ বছরের এই তরুণ? শেষ ম্যাচটায় আবারও ভারতকে তুলোধুনো করার আগ্রাসী মনোভাব নিয়েই মাঠে নামবেন দ্বিতীয় ম্যাচেও মন অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নেওয়ার সময় এ ঘোষণা দিয়েই রেখেছেন তরুণ মুস্তাফিজ। আর তাতেই স্বপ্নবাজ দর্শকদের আশা এবার ভারতকেও ‘বাংলা ওয়াশ’ করা যাবে। আর মুস্তাফিজ যদি একই কীর্তি আবারও ঘটাতে পারেন তাহলে হয়ে যাবে একটা ‘মুস্তাওয়াশ’ও।

পাকিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে ১৯ বছর বয়সী মুস্তাফিজুর রহমানের। উদ্বোধনী ম্যাচেই শহীদ আফ্রিদি ও মোহাম্মদ হাফিজের উইকেট নেন এই পেসার। পাকিস্তানের বিপক্ষে ভালো বল করায় সেই ম্যাচেও ভীষণ প্রশংসিত হয়েছিলেন সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া এই বোলার। তখন থেকেই ওয়ানডে অভিষেকের স্বপ্ন দেখছিলেন সদ্য কৈশোর পেরুনো এই তরুণ। এরপর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেই ডাক। ভারতীয় দলকে চমকে দিয়ে চার পেসার নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ।

সে স্বপ্ন পূরণ হওয়া কঠিনই ছিল বটে। বাংলাদেশ দলের পেস ব্যাটারির অপরিহার্য অংশ মাশরাফি-রুবেল-তাসকিনের কাউকে হটিয়ে জায়গা নেওয়াটা খুব সহজ নয় নতুন কোনও বোলারের জন্য। তাই সুযোগ পেতে হলে চতুর্থ পেসার হিসেবেই দলে ঢুকতে হতো তাকে। কিন্তু, যে দল স্পিন নির্ভর সেই দলে চার পেসার খেলানোর সম্ভাবনা কী আর আছে?

সময় ও পরিস্থিতি এক রকম যায় না, দলের পরফরম্যান্সের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হলে একটু আধটু ঝুঁকিও নেওয়া যায়। নেট প্র্যাকটিসে মোস্তাফিজুরের বোলিং দেখে বিস্মিত হন দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও কোচ চন্ডিকা হাথুরেসিংহে। দলের অনেক খেলোয়াড়ই মোস্তাফিজুরের কাটার বলটি ঠিকভাবে খেলতে পারছিলেন না। মোস্তাফিজুর নিজেই জানিয়েছেন, ‘বিজয় ভাই (এনামুল হক) আমাকে এই ধরনের বল করার ব্যাপারে পরামর্শ দেন, কিন্তু বলটি করার পর দেখা গেল উনিই এটি খেলতে পারছিলেন না।’ দলের আরও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যাওয়া এই অফ কাটার ও বলের মুভমেন্ট দেখে উৎফুল্ল হন মাশরাফি। প্রয়োজনে দলে চতুর্থ সিমার নেওয়ার ভাবনাটাও উঁকি দেয় তার মনে।

এদিকে, পাকিস্তানের বিপক্ষে চমৎকার বল করেছিলেন আরাফাত সানি। তাকে বসিয়ে রাখাটা সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তাই সহজ ছিল না। তারপরেও স্পিনে স্বাচ্ছন্দ্য ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের চমকে দিতেই দলে চতুর্থ পেসার নেওয়ার ব্যাপারে কোচ হাথুরুসিংহেকে প্রভাবিত করেন মাশরাফি। পরে নির্বাচকদেরও বিষয়টি বলে রাজি করিয়েই অনেকটা সাহস নিয়ে সানিকে বাদ দিয়ে চতুর্থ পেসার হিসেবে দলে জায়গা পান ‍মুস্তাফিজুর রহমান।

আর তারপর তো সবই ইতিহাস!

পরপর দু’ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ছেলেটা মিডিয়ার সামনে এখনও লাজুক, কিন্তু তার হাতের যাদুতেই মুগ্ধ ১৫ কোটি বাংলাদেশি। অহমিকায় অন্ধ ভারতকে পরপর দুই ম্যাচে মাটিতে নামালো যে ছেলেটি, কলজে চিরে গেলেও তাকে নিয়েই এখন বন্দনা খোদ ভারতীয় গণমাধ্যমেও।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সালে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্ম মুস্তাফিজের। ব্যবসায়ী বাবা আলহাজ আবুল কাশেম গাজী, মা মাহমুদা খাতুনের ছোট ছেলে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই বাড়তি আদর যত্ন পেয়েছেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ভাইদের সবাই ক্রিকেটের ভক্ত, মোস্তাফিজকে ক্রিকেটে টেনে আনেন তিনিই।

বর্তমানে বড় ভাই মাহফুজুর রহমান মিঠু খুলনায় গ্রামীনফোনের টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন, মেজ ও সেজ ভাই ঘের ব্যবসায়ী।

তার ক্রিকেট খেলায় আসার পেছনে সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের অবদান সবচেয়ে বেশি। ক্রিকেট পরিবারে জন্ম নেওয়া মোস্তাফিজুরকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি । তার বড় ভাই এক সময় ক্রিকেট খেলতেন, মেজ ভাইও কম যান না, আর সেজ ভাই এখনও ক্রিকেট খেলেন।

তার সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান পল্টু জানালেন, তার উঠে আসার ইতিহাস। এই তো বছর পাঁচেক আগের কথা। সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে বাছাই পর্বে নজর কাড়ে সবার। তারপর তিন দিনের স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ করানো হয়।

এরপর জেলা পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট খেলায় সাতক্ষীরা জেলার হয়ে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। পড়াশোনায় অতটা মন তার কখনোই ছিল না। সুযোগ পেলেই স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলতে চলে যেত। বাবা ও বড় ভাইদের জোরাজুরিতে সোজা বলেছিলেন,’লেখাপড়া আমার দ্বারা হবে না। তোমরা আর জোর করো না।’ এরপর থেকে ক্রিকেটই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বাবা এবং ভাইয়েরা ঘের বাবসায়ী হওয়ায় তাদের মাছ ধরা জাল দিয়ে ঘিরে নিজের স্কুল বরেয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নেট অনুশীলন করতেন মুস্তাফিজ।

সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম দিন হয়তো বুঝতে না পারলে আমরা পেতাম না আজকের এই মুস্তাফিজুরকে। তিনি চিনে নেন এই প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজুরকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু।

সবার পরিশ্রমের প্রতিদান দিতে পেরেছেন মুস্তাফিজ। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্সই বলছে সে কথা। জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। বছর তিনেক আগে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে। নিয়মিতই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভবনার দ্যূতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। তার ঝুলিতে ভরেছিলেন ৯ উইকেট। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী।

গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজুর। রীতিমতো চমক ছিলেন তিনি। মুস্তাফিজ প্রথম শ্রেণিতে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। এই তো ছয় মাস আগে অভিষেক হয়েছে ঘরোয়া একদিনের ম্যাচে।

অভিষেক ম্যাচের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স তাই ‘নতুন দিনের বাংলাদেশ’ দলে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবে বলেই পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন বিস্ময় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভূত হলেন এই তরুণ পেসার।

ছোট্ট এ ক্যারিয়ারে উজ্জ্বল পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে মুস্তাফিজ কতটা প্রতিভাধর। এখন সে প্রতিভার বিকাশ দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ। ১৯ বছর বয়সী সেই আশার গানই শোনালেন অভিষেকে। বাঁহাতি পেসারের যে ঘাটতি অনুভব করছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, তা হয়তো পূরণ করতে সক্ষম হবে এই সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস। তাছাড়া মোস্তাফিজের স্বপ্ন পূরণে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন তার বাবা-মাসহ গোটা জেলাবাসী।

মোস্তাফিজের সঙ্গে ফোনে কথা বললে তিনি বলেন,‘দলে টিকে থাকতে হলে ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে। না হলে দলে থাকা যাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘পরের ম্যাচগুলোতে খেলার সুযোগ পেলে তিনি আরও ভালো করার চেষ্টা করবেন।’

মোস্তাফিজের বাবা আলহাজ্ব আবুল কাশেম আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে যে জাতীয় টিমে খেলছে এটি গর্বের বিষয়। তিনি আরো বলেন, মোস্তাফিজুর আজকে আমার একার ছেলে নয় গোটা জাতির হয়ে ২২গজের রণাঙ্গনে লড়বে। তিনি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।’

এদিকে পরপর দুই ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ভারতকে একাই ধসিয়ে দেওয়ায় শেষ ম্যাচেও তিনি অসাধারণ কিছু করবেন সেই আশায় তাকিয়ে আছে পুরো বাংলাদেশ। সিরিজ জয়ের পর শেষ ম্যাচটায় জয়ী হলে বলা হয় ‘হোয়াইট ওয়াশ’। বাংলাদেশ এ কাণ্ডটা ঘটালে বলা হয় ‘বাংলা ওয়াশ’। ভারতের বিপক্ষে মুস্তাফিজকাণ্ডে রসিক মহলে এখন চালু হয়েছে নতুন শব্দবন্ধ ‘মুস্তাওয়াশ’। শেষ ম্যাচেও তিনি আততায়ী হয়ে ভারতীয় দলকে খুন করে ‘মুস্তাওয়াশ’ সম্পন্ন করবেন এমনই প্রত্যাশা সমর্থকদের।-বাংলা ট্রিবিউন

মতামত