টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

নতুন মেরুকরণ হচ্ছে চট্টগ্রাম নগর আ. লীগে

albdচট্টগ্রাম, ০৬ জুন (সিটিজি টাইমস) : এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী ও আলহাজ এম মনজুর আলম। দুজনই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। একজন টানা দায়িত্ব পালন করেছেন তিন মেয়াদে প্রায় ১৬ বছর। আর আরেকজন এক মেয়াদে পাঁচ বছর। শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশজুড়ে রয়েছে তাদের পরিচিতি। তাদের নিয়ে আছে নানা আলোচনা, সমালোচনা-রহস্য। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নগর রাজনীতিতে একক আধিপত্য ছিল এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর। বিচক্ষণ ও সাহসী রাজনীতিবিদ হিসেবে তার যেমন সুনাম রয়েছে তেমনি কারণে- অকারণে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে আলোচনায়ও এসেছেন বহুবার। এদিকে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ক্লিন ইমেজ ও দানবীর হিসেবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পরিচিত আলহাজ এম মনজুর আলম। পরপর তিনবার সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হয়ে ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিন বছর চসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে এক সময়ের গুরু মহিউদ্দীন চৌধুরীকে প্রায় এক লাখ ভোটে পরাজিত করে দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। সদ্যসমাপ্ত চসিক নির্বাচনে আবারো বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র পদে নির্বাচন করে ভোট শুরুর তিন ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় আবারো আলোচনায় এম মনজুর আলম। ইতিমধ্যে সিটি নির্বাচনের ডামাডোল শেষ হয়েছে। নগরবাসী পেয়েছেন নতুন নগর পিতা। তারপরও চট্টগ্রাম নগরীর এই দুই সাবেক মেয়রকে নিয়ে নগরবাসীর আগ্রহ, আলোচনা, সমালোচনা-রহস্যের কমতি নেই। এখনো চায়ের কাপে রীতিমতো ঝড় উঠে তাদের নিয়ে। তারা এখন কোন পথে তা নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা-রহস্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে নগরবাসী।

মহিউদ্দীনের উপর ক্ষুব্ধ দলের হাইকমান্ড

সদ্যসমাপ্ত চসিক নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী আ জ ম নাছিরের পক্ষে তেমন তৎপর ছিলেন না দলের মহানগরের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। নিয়ম রক্ষার জন্য কয়েকটি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিলেও শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে অনেকটা প্রচার প্রচারণা থেকে দূরে ছিলেন তিনি। ওই সময় মহিউদ্দীন চৌধুরীর নীরবতা ভাঙাতে ও নির্বাচনী কর্মকা-ে আরো সক্রিয় করতে দলের সভানেত্রীর নির্দেশে চট্টগ্রামে ছুটে এসেছিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। তবুও নীরবতা ভাঙেনি মহিউদ্দীন চৌধুরীর। নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়া ছাড়া আর তেমন কিছুতেই ছিলেন না তিনি। সকাল ১১টায় নগরীর মোহাম্মদ মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোট দিয়ে সারা দিন চশমা হিলস্থ বাসভবনে অবস্থান করেন মহিউদ্দীন চৌধুরী। নির্বাচনে আ জ ম নাছিরের পক্ষে মহিউদ্দীন চৌধুরীর সক্রিয় ভূমিকা না রাখার বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়েছে দলের সভানেত্রীর। তিনি বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ মহিউদ্দীনের ওপর। সিটি নির্বাচনের পরে গণভবনে আ জ ম নাছির ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি সে ব্যাপারে কিছুটা ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। অবশ্য ওই মতবিনিময় সভায় মহিউদ্দীন চৌধুরীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে তিনি তাতে অংশ নেননি।

মহিউদ্দীন শিবিরে হতাশা, নেতা-কর্মীরা ঝুঁকছেন নাছিরের দিকে

এবারের চসিক নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় অনেকটা হতাশ মহিউদ্দীন চৌধুরীর অনুসারীরা। নগরীর কিছু নেতা-কর্মী এখনো মহিউদ্দীন চৌধুরীর বলয়ে সক্রিয় থাকলেও অনেক পুরনো অনুসারীরা ভোল পাল্টিয়ে নতুন মেয়র আ জ ম নাছিরের বলয়ে ভিড়তে শুরু করেছে। যারা তাদের একসময়ের গুরু মহিউদ্দীন চৌধুরীকে খুশি করার জন্য আ জ ম নাছিরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন তারা এখন আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তারা নিয়মিত আ জ ম নাছিরের ব্যক্তিগত অফিসে সকাল-বিকাল হাজিরা দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম নগরকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যারা এতদিন নিজেদের মহিউদ্দীন চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট দাবি করতেন তারাও এখন নতুন মেয়র আ জ ম নাছিরের সুদৃষ্টি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মহিউদ্দীন চৌধুরীর অনুগত ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মীকেও এখন আ জ ম নাছিরের বলয়ে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে।

নতুন মেরুকরণ হচ্ছে নগর আওয়ামী লীগে

দীর্ঘদিন ধরে নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একক আধিপত্য ছিল মহিউদ্দীন চৌধুরীর। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করেছিলেন নিজের অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে। নগরীর থানা ও ওয়ার্ডগুলোতে একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে মহিউদ্দীন চৌধুরীর। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটিও করেছিলেন নিজের অনুগতদের প্রাধান্য দিয়ে। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত চসিক নির্বাচনে দলের মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে ঘিরেই চট্টগ্রামের নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলাদা শক্তিশালী বলয় তৈরি হচ্ছে। শিগগিরই নগর আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ড কমিটিগুলোতে শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে পারে। নেতৃত্বের পরিবর্তন আসতে পারে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। সম্প্রতি নগর আওয়ামী লীগের এক অনুষ্ঠানে যারা দলীয় পদ আঁকড়ে থেকে দলীয় কর্মকা- সঠিকভাবে পালন করছেন না তাদের পদ-পদবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এমনটাই ইঙ্গিত করেছেন নবনির্বাচিত মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির।

মহিউদ্দীনের গাড়িতে পতাকা চান অনুসারীরা

১৯৭৫-পরবর্তী দলের কঠিন সময়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা ছিল মহিউদ্দীন চৌধুরীর। দলের কঠিন সময়েও মাঠ ছাড়েননি তিনি। সবসময় নেতা-কর্মীদের নিয়ে মাঠে সরব ছিলেন। সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও ৭০ বছর বয়সী এই ঝানু রাজনীতিবিদের গাড়িতে পতাকা চান তার অনুসারীরা। শেষ বয়সে মহিউদ্দীন চৌধুরীর মূল্যায়ন হিসেবে তাকে টেকনোক্র্যাট কোঠায় মন্ত্রিসভায় বা মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দেখতে চান তারা। তাদের দাবি মহিউদ্দীন চৌধুরী জীবন ও যৌবন পার করেছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। দলের জন্য তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ’৭৫-পরবর্তী বিভিন্ন সময়সহ ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও জেল খাটতে হয়েছে তাকে। তারা চান শেষ বয়সে এসে মহিউদ্দীন চৌধুরীর উপযুক্ত মূল্যায়ন হোক। আর এ মূল্যায়ন হতে পারে সরকারের উপদেষ্টা বা টেকনোক্র্যাট কোঠায় মন্ত্রিসভার সদস্য করার মাধ্যমে। কিন্তু দলীয় হাইকমান্ড থেকে এ রকম প্রস্তাব মহিউদ্দীন চৌধুরী আদৌ পাবেন কি না কিংবা প্রস্তাব পেলে তিনি তা গ্রহণ করবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে নেতা-কর্মীদের মাঝে। অবশ্য মহিউদ্দীন চৌধুরী বলছেন তিনি মন্ত্রী হতে চান না, তিনি মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সেটা তাকে দেওয়া হয়নি। এখন মন্ত্রী করা হলে সেটা হবে তার নীতিবিরুদ্ধ।

নীরবে তৎপর মনজুর আলম

সদ্য অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে ভোট শুরুর তিন ঘণ্টা পর নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি রাজনীতি থেকেও বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেন মনজুর আলম। ভোট বর্জনের পরেও মাত্র তিন ঘণ্টায় প্রায় ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৫ ভোট পান তিনি। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, ভোট গ্রহণের অল্প সময়ে মনজুর আলমের পক্ষে ভোটের এ হিসাবই প্রমাণ করে নগরীতে কতটা জনপ্রিয় মনজুর আলম। তারা বলছেন, ভোট বর্জন না করে নির্বাচনে থাকলে হয়ত বা ভোটের ফলাফলও অন্যরকম হতে পারত। সিটি নির্বাচনের পর মনজুর আলম তার নিজ বাসভবনেই সময় পার করছেন। সেখানে তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাক্ষাৎ দিচ্ছেন। ফোন করে অনুসারীদের খবরাখবর নিচ্ছেন। সম্প্রতি মনজুর আলমের সঙ্গে তার বাসভবনে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন চট্টগ্রামস্থ ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সোমনাথ হাওলাদার ও ইউএসএইড-এর চার সদস্যের প্রতিনিধিদল। সাক্ষাৎকালে উভয় দেশের চলমান রাজনীতি ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, রাজনীতিবিদদের শেষ কথা বলতে কিছু নেই। অভিমান করে সাময়িকভাবে মনজুর আলম রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে দূরে থাকলেও কিছুদিন পর আবার হয়ত রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন।

মনজুর আলমকে আওয়ামী লীগে ভেড়াতে চান একটি গ্রুপ

পুরনো সবকিছু ভুলে মনজুর আলমকে আবারো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চান আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ। মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেই পর পর তিনবার ওয়ার্ড কমিশনার ও বিভিন্ন সময় চসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছিলেন মনজুর আলম। ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে মেয়র পদে লড়তে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির টিকিটে মেয়র পদে নির্বাচন করে মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে নাম লেখান মনজুর আলম। মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুরনো সখ্যের কারণে গত পাঁচ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে। ওই সময় আওয়ামী লীগের একটি বলয়ে ঘেরা ছিলেন তিনি। সদ্য সমাপ্ত চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওই বলয়টি গোপনে মনজুর আলমের পক্ষে কাজ করেছে। সম্প্রতি মনজুর আলম বিএনপির রাজনীতি থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেওয়ায় এই সুযোগে আবারো তাকে আওয়ামী লীগের বলয়ে ফিরিয়ে আনতে চান নগর আওয়ামী লীগের একটি অংশ। তারা বলছেন, পেশায় ব্যবসায়ী, দানবীর ও সব মহলে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মনজুর আলমকে আবার আওয়ামী লীগে ফিরিয়ে আনতে পারলে সংগঠনেরই লাভ হবে। তারা চান মনজুর আলম আওয়ামী লীগে ফিরে এসে আগামী সংসদ নির্বাচনে নগরীর একটি আসন থেকে সংসদ সদস্যের পদে নির্বাচন করুক। অবশ্য ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নগরীর একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ১০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন মনজুর আলম।

এদিকে সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আপাতত এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আর নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে অবস্থান করায় বিষয়গুলো নিয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।

মতামত