টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ঘুষ, দূর্নীতির আখড়া রাঙ্গুনিয়া ভূমি অফিস

আব্বাস হোসাইন আফতাব
রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি 

চট্টগ্রাম, ১০ জুন (সিটিজি টাইমস)::  প্রশাসনের নিরবতায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ভূমি অফিসগুলো সীমাহীন দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। মালিকানার রেকর্ড জালিয়াতের মাধ্যমে চলছে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম। দালালদের নিয়ন্ত্রনে উপজেলাসহ সব ভূমি অফিস। দালাল ছাড়া কোনো কাজেই হাত দেননা অফিস কর্তারা। আর এরূপ ভূমিদস্যুদের দৌরাত্মে মালিকরা নিজেদের জমিজমা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিসের সাথে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্রে রয়েছে ব্যাপক গড়মিল।

এদিকে ভূমিদস্যুদের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ নিরীহ ভূমির মালিকরা। ভূমি অফিসের এক শ্রেনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজসে ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভূয়া নামজারি খতিয়ান তৈরি করে নিরীহ মানুষের জমির উপর জবর দখল চলছে। এ ভূমিদস্যু চক্রের ভূয়া রেকর্ডের মাধ্যমে জমি কেনাবেচা করে নিরীহ মানুষ অহরহ প্রতারিত হচ্ছে । যত্রতত্র লেগে যাচ্ছে দাঙ্গাহাঙ্গামা । দাবীকৃত নিদিষ্ট ঘুষের টাকা হাতে পৌঁছে না দিলে নাম জারির আবেদন ফাইল নড়েচড়ে না। মাসের পর মাস পড়ে থাকে ফাইল। ফলে সাধারন ভুক্তভোগীদের কষ্টের সীমা থাকেনা। মিউটেশন বা নামজারী মামলার সরকার নির্ধারিত ফি ২৪৯ টাকা হলেও দালাল চক্রের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ কর্মকতা-কর্মচারীরা নিরীহ লোকদের কাছ থেকে ৭ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। জায়গার কাগজপত্রে কিছু হেরফের থাকলে টাকা গুনতে হয় আরো বেশী। রাঙ্গুনিয়া ভূমি অফিস যেন এর রাম রাজত্ব। যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে লুটেপাট চালাচ্ছে।

এছাড়াও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দূর্নীতির চিত্র আরো ভয়াবহ। স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া তারানী চরন হাট ( টি সি হাট ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তহশিল্দার হিসেবে সম্প্রতি যোগদান করেন মো. একরাম হোসেন। টিসির হাট ভূমি অফিসে পর পর দুইদিন গিয়েও ১২ টার আগে অফিসে পাওয়া যায়নি তাকে। ভূমি অফিসে গিয়ে এলাকার লোকজন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। কর্মকর্তারা যেন রাজার হালে অফিস করেন।

এলাকার যুবক পিনু সিকদার জানান, টিসির হাট ভূমি অফিসে কর্মকর্তাদের সকাল টাইমে পাওয়া যায়না। দুপুর ১২ টার পর অফিস করেন কর্মকর্তারা। অফিসের গুরুত্বপূর্ন রেকর্ডের কাজ সামলান পিয়নরা।

ইতিপূর্বে তিনি শিলক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে থাকাকালে নামজারির নামে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। তাছাড়া এ অফিসের সহকারি তহসিলদার রাশেদুল ইসলাম অন্যত্র বদলি হওয়ার পূর্বে অর্ধকোটি টাকার বানিজ্য করেছেন। এ অফিসের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী এল এম এস এস তথা অফিস সহায়ক প্রীতিকনা ভট্টাচার্য্য এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একই অফিসে চাকুরী করার সুবাদে জমির পর্চা, খতিয়ান, বিএস, দাগসহ নামজারির নামে মৌজার নিয়ন্ত্রিত জনগনের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহনের বহু অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে রানীরহাটস্থ ঘাগড়া ভূমি অফিসের তহশিলদার সুমন চৌধুরী ইতিপৃর্বে চাকুরী করা পদুয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মত দূর্নীতির মাধ্যমে দুহাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পুরনো অভ্যাস এখনো পরিবর্তন করতে পারেননি। এমনও শুনা যাচ্ছে পদুয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দ্বৈত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

ভূক্ত ভোগী এলাকার লোকজন সুত্রে আরও জানা গেছে,পদুয়া ইউনিয়ন ভুমি অফিসের সহকারী তহশিলদার তিলক শীল খাজনা আদায়ের নামে সুমন চৌধুরীর মত তিনিও এলাকার জনগণকে জিম্মি করে অতিরিক্ত হারে টাকা আদায় করছে। এমনকি নিয়মিত অফিসে না আসার কারনে ভূমি অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ন কাজ সহ জনগনের খাজনা আদায়ের মত কাজও ধীরগতিতে চলছে। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে নামজারীর অজু হাতে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে ৫০ গুন বাড়তি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক অভিযোগে জানা যায়, পদুয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাজও সপ্তাহে দুদিন করে চালিয়ে নিলেও নামজারির নামে অবৈধভাবে জনগণের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেবার ঘটনা দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের কোন ভুমিকা না থাকায় যেন মনে হচ্ছে দূনীর্তির সাথে প্রশাসনের সরাসরি যোগসাজস রয়েছে।

অপরদিকে শিলক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রন কান্তি সুশীল নতুন তহশিলদার গত ১০ মে যোগদানের পূর্বে সহকারী তহশিলদার হানিফ হোসাইন গত দু‘মাসে লাখ টাকার নামজারির বানিজ্য করার কারনে এ অফিসের ভূমি দালালদের দৌরাতœ্য বেড়ে যায়। অন্যদের মত তাল মিলিয়ে এ সহকারী তহশিলদার ঘূষ দূনীর্তির বানিজ্য চালিয়ে জনগনের টাকা হাতিয়ে নেন। এভাবে থেমে নেই অপর ইউনিয়ন ভূমি অফিস পোমরা কাউখালী অফিসটি। এ অফিসের বর্তমান তহশিলদার মো. জাকারিয়া নামজারির নামে প্রতি কবলা থেকে ৭ থেকে ২০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেবার কয়েকটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটে যাওয়ার পরও প্রশাসনের নিরব ভুমিকা জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

খাজনা দিতে আসা নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক পোমরা এলাকার জনৈক ব্যক্তি জানান, মেয়ের বিয়ে দিতে জরুরীভাবে জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। কিন্তু খাজনার দাখিলা ছাড়া জমি বিক্রি করতে পারছিনা। পোমরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জায়গার তামিল না থাকায় খাজনা না নেয়ার কথা জানিয়ে দেয়। উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি কার্যালয়ে একই জায়গা তামিল থাকলেও অফিসের মারপ্যাচে জায়গার রেকর্ড সংশোধনে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।

তাছাড়া, রাঙ্গুনিয়ার ৫টি ভুমি অফিসে অন্তত শতাধিক দালালের মাধ্যমে নামজারি বা মিউটেশনর মত কাজটি হয়ে থাকে। এদের মাধ্যমে ভূমি নামজারি না করালে সাধারন জনগনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। যার কারনে দালালরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাধারন জনগনের কাছ থেকে প্রতি নাম জারির নামে ৭ হাজার থেকে ২০হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিতে দ্বিধাবোধ করেনা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুমনি আক্তার জানান, আমি আসার আগে কি হয়েছে জানি না। ভূমি জটিলতার বিভিন্ন বিষয়ে আবেদন পেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাছাড়া অফিস ষ্টাফদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অতিরিক্ত টাকা আদায় ও অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মতামত