টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কিছুতেই থামছেনা মা-বাবা স্বজনদের আহাজারী

মুল পরিকল্পনাকারী সরোয়ার ধরাছোঁয়ার বাহিরে

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি

Mirsarai-Sakib-Photoচট্টগ্রাম, ১৩ জুন (সিটিজি টাইমস)::  বাড়ির সামনে শত শত মানুষের ভিড়। কারো চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কারো মুখে শোকের চাপ। এখানে বাড়ির আঙিনায় সাকিবের কেটেছে অনেকগুলো বছর। সে আঙিনায় পাড়া-প্রতিবেশি, বন্ধু, সহপাঠি সবাই আছে নেই শুধু সাকিব। শুধুই শুণ্যতা। স্বজনদের কাছে আদরের দুষ্টু, সহপাঠীদের কাছে চঞ্চল আর শিক্ষকদের কাছে সদা অনুগত-হাসিখুশি। এ ছিল ১৫ বছর বয়সি ফারহান সাকিবের কিশোর বেলা। জীবনের অবেলায় নিরপরাধ এই কিশোরের নির্মম মৃত্যুকে কেউই মেনে নিতে পারছেন না। এদের কেউই এখনো বুঝতে পারছেন না, এতটুকু বয়সের ছেলেটিকে কেন এমন নির্দয়ভাবে খুন করা হল। কি অপরাধ নির্মল-নিষ্পাপ চেহারার এ ছেলেটির?

শুক্রবার রাতে সাকিবের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসার পর মা-বাবা, ভাই বোন আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশিদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। কেউ-কাউকে সান্তনা দেয়ার মতো লোকও ছিলোনা। রাতে জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে সাকিবকে দাফন করা হয়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) সন্তানের মৃত্যুতে আহাজারী আর কান্নায় বুক ভাসিয়ে চলেন সাকিবের মা বিবি রহিমা। বাড়ির আঙিনায় সমবেদনা জানাতে আসা স্বজন প্রতিবেশিদের প্রতি তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘কেন আমার বুকের ধনকে ওরা মেরে ফেললো? কি দোষ করেছিল আমার সাকিব? তোমরা আমার সাকিবকে এনে দাও।’

বার্ধক্যের নষ্টালজিয়ায় বাবা নাছির আহম্মেদ স্মৃতিভ্রষ্ট। তিনি তখনো বুঝতে পারেন নি, কি হয়েছে তাঁর আদরের সন্তান সাকিবের। কেন সবাই কান্নাকাটি করছে? এমন প্রশ্নের জবাব কেউ তাঁকে দিতে পারছিলেন না। তাঁর এমন প্রশ্নে এ প্রতিবেদকও বিব্রত হতবাক দৃষ্টিতে নিশ্চুপ ছিলেন।

বড় ভাই শহিদুল ইসলাম রুবেল পরিবারের সকলকে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে শান্তনা দিচ্ছেলেন। অথচ নিজের একমাত্র আদরের ছোট ভাইয়ের অবেলায় চলে যাওয়ার কারণ কি তাও তিনি বলতে পারছিলেন না। শুধু এটুকু বলছিলেন, ‘পাশের বাড়ির সরোয়ার এত জঘন্য খুনি আমাদের জানা ছিল না। তার এবং তার পরিবারের সাথে আমাদের কোন কালেও শত্রুতা ছিল না। বরং আমার ছোট ভাই খুনি সরোয়ারকে চাচা বলে সম্মোধন করতো।’

এসময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শহিদুল বলছিলেন, ‘ওরা টাকার জন্য যদি আমার ভাইকে অপহরণ করে তাহলে যত টাকা চাইতো আমরা দিতাম। কেন আমার দুষ্টু আদরের ভাইটাকে এভাবে খুন করলো। কি অন্যায় করেছে আমার ভাই?’

যে সহপাঠীদের সঙ্গে দিনের পুরো বেলা কাটতো সাকিবের, যারা ক্লাশে আর খেলার মাঠে অপেক্ষায় থাকতো সাকিবের। শনিবার তাদের দেখা মিলেছে বাড়ির উঠোনে। প্রিয় সহপাঠীর লাশের অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। একটু এগিয়ে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে কেউ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

তাদের মধ্যে সাকিবের সবচে কাছের সহপাঠী রিজভী। তার কাছে সাকিব সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জানায়, ‘যেদিন সাকিব অপহরণ হয় সেদিন আমরা পাশাপাশি বসে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা দিয়েছি। পরের পরীক্ষা ছিল ইসলাম ধর্ম। সেদিন দেখা হবে বলেছিল সে। আমি তাকে স্কুল বাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলাম।’

Mirsarai-Sakib-Photo-(1)সাকিবের অন্যান্য সহপাঠীরা জানায়, ‘সাকিব স্কুলে খুব হাসিখুশি চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। স্কুলের নাটক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও খেলাধূলায় নিয়মিত অংশ নিত। আমাদের কাছে সে ছিল মধ্যমণি।’

সাকিবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চ বিদ্যালয়ের (জেবি) সহকারী প্রধান শিক্ষক সুভাষ সরকার বলেন, ‘অত্যন্ত অনুগত, সদালাপী এবং শান্ত প্রকৃতির ছাত্র ছিল সাকিব। ক্লাশে কিছু বললে হেসে উঠতো। সর্বশেষ সে স্কুলের বৈশাখী অনুষ্ঠানের একটি নাটকে অংশ নিয়েছিল।’ ওই শিক্ষক সাকিবের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় দুই বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ফারহান সাকিব। বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন বিবাহিতা, অন্যজন ফাহমিদা ইয়াসমিন রিয়া স্থানীয় গোলকের হাট পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বড় ভাই শহীদুল ইসলাম রুবেল উপজেলার বারইয়াহাট পৌরসভার ষ্টার ফ্যাশন নামের বস্ত্র বিতানের স্বত্তাধিকারী।

এদিকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় হোসনে মোবারক শহীদ ও রুবেল হোসেন নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেলেও ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সরোয়ার এখানো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রয়েছে।

এ বিষয়ে জোরাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী বলেন, অপহরণ ও হত্যার সাথে জড়িত ২জনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সরোয়ার নামে একজনকে গ্রেপ্তারের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। আশা করছি তাকে শীঘ্রই গ্রেপ্তার করতে পারবো।

মতামত