টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রা: দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজ তালিকা

Malyesia

ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
স্বপ্নের মালয়েশিয়া। জেলার উপকূলীয় এলাকার আতঙ্কের নাম। গত ৫ বছরে এই এলাকা দিয়ে পাচার হয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশী লোক। সেখানে নিখোঁজ রয়েছে অন্তত সাড়ে তিন হাজার। এখন এসব পরিবারে শুধু দুঃখ আর দুঃখ। দুঃখ ছাড়া সঙ্গি বলতেই নেই তাদের। দালালের সেই কালো হাত তছনছ করে দিয়েছে অনেকের সাজানো সংসার। সব বিলিয়ে দিয়েও বাবা ফেরত পায়নি তার সন্তান আর স্ত্রী পায়নি তার স্বামী। স্বজনহারাদের অর্তনাদে দিন দিন ভারী হয়ে ওঠছে আকাশ। দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজ তালিকা। ভাষা নেই শান্তনার। আর দালালচক্র রয়ে গেছে ধরা ছোয়ার বাইরে। ফলে স্বজনহারা পরিবারগুলোতে দিনরাত কান্না ছাড়া আর কিছুই নাই।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিয়ারঘোনার করাচিপাড়া গ্রামের সুলতান আহমদ মিস্ত্রীর তিন ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল, মোহাম্মদ তৈয়ব ও মোহাম্মদ সিদ্দিক দুই বছর পূর্বে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ে। এখনও পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি তাদের।
একইভাবে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও কালিরছড়ার শিয়াপাড়া ও চান্দেরঘোনা এলাকার ১০ জনের। তাদের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছরের কিশোর সাইফুল ইসলাম। পিতা ছৈয়দনুর একজন দরিদ্র রিক্সাচালক। স্থানীয় চিহ্নিত দালালরা কৌশলে ট্রলারে তুলে দেয় তাকে। দালালের নাম জানলেও ভয়ে মুখ খোলছেনা।
চান্দেরঘোনা এলাকার কুদরত উল্লাহ পাটোয়ারীর ছেলে মিজানুর রহমান। দেড় বছর ধরে নিখোঁজ। ছেলের পাসপোর্টের ছবিতে হাত বুলিয়ে অশ্রু ফেলছেন বাবা। ছেলেকে ফিরে পাওয়াই বাবার একমাত্র চাওয়া। এরকম চিত্র আরো আছে। এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে গিয়ে ওঠে আরো অনেক নিখোঁজ যুবকের তথ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিথ্যা লোভে পড়ে দালালের নৌকায় চড়ে বসে ঈদগাঁও কালিরছড়াস্থ শিয়াপাড়া এলাকার বদিউজ্জামানের ছেলে নুরুল আমিন, মোঃ নুরুল হুদার ছেলে মোঃ ইউনুছ , আবদু শুক্কুরের ছেলে আবদ্ল্লুাহ, নাজেম উদ্দীনের ছেলে সাহাব উদ্দীন, মীর আহমদের ছেলে নুরুল আলম, মকতুল হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দীন, ফয়েজ হোসেনের ছেলে ইয়াছিন, মমতাজ আহমদের ছেলে দেলোয়ার হোসেন, আবুল হোসেনের ছেলে জুবাইর, চান্দেরঘোনা এলাকার মৃত মোস্তফা কামালের ছেলে সেলিম মিয়া, মৃত মোক্তার আহমদের ছেলে মিজানুর রহমান, আমির হোসেনের ছেলে আবুল কালাম, শাহ আলমের ছেলে নুরুল হুদা, নুরুল আলমের ছেলে মিজানুর রহমান, ইসলামাবাদ পূর্ব গজালিয়া গ্রামের নুরুল হকের ছেলে জাহেদুল ইসলাম ও মৃত মোক্তার আহমদের ছেলে মিজানুর রহমান। দেড়/দুই বছর ধরে তাদের অনেকের খোঁজ মেলেনি। এসব নিখোঁজ পরিবারগুলোতে কান্না ছাড়া কিছুই নেই। শান্তনা দেয়ারও কেউ নেই।
স্বামীর প্রতীক্ষায় দুই বছর ধরে স্ত্রী ফারেছা:
কক্সবাজার জেলা শহরের সমিতিপাড়ার বাসিন্দা বদিউল আলম। সংসারে প্রায় সময় লেগে থাকত দারিদ্রতা। তাই দারিদ্রের কষাঘাতমুক্ত হতে স্থানীয় দালালের হাত ধরল। ওঠে বসল দালালের সেই নিষ্ঠুর ট্রলারে। এরই মাঝে দুইটি বছর পার হল। কোন খোঁজ নেই তার। পরিবারে নেমে এসেছে কালো ছায়া। বদিউল আলমের পরিবারে রয়েছে ৭ বছর বয়সী একটি শিশু। কখন স্বামী ফিরবে সেই প্রতিক্ষায় অসহায় মা ছেলে সময় কাটাছে সাগর  তীরেই। তাদের ধারনা, যে পথে যাওয়া সে পথেই হয়তো এক সময় ফিরে আসবে প্রিয় মানুষটি।
স্বামী বদিউল বেঁচে আছে না মারা গেছেন সে খবর জানা সম্ভব হয়নি ফারেছার। এখন অজানা ইতিহাস হয়ে আছে স্বপ্নবাজ যুবক বদিউল আলম। শহর থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাগর পাড়ের সমিতি পাড়ায় ফারেছার বসবাস। এক সন্তানের সংসারে দুইমুঠো অন্ন জোগাতে ‘পরিছন্নতা কর্মী’র কাজ নিয়েছে ফারেছা।
তিনি জানান, যাত্রার এক সপ্তাহ পর তাকে ফোন করেছিলেন স্বামী বদিউল আলম।  এসময় তিনি তিনি থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপে আটকা পড়েছে বলে জানিয়েছিলেন। এর পর থেকে আর যোগাযোগ হয়নি।
একইভাবে দুই বছর আগে অপহরণেরর শিকার হয় টেকনাফ বাহারছরা উত্তর শিলখালী এলাকার দিনমজুর বদিউল আলমের ছেলে জয়নাল আবেদীন, নুরুল বশরের ছেলে জাহিদুল আমিন ও উখিয়ার রতœাপালং রুহুল্লারডেবা এলাকার আলী আকবরের ছেলে মীর আহমদ। তাদের হদিস না পেয়ে স্বজনদের মাঝে চলছে আর্তনাদ।
চকরিয়া উপজেলার চোঁয়ারফাঁড়ির ইদমনি নয়াপাড়া নামে একটি গ্রাম থেকে ২২ মাস আগে সাত যুবক মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়।  এখনো তাদের সন্ধান পায়নি স্বজনেরা। তারা হলো- ওই এলাকার ছরওয়ার কামালের ছেলে যুবক রফিকুল ইসলাম, আলী আকবরের ছেলে মিজানুর রহমান, ইউপি সদস্য আশরাফ হোসেনের ছেলে জাহেদুল ইসলাম, মনির আহমদের ছেলে জালাল উদ্দিন, মোহাম্মদ উল্লাহ’র ছেলে জমির উদ্দিন, মৃত আমীর হোসেনের ছেলে সাজু, কোরালখালী গ্রামের আসাদ উল্লাহর ছেলে হালিমুর রশিদ। তাদের সাথে একই ট্রলারে করে মালয়েশিয়া গেছেন পেকুয়া উপজেলার টৈইটং ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া গ্রামের জামাল হোসেনের ছেলে রাসেলও।
স্থানীয় দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে ২০১৩ সালের ২২ আগষ্ট তারা ঘর থেকে বের হয়। ট্রলারে ওঠার পর দালালের লোকজন তাদের পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আদায় করে। কিন্তু ট্রলারে থাকাবস্থায় কথা হলেও আজ পর্যন্ত জবান শুনেনি স্বজনেরা। পরিবার সদস্যদের আশঙ্কা, মালয়েশিয়ায় দালাল চক্রের লোকজন তাদেরকে হয়তো অন্যত্র পাচার করেছে, নতুবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে কৌশলে তুলে দিয়েছে।
মহেশখালীতে ৫ যুবক সাত মাস ধরে নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে। তারা হলো- মাতারবাড়ী ইউনিয়নের উত্তর সিকদার পাড়া গ্রামের পুতুন এর ছেলে মো: কাসেম, আব্দু রহিমের ছেলে মো: জোবাইর, মোক্তার আহমদের ছেলে সুমন, মনির উদ্দিনের ছেলে রাশেল ও নুরুল ইসলামের ছেলে আজিজুর রহমান। তাদের পরিবারের দাবী, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটকিয়ে মুক্তিপণ দাবী করা হয়েছিল। এখন আর খোঁজ নেই।
উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের তেলখোলা গ্রামের কেউচিমেংর ছেলে ছপাইংগ্যা, পাংচিমেংর ছেলে কিনডু চাকমা, চৈপুচিং চাকমার ছেলে হে কুমার ও মংচাইমেংর ছেলে মংতেছসহ ৫ জন কিশোর ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মনখালী পয়েন্টে পোনা ধরতে যায়। এসময় স্থানীয় পাচারকারীরা তাদের জোর করে নৌকায় তুলে দেয়।
বয়োবৃদ্ধ ছৈপুচিং চাকমা জানান, তারা বর্তমানে থাইল্যান্ডের পুলচোয়ান কারাগারে বন্দী আছে বলে জানতে পেরেছি। টাকার অভাবে খোঁজ নিতে পারছিনা। এ ব্যাপারে স্থানীয় এনজিও হেলপ্ এর কাছে আবেদন করেছি।
একই এনজিওতে অভিযোগ করতে আসা জালিয়াপালং ইউনিয়নের হাজেরা খাতুন জানান, তার ১৩ বছরের শিশু সন্তান এনামুল হককে অপহরণ করে মালয়েশিয়ায় পাচার করে দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলেও ছেলের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সুত্র মতে, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরের সংবাদে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে মালয়েশিয়া যাওয়া পরিবারের লোকজন। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠছে আকাশ বাতাস। নেই শান্তনার বাণী। দালালের কারণে ভেঙেছে অনেক সংসার।
এ দিকে মালয়েশিয়া পথে কি পরিমাণ লোক নিখোঁজ রয়েছে তার পরিসংখ্যান কোন বিভাগের হাতে নেই। তবে গত তিন বছরে জেলায় অন্তত ৫ হাজার লোক নিখোঁজ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন মানব পাচাররোধে মাঠ পর্যায়ে কমর্রত বেসরকারি সংস্থা ‘হেলপ কক্সবাজার’র এর নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম।
তিনি বলেন, নিখোঁজ লোকের সঠিক পরিসংখ্যান বের করা অসম্ভব। তবে এ সংক্রান্ত পাঁচ শতাধিক নিখোঁজ লোকের পরিবারের পক্ষে অভিযোগ জমা পড়েছে। এ বিষয়ে আইএমও, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরে জানানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, নিখোঁজ পরিবারের অভিযোগের সুত্র ধরে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি। এতে শুধু উখিয়া ও টেকনাফের উপকূল দিয়ে গত পাঁচ বছরে ৫০ হাজারের বেশী লোক পাচার হয়েছে। এরমধ্যে নিখোঁজ রয়েছে অন্তত সাড়ে তিন হাজার লোক।
পুলিশের তথ্য মতে, ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন পাশ হওয়ার পর থেকে ৩০৬ টি মানব পাচার মামলা হয়েছে। যার মধ্যে আসামী হয়েছে ১৫৩১ জন। এর মধ্যে আদালতে পৌঁছেছে ১৬৬ টি মামলা। আর ১৪০টি মামলা রয়েছে পুলিশের তদন্তে।
এ দিকে মানবপাচারে জড়িত ২৫০ দালালকে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। এ তালিকা ধরে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৮  দালাল মারা যায়। গ্রেফতার হয় শীর্ষস্থানীয় অনেক দালাল। তবে গা ঢাকা দিয়ে আছে মানবপাচারের রানী রেবি ম্যাডাম, দালাল একরাম, নুরুল কবির, রুস্তম, ছৈয়দসহ শীর্ষস্থানীয় অনেকেই। তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ বলেন, মানব পাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানব পাচার বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা জিরো টলারেন্স।
তিনি বলেন, মানব পাচার শুন্যের কোটায় নিয়ে আসতে সবকিছু করছে পুলিশ। অভিযুক্ত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত