টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বাংলাদেশে ক্রেতা হারাচ্ছে ম্যাগি নুডলস

Maggi-thereport24চট্টগ্রাম, ১৭ জুন (সিটিজি টাইমস)::ম্যাগি নুডলসে মাত্রাতিরিক্ত সিসার কারণে ভারতীয় আদালত সে দেশে এই পণ্য বিক্রি বন্ধের আদেশ দিয়েছেন। ভারতীয় আদালতের এ নিষেধাজ্ঞার ঝড় এসে পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। এ দেশে ম্যাগি নুডলসের বাজার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আকর্ষণীয় মূল্যছাড়ের প্যাকেজ ঘোষণা করেও ক্রেতা টানতে পারছে না নেসলে বাংলাদেশের ম্যাগি নুডলস।

ভারতের বাজারে ম্যাগিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা থাকার খবর প্রচার হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে ম্যাগি নুডলসের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করেন। এর প্রভাবে বড় বড় সুপার শপ থেকে শুরু করে বাজারকেন্দ্রিক দোকান, এমনকি গলির মোড়ের মুদি দোকানের বিক্রেতারাও ম্যাগি নুডলস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আর সাধারণ ক্রেতারা অন্য নুডল কিনলেও ম্যাগির কথা মুখে আনছেন না। ফলে ম্যাগি নুডলসের বাজার ক্রমশ পড়ছেই। বর্তমানে ঢাকা শহরে ম্যাগির বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন দোকান ও মেগা শপে খোঁজখবর নিয়ে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে। ম্যাগির এ বিপর্যস্ত বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে নিউজিল্যান্ড ডেইরির ডুডলস, ফুওয়াংয়ের নুডলস ও প্রাণের মিস্টার নুডলস। তবে বিক্রি কমে যাওয়ার এ বিষয়টি মানতে নারাজ নেসলে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। এমনকি মূল্যছাড়ের বিশেষ প্যাকেজের কথাও অস্বীকার করেছেন তারা।

নেসলে বাংলাদেশের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা ফারাহ এস আওলাদ বলেন, ‘ভারতের ম্যাগি নুডলসে সিসা থাকার খবরের পর বাংলাদেশের মার্কেটে ম্যাগির প্রমোশনের জন্য মূল্যছাড়ের বিশেষ কোনো প্রোগ্রাম নেওয়া হয়নি। তবে এপ্রিল-মে মাসে আমাদের পূর্বনির্ধারিত মূল্যছাড়ের একটা অফার ছিল। সেটাই এখন বিভিন্ন শপের আউটলেটে দেখা যাচ্ছে। ভারতের ম্যাগির প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার কথা নয়। এখানকার ম্যাগি নুডলস বাংলাদেশেই তৈরি হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মে মাসে ম্যাগির ৬৬ টাকার প্যাকের দাম কমিয়ে ৫০ টাকা ও ১৩০ টাকার প্যাকের দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর পরেও ম্যাগি নুডলস বিক্রি করতে পারছেন না দোকানিরা। রাজধানীর বিভিন্ন মহল্লার দোকানিরা আগে যেখানে সপ্তাহে এক কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি করতে পারতেন, সেখানে এখন এক কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যাচ্ছে। আর বড় বড় সুপার শপগুলোর একই অবস্থা। তাদের বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে।

রাজধানীর টিকাটুলীতে স্বপ্নের আউটলেটে আগে প্রতিদিন এক থেকে দুই কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি হতো। সেখানে বর্তমানে প্রতিদিন হাফ কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি হচ্ছে। এ তথ্য জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত মো. ফাহাদ নামের একজন সেলসম্যান।

ওই সেলসম্যান বলেন, বর্তমানে ম্যাগির পরিবর্তে নিউজিল্যান্ড ডেইরির ডুডলস, ফুওয়াং ও প্রাণের মিস্টার নুডলসের বিক্রি বেড়েছে।

স্বপ্নে ম্যাগি নুডলস বিক্রির হার কতটা কমেছে তা জানতে প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া বিভাগের একজন কর্মকর্তার কাছে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘ভাই যা জেনেছেন, জেনেছেন। আমাদের স্বপ্নের কোনো আউটলেটের নাম দিয়েন না। প্লিজ আমার নামটাও লিখবেন না।’

রাজধানীর অভয় দাস লেনের দোকানদার আলেক মণ্ডল  বলেন, ‘ভারতের সিসার খবরে বাংলাদেশের ম্যাগি নুডলস বিক্রির ওপর প্রভাব পড়েছে। আগে আমি সপ্তাহে এক কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি করতাম। এখন দুই সপ্তাহেও এক কার্টন ম্যাগি নুডলস বিক্রি করতে পারছি না।’

‘ম্যাগি নুডলসের বিক্রি কমেছে কিনা, দেশের সামগ্রিক বাজারে এর কতটুকু প্রভাব পড়েছে’— এ বিষয়ে জানতে চেয়ে নেসলে বাংলাদেশের কাছে ই-মেইল পাঠোনো হয়। নেসলে বাংলাদেশের স্পোকসম্যান ও করপোরেট এ্যাফেয়ার্সের পরিচালক নকীব খান এ বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে  ওই মেইলের জবাবে লেখেন- ‘ম্যাগি নুডলস বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে অবস্থিত নেসলে বাংলাদেশের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) তাদের নিয়মিত বাজার নজরদারির অংশ হিসেবে বাজার থেকে ম্যাগি নুডলসের নমুনা সংগ্রহ করেছিল এবং ম্যাগি নুডলস খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নেসলে বাংলাদেশের উৎপাদিত ম্যাগি নুডলস, দেশীয় (বিএসটিআই) ও আন্তর্জাতিকভাবে (CODEX) স্বীকৃত খাদ্যমানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।’

এদিকে ম্যাগিতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা নেই- বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) এমন সার্টিফিকেটের প্রতিও আস্থা রাখতে পারছেন অনেক ক্রেতা। ফলে অনেক পরিবারই তাদের শিশুর স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার কথা বিবেচনায় এনে ম্যাগি কেনা থেকে বিরত রয়েছে।

রাজধানীর গোপীবাগের বাসিন্দা সেলিম উদ্দিন  বলেন, ‘আগে প্রতিদিন সকালে ছেলেকে ম্যাগি নুডলস খাইয়ে স্কুলে পাঠাতাম। এখন ম্যাগি নুডলস তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি।’

ম্যাগি নুডলসের মানের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সার্টিফিকেশন অব মার্কস (সিএম) বিভাগের উপ-পরিচালক সেলিম রেজা বলেন, বিএসটিআই বাংলাদেশের বাজার থেকে ম্যাগি নুডলসের স্যাম্পল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখেছে এখানে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কিছু নেই।

তিনি বলেন, নেসলে ব্র্যান্ডের ম্যাগি নুডুলস নিয়ে ভারতের রায় দেওয়ার পর আমরা জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে স্বপ্রণোদিত হয়ে বাজার থেকে ম্যাগি নুডলসের স্যাম্পল সংগ্রহ করে বিএসটিআইয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেছি। পরীক্ষা শেষে দেখা গেছে, ২ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) সিসা রয়েছে।

এদিকে দ্য রিপোর্টের গাজীপুর প্রতিনিধি ফারুক আহমেদ নেসলের কারখানার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বর্তমানে ম্যাগি নুডলসের উৎপাদন আগের চেয়ে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারখানায় আগের মতো ডেলিভারি ট্রাকগুলো যাওয়া-আসা করছে না।

প্রসঙ্গত, ম্যাগি নুডলসে সিসা পাওয়ায় ভারত, সিঙ্গাপুর ও নেপালের বাজার থেকে এরই মধ্যে এ কোম্পানি তাদের পণ্য চটজলদি তুলে নিয়েছে। সিঙ্গাপুর এ পণ্যটি ভারত থেকে আমদানি করত। সর্বশেষ নেপাল সরকারও ম্যাগি নুডলস আমদানি বন্ধ করেছে। নেপাল সরকার দেশটির বাজার থেকে ম্যাগি নুডলস তুলে নেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল সিসার অস্তিত্ব পাওয়ার কারণে গত মাসে ম্যাগি ইনস্ট্যান্ট নুডুলসের একটি ব্যাচ ভারতের বাজার থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে উত্তরপ্রদেশের খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দফতর ফুড সেফটি এ্যান্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। ওই প্যাকেটগুলোতে মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট রাসায়নিকও অনুমোদিত মাত্রা থেকে বেশি ছিল, যা এমএসজি আজিনোমোটো নামে পরিচিত। এ ধরনের কেমিক্যালের কারণে ফুসফুসের বায়ুথলির পর্দা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

এফডিএ কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যাচের দু’ডজন প্যাকেট রাজ্য সরকার পরিচালিত ল্যাবরেটরিতে রুটিনমাফিক পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, তাতে সিসার পরিমাণ ১০ লাখ ইউনিটে ১৭ দশমিক ২ ভাগ (পিপিএম)। কিন্তু নিয়ম অনুসারে তা দশমিক ০১ থেকে ২ দশমিক ৫ ভাগ থাকার কথা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সিসার পরিমাণ ৭ গুণ বেশি পাওয়া গেছে ভারতের ম্যাগি নুডলসে।

প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন ভারতে ম্যাগি নুডলস বিক্রি বন্ধ করে দেয় নেসলে ইন্ডিয়া। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানোর সময় বলা হয়— সাম্প্রতিক দুর্ভাগ্যজনক বিতর্কের কারণে ম্যাগি নুডলসের বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।-দ্য রিপোর্ট

মতামত