টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

খালেদা-মোদি বৈঠকে প্রত্যাশা পূরণ না হলে ভারত বিরোধিতার চিন্তা বিএনপির

bnpচট্টগ্রাম, ০৬ জুন (সিটিজি টাইমস) ::  খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোদির বৈঠক নির্ধারিত হওয়ায় বেশ উৎফুল্ল অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, বাংলাদেশের জনমতের কথা বিবেচনায় নিয়ে শেষপর্যন্ত মোদি সরকার বাংলাদেশ প্রশ্নে তার অবস্থান বদল করবে । অর্থাৎ পরোক্ষভাবে হলেও এদেশে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যাপারে ভারত তার অবস্থানের কথা ব্যক্ত করবে । তবে বিএনপির এ প্রত্যাশা পূরণ না হলে দলটি আবার ভারতবিরোধী অবস্থানে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছে।

বস্তুত ভারতের সমর্থন লাভের আশায় গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘ভারত বিরোধিতা’ বাদ দিয়ে দলটি উল্টো দেশটিকে খুশি করার নীতিতে চলছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তো দূরে থাক, দলটির মধ্যম পর্যায়ের কোনও নেতাও এখন আর ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না । উল্টো খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, বিএনপি কখনই ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না।

খবর নিয়ে জানা গেছে, মোদির বাংলাদেশ সফরকে সামনে রেখে গত সপ্তাহে বিএনপির পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা দিতেই খালেদার নির্দেশে রিপন ওইসব কথা বলেছেন । যোগাযোগ করা হলে রিপন অবশ্য এর বাইরে কিছু বলতে রাজি হননি।

তবে বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে দলটির এই প্রত্যাশা ও মনোভাবের কথা জানা গেছে। শনিবার সকালে ওয়াশিংটনে অবস্থানকারী দলটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ড. ওসমান ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কী হচ্ছে বা এখানকার রাজনৈতিক অবস্থা কী সবকিছুই মোদি সরকার জানে। নির্বাচন হলে কোন দল ক্ষমতায় আসবে এ বিষয়টিও তাদের জানা। ফলে জনমতের কথা বিবেচনায় না নিয়ে ভারত পারবে না। তার মতে, বিশ্বব্যাপী এখন রাজনীতির হিসেব-নিকেশ বদলে গেছে। যে দেশটিকে সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কাজ করেছে, সেই ইরানের সঙ্গে পর্যন্ত আজ যুক্তরাষ্ট্র আলাপ-আলোচনা করছে। ফলে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক সবসময় বৈরী থাকবে এটি ভাবা ঠিক নয়। তার মতে, ৭ জুন বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে মোদি যে জনবক্তৃতা দেবেন তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

ওসমান ফারুকসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, বিএনপি চেয়পারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলটির বেশ কয়েকজন নেতা মোদির সফরকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলে স্বীকার করেন। এদের মধ্যে দু’একজন নেতা জানান, দেশটির কূটনীতিকদের পাশাপাশি ভারতের ‘ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রে’র সঙ্গে তাদেরও যোগাযোগ রয়েছে। তারাই বিএনপিকে আশ্বস্ত করছে, সময়মতো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন প্রশ্নে মোদি সরকার তার অবস্থানের কথা অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও সরকারকে জানাবে। আর এমন আশ্বাসের ভিত্তিতেই বিএনপি তার ভারত বিরোধিতা থেকে সরে আসছে । তাদের মতে, ভারতের আমলাতন্ত্র অনেক শক্তিশালী। ফলে মোদি চাইলেও রাতারাতি দেশটির অবস্থান বদল সম্ভব নয়। তাই হয়তো সময় লাগছে। তবে শেষপর্যন্ত যদি বোঝা যায় যে, নানা কৌশলে সময়ক্ষেপন করে ভারত আসলে শেখ হাসিনা সরকারকেই ক্ষমতায় রাখতে চায়, সেক্ষেত্রে বিএনপিও আগের অবস্থায় অর্থাৎ ভারতবিরোধী অবস্থানে ফিরে যাবে । এ ব্যাপারে ভারত তথা বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগরক্ষাকারী বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাও একমত পোষণ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক কূটনীতিক এক বিএনপি নেতা বলেন, বাংলাদেশে যেনো-তেনো নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী একটি সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য কাজ করে গেছে বিগত কংগ্রেস সরকার। তাই ওই সরকারের ‘বোঝা’ বিজেপি টানবে বলে মনে হয় না। সাবেক কূটনীতিক আরেক নেতা বলেন, আমরা শেখ হাসিনা সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আবদার করছি না। শুধু বলছি- গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের জন্য সরকারকে তারা যেনো বলে। কারণ ভারতের দোহাই দিয়েই এ সরকার ক্ষমতায় আছে। তাই বিএনপিও এ বিষয়টিই ভারতের সামনে তুলে ধরছে।

প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, সবকিছুই তো ইতিবাচক মনে হচ্ছে। অনেক দোলাচলের পর শেষপর্যন্ত খালেদা-মোদি বৈঠক হচ্ছে। তবে আমরা আশা করবো- এদেশের জনগণ কী চায় সে বিষয়টি যাতে ভারত বিবেচনায় নেয়। তার মতে, বিশেষ দলের সঙ্গে নয়; জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করলে এদেশে ভারতের স্বার্থ বেশি রক্ষা হবে। তা-না হলে টেকসই সম্পর্ক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হতে পারে বলে জানান সাবেক এই সেনাপ্রধান।

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট দূর করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মোদি সরকার ভূমিকা পালন করলে বাংলাদেশের জনগণ বেশি খুশি হবে। আশা করি মোদির সফরের মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণ এমন বার্তাই পাবে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এদেশে কী হয় মোদি সরকার জানে না এমন কিছু নেই। ফলে তারা ভারতের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি এদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে সময় স্বল্পতার কারণে হয়তো মোদিকে সব কথা বলা সম্ভব হবে না এমন ধারণা থেকে লিখিত একটি ‘স্ক্রিপট’ তৈরি করেছে বিএনপি । এতে বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কখন এবং কী কারণে তৈরি হয়েছে তার বিশদ বর্ণনাসহ থাকবে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগও। বিশেষ করে গুম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহতদের একটি তালিকা এসময় দেওয়া হতে পারে।

একটি সূত্রের দাবি, বৈঠককালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি লিখিত না হলেও মৌখিক আলোচনায় আশ্বস্ত করতে চায় বিএনপি। এছাড়া আলোচনার সুযোগ হলে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিএনপির আপত্তি নেই বলে জানিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া জামায়াত প্রশ্নেও কথা বলতে পারে বিএনপি। তবে আনুষ্ঠানিক কূটনীতিতে এসব প্রসঙ্গ উঠবে বলে দলটি মনে করে না।

কূটনীতিকদের পাশাপাশি ভারতের ‘ক্ষমতার বিকল্প বিভিন্ন কেন্দ্রে’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিএনপির আলোচনায় জামায়াতকে ত্যাগ করার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানকে অন্তত ৫ বছরের জন্য রাজনীতির বাইরে রাখার প্রসঙ্গটি নানাভাবে আলোচনায় উঠছে। তবে এ প্রশ্নে বিএনপি তার অবস্থান এখনও স্পষ্ট করেনি। মোদির সঙ্গে বৈঠকে এসব ইস্যুও উঠবে না। তবে পর্দার আড়ালে বা অনানুষ্ঠানিক কূটনীতিতে এ দুটি বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপির জন্য কঠিন বলেই দলটির অনেকে মনে করেন।-বাংলা ট্রিবিউন

মতামত