টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস: বছরজুড়ে নীরব বর্ষায় সরব প্রশাসন

paharচট্টগ্রাম, ১৫ জুন (সিটিজি টাইমস):: বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে পাহাড়ি এলাকা নিয়ে শুরু হয় প্রশাসনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। আসে পাহাড় ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ, চালানো হয় উচ্ছেদ অভিযান, এমনকি দেখা যায় বসতিদের পুনর্বাসনের তোড়জোরও।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসন শুধু বর্ষাকালেই পাহাড়ে বসতিদের নিয়ে এত বিচলিত কেন। বিচলিত যদি হতেই হয় তাহলে সারাবছর নীরব থাকে কেন? আবার পাহাড় ধসের ঘটনায় যাদের প্রাণহানি ঘটে তাদের তো নিজের জীবন নিয়ে এত বিচলিত নন। বরং পাহাড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে বসতি।

জেলা প্রশাসনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজীদ এলাকা, অক্সিজেন, মতিঝর্ণা, টাইগারপাস, ওয়ারল্যাস কলোনি, খুলসি এলাকার প্রায় ৩০টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে প্রায় ১১ হাজার পরিবার, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়ি এলাকায় যারা বসবাস করে তারা মূলত ভাড়াটিয়া। রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পাহাড়ের জমি দখল করে কেটে পাকা-আধাপাকা বসতঘর তৈরি করে ভাড়ায় খাটিয়ে অর্থ উপার্জন করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফলে পাহাড় ধস নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই।

আর ভাড়ায় যারা থাকেন তারা হচ্ছে মূলত নগরীর স্বল্প আয়ের মানুষ। বিশেষ করে নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, খুলনা, রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙা জনগোষ্ঠী ও হতদরিদ্র মানুষ। যারা আয়ের সন্ধানে ছুটে এসে আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীতে। তাদের একটি অংশ কম ভাড়ায় পাহাড়ের নির্মিত বসতঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে।

সরেজমিনে আলাপকালে এসব পরিবারের কয়েকজন বলেন, বর্ষাকালে পানির তোড়ে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও নিরূপায় হয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে আমাদের। আয়-রোজগার থাকলে সাহেবদের মতো না হয় আবাসিক এলাকায় বড় বড় ভবনে থাকতাম।

চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী খাইরুনেছা (৩৪) বলেন, মউত (মৃত্যু) হবে জেনেও আমরা এখানে থাকি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ মউত যেদিন দিবে সেদিন কেউ বাঁচাতে পারবে না। মউত নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তাই আছি সরকারি অফিসারদের নিয়ে। বর্ষাকাল আসলে তারাই আমাদের শান্তি কেড়ে নেয়।”

অক্সিজেন এলাকার পাহাড়ে বসবাসকারী নুসরাত জাহান (৪২) বলেন, বর্ষা আইলে আমাগরলই বেডাগর দরদ বাইরা যায়। খালি কই এখান থেকা চলে যাইতে। না গেলে ঘর ভাঙি দেওনর ডর দেহায়। কী যন্ত্রণারে বাবা। শীতকালে আর গরমকালে শান্তিতে থাইকলে তাগও কারণে বাইরাকালে শান্তি পাই না।

তিনি বলেন, ১৫ বছর ধরে আছি আমি এই পাহাড়ে। বেডারা আগে কইছে আমাগরে নাকি পুনর্বাসন কইরব। শেষ মেষ মাঠ এক্কান নিই তাবু টাঙাই দে। কই বাইরাকাল না যাওয়া পর্যন্ত এইহানে থাইকত হইব। শেষে এক-দুই মাস রাখি আর খবর লই না।

স্থানীয় লোকজনের মতে, পাহাড়ের পাদদেশ দখল করে বসতঘর তৈরি না করলে ভাড়াটিয়ারা ভাড়ায়ও থাকত না। পাহাড় ধসে প্রাণহানিও ঘটত না। কিন্তু যারা বসতঘর নির্মাণ করেছে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। টানাটানি শুধু ভাড়াটিয়াদের নিয়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সে দলের নেতা পরিচয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি জমি দখল করে বসতঘর নির্মাণ করা হয়। সে হিসেবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ ছোটখাট দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বসতঘরও রয়েছে পাহাড়ি এলাকায়। যাদের সাথে প্রশাসন সখ্যতা গড়ে উঠাবসা করে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে প্রতি বছর বর্ষাকালে উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাবে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের বসতঘর উচ্ছেদ করলেও পরে টাকার বিনিময়ে আবার নির্মাণ করা হয় বসতঘর।প্রশাসন হয়তো এই কারণেই বর্ষাকালে পাহাড় ধসের কথা বলে উচ্ছেদ অভিযানে তৎপর হয়ে উঠে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন  বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসতঘর নির্মাণ করা হলেও বসবাসকারীদের সিংহভাগই স্বল্প আয়ের মানুষ। যাদের অনেকেই পাহাড়ে বসবাসের নেতিবাচক ধারণা সম্পর্কে সচেতন নয়।

তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এবং পাহাড়ে বসবাসের কারণে পরিবেশের যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয় এ ব্যাপারে প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে প্রশাসন সজাগ দৃষ্টি রাখে।

তিনি বলেন, গত ২০ বছরে চট্টগ্রাম মহানগরে বড় ধরনের প্রাণহানির বহু ঘটনা ঘটেছে। জেলার ১৫ উপজেলার পাহাড়ি এলাকায়ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। যা স্মরণ হলে এখনও গা শিউরে ওঠে। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে কারণে প্রশাসন সতর্ক।

তিনি আরো বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় জান-মাল রক্ষায় প্রশাসন প্রতিবছর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু পরে বসবাসকারীরা আবার ফিরে গিয়ে বসতঘর নির্মাণ করে। ফলে কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না পাহাড়ে বসবাস।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু বর্ষাকাল এলেই পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিয়ে প্রশাসন বিচলিত হয়ে উঠে তা নয়, পুরো বছর এ নিয়ে চিন্তিত থাকে। তবে ব্যস্ততার মাঝে হয়তো চিন্তায় একটু ভাটা পড়ে। বর্ষাকাল এলে তোড়জোর বাড়ে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত