টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

হুমকিতে কর্ণফুলী ও হালদা, ধ্বংসের মুখে জীববৈচিত্র্য

ctgচট্টগ্রাম, ২১ জুন (সিটিজি টাইমস)::  বোয়ালখালী উপজেলার বেঙ্গুরা এলাকায় সেতু ভেঙে খালে ডুবে যাওয়া ওয়াগনের তেল কর্ণফুলীসহ আশপাশের প্রায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

ছড়িয়ে পড়া তেলে ফার্নেস অয়েল খাল নদী পেরিয়ে এখন দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতেও মিশেছে। ফলে কর্ণফুলী ও হালদাসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। খালে-বিলে ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে বিভিন্ন ধরনের ব্যাধি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, বোয়ালখালী খালের ২০ কিলোমিটার এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি এখন নতুন করে কর্ণফুলী নদী ছাড়িয়ে হালদাও আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এতে করে ডিম ছাড়ার মৌসুমে হালদায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনার শংকা দেখা দিয়েছে।

রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা জানান চট্টগ্রাম মৎস অধিদপ্তরের পরিচালক প্রভাতী রানী দেব।

প্রভাতী রানী দেব বলেন, কর্ণফুলী নদী থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে হালদা নদীর মাছুয়াঘোণা এলাকা পর্যন্ত নিঃস্বরিত তেল পৌঁছেছে। যার ফলে হালদায় ডিম পাড়তে আসা মা মাছের জীবন ও হালার জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আশংকার কথা জানান ‘হালদা রক্ষা পরিষদের’ সহ সভাপতি সাংবাদিক চৌধুরী ফরিদও। যদিও এরআগে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয়রা কর্ণফুলী নদীতে তেল ভাসার কথা জানিয়েছেন।

তবে এর জবাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইস আলম মণ্ডল বলেন, ‘ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল বোয়ালখালী খাল ছড়িয়ে কর্ণফুলী কিংবা হালদায় গেছে কিনা সেটি নিশ্চিত করা বলা যাচ্ছেনা। তবে কি পরিমাণ তেল হালদায় গেছে সেটি পরীক্ষা করে বলতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিন, রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইস আলম মণ্ডল, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনসহ সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা। শুক্রবার বোয়ালখালীতে রেল সেতু ভেঙে তেলবাহী ওয়াগন খালে পড়ে যাওয়ার ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

কর্ণফুলী কিংবা হালদা থেকে তেল অপসারণে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা তা জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্ততেরর এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সারা নদীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তেল অপসারণের কোন ব্যবস্থা আমাদের নেই। এটা সম্ভবও না। তবে খালে ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণে ইতোমধ্যে আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে কাজ করছি। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

তবে বোয়ালখালী খালসহ এর আশপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন রইস আলম মণ্ডল।

এদিকে, খালে-বিলে ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে বিভিন্ন ধরনের ব্যাধি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্নেস অয়েলের টক্সিক পানির সঙ্গে মিশে খালের খাদ্যচক্র নষ্ট, অক্সিজেন স্বল্পতা সৃষ্টি করে বাস্তুতন্ত্র নষ্টসহ মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে। এজন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করছেন তারা।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক মকবুল হোসাইন বলেন, শুক্রবার দুপুরে দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ রেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমাদের জানায়নি। ঘটনার পরপর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলে পরিবেশের এতোটা ক্ষতি হতো না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বোয়ালখালী খালটি কর্ণফুলী নদীর শাখা খাল।এটিতে জোয়ার-ভাটা থাকার কারণে ফার্নেস অয়েল পার্শ্ববর্তী অন্যখালসহ কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে।

ফার্নেস অয়েলের কারণে কর্ণফুলী তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফার্নেস অয়েলের টক্সিক পানির সঙ্গে মিশে নদীর খাদ্যচক্র নষ্ট, অক্সিজেন স্বল্পতার সৃষ্টি করে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করবে।

তিনি বলেন, টক্সিক এক ধরনের বিষক্রিয়া। এর ফলে প্রাণী ও মাছ মারা যাবে। আবার এসব প্রাণী ও মাছ খেয়ে বিভিন্ন পাখিও মারা যাবে।

এছাড়া বোয়ালখালী খালের আশপাশের ফসলি জমির মাটিগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত হবে। এতে আগামী কয়েকবছর এসব জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে।

সুন্দরবনের শেওলা নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়রা সেটি সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল বলে খবর বেরিয়েছে। যেটি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উদ্বেগ জানিয়েছিল। তবে ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করার সময় স্থানীয়দের তেমন কোন ক্ষতি হয়না বলে দাবি করেন রইস আলম। এরপরও একজন চিকিৎসককে ঘটনাস্থলে রাখার কথা বলেছেন তিনি।

অন্যদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিন বলেন, ‘এটি একটা দুর্যোগ। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা সকলেই সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে রেল সেতুটি অস্থায়ীভাবে চালু করে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া সোমবারের মধ্যে রিলিফ ট্রেন খালের পটিয়া অংশে নিয়ে ইঞ্জিন উদ্ধারের কাজ করা হবে। পর্যায়ক্রমে খালে পড়ে থাকা ট্যাংকারও উদ্ধার করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম-দোহাজারি রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ সব সেতু নতুন করে নির্মাণ করা হবে। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে নতুন করে একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। যা ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে বোয়ালখালী ও পটিয়া সীমান্তে সারোয়াতলী ইউনিয়নের ২৪ নম্বর রেল সেতু ভেঙে ফার্নেস অয়েল বহনকারী একটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। এরমধ্যে ইঞ্জিনসহ তিনটি ট্যাংকার পানিতে পড়ে গেলে সেখান থেকে তেল খালে ছড়িয়ে পড়ে। এঘটনায় রেলওয়ের দুই প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত ও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে।

তিনটি ট্যাংকার থেকে খালে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল জোয়ারের সময় বোয়ালখালী খালের উজানে প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং ভাটায়ও প্রায় ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এই ফার্নেস অয়েল বোয়ালখালী খাল হয়ে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে।

এছাড়া খালের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফসলী জমি, জলায়শয় ও পুকুরেও এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক পুকুরের মাছ মারা যেতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। এছাড়া খালের ছোট ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও মরে ভেসে উঠেছে বলে জানা গেছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত