টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

‘তিন লাখ টাকা দিলাম, তা-ও ছেলে দুইডারে পাইলাম না’

Malyesia Pic-
ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
‘তিন লাখ টাকা দিলাম, এক বছর পার হল। তা-ও ছেলে দুইডারে পাইলাম না।’ কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার তেলখোলা গ্রামের বাসিন্দা কৃষক পানচিমং চাকমা। এক বছর আগে তার দুই ছেলে ক্যউ চাকমা ও মংক্যউ চাকমা অপহরণের শিকার হয়।
কীভাবে দুই ছেলে অপহরণের শিকার হল আর কাদেরইবা টাকা দিলেন-জানতে চাইলে তিনি জানান, বড় ছেলে ক্যউ চাকমা মনখালী সাগরে পোনামাছ ধরতে যায়। সেখান থেকে মানবপাচারকারীরা তাকেসহ আরও পাঁচজনকে অপহরণ করে। ক্যউ চাকমাসহ অর্ধশত বাংলাদেশী ও দুই-আড়াইশ রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়ার জাহাজ তুলে দেয় দালালরা।
পানচিমং চাকমা বলেন, প্রায় দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ক্যউ চাকমা আমাকে ফোন দেয়। সে জানায়,  দালালরা তাকে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে রেখেছে। সাথে অরো লোক আছে। সবাইকে মারধর করছে। এক দালাল আমার সাথে ফোনে কথাও বলে। টাকা দাবী করে। হুমকি দিয়ে বলে, ছেলের জীবন চাইলে টাকা পাঠাও। টাকা দিলে সে বাঁচবে। তাকে মালয়েশিয়ায় ভাল কাজ পাইয়ে দেওয়া হবে। আর টাকা না দিলে তোমার ছেলে জীবন নিয়ে আর ফিরতে পারবে না।
দালালের কথামতো বিকাশের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা একটি নম্বরে পাঠায় পানচিমং চাকমা। টাকা যাক, ছেলে তো জীবন নিয়ে ফিরে আসুক! কিন্তু কথা রাখেনি দালাল। যে নম্বর দিয়ে দালাল ফোন দিয়েছিল তা-ও বন্ধ। আর বিকাশে টাকা পাঠানোর নম্বর ও তথ্য প্রমাণও রাখেনি তারা। দীর্ঘদিন ছেলের খোঁজ ছিল না। গত ১০-১৫ দিন আগে থাইল্যান্ডের ইমিগ্রেশনের বন্দীশিবির থেকে ফোন দেয় ক্যউ চাকমা। বলে, ‘খুব কষ্টে আছি। অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। আমাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কর বাবা।’ যোগ করেন পানচিমং চাকমা।
কিভাবে গেল থাই ইমিগ্রেশন বন্দীশিবিরে- জানতে চাইলে ছেলের বরাত দিয়ে পানচিমং চাকমা বলেন, ‘গত ১০-১৫ দিন আগে থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে তাদের নাকি মালয়েশিয়ায় নেওয়ার কথা বলে প্রায় এক হাজারজনকে একটি বড় জাহাজে তোলে। মাঝপথে খাবার ও পানি সঙ্কট নিয়ে মারামারি লাগে। এতে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মারা যান।’
ক্যউ চাকমা আরও জানিয়েছে, প্রচন্ড মারামারি ও খুনোখুনীর মধ্যে সে এবং অপর স্থানীয় তিন চাকমা ছেলে জাহাজের এক কোণায় আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে তারা দেখতে পায় কিছু জেলে মাছ ধরছে তাদের আশপাশে। এ সময় তারা লাফিয়ে একটু সাঁতার কেটে জেলেদের নৌকায় ওঠে। পরে থাইল্যান্ড কোস্টগার্ডের কাছে তারা আটক হয় এবং পরে ইমিগ্রেশন পুলিশের বন্দীশিবিরে নেওয়া হয় তাদের। এখন তারা সেখানেই আছে।
মেজো ছেলের বিষয়ে পানচিমং চাকমা বলেন, ‘সোনার মতন ছেলে আমার। স্থানীয় বাজারে দর্জির কাজ করত সে। টেকনাফে রাখাইনদের ধর্মীয় উৎসব পানিখেলা (এপ্রিলের মাঝামাঝিতে) দেখতে যায় বন্ধুদের নিয়ে। সেখান থেকে সমুদ্রপাড়ে গেলে মংকেওসহ অন্য তিন চাকমা বন্ধুকেও জিম্মি করে ছোট নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে রাখা জাহাজে তুলে দেয় দালালচক্র। বেশ কিছুদিন নিখোঁজ থাকার পর ২০-২২ দিন আগে ফোন দিয়ে মংকেও জানায় তারা থাইল্যান্ডের এক উপকূলে আছে। দালালরা তাদের জিম্মি করে রেখেছে।’
অপহৃত দুই ছেলের পিতা পানচিমং চাকমা বলেন, ‘বড় ছেলের মতো প্রায় একই কায়দায় মেজো ছেলের জন্যও দেড় লাখ টাকা দালালকে মুক্তিপণ দিয়েছি। দালাল বলেছিল, থাইল্যান্ড উপকূলে আছে। দু-এক দিনের মধ্যেই আমরা মালয়েশিয়ায় তাদের নিয়ে যাব। সেখানে ভাল বেতনে কাজ দেব। যদি টাকা না দাও তাহলে তোমার ছেলেকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে যাব।’
পানচিমং চাকমা বলেন, ‘টাকা দিলাম, কিন্তু ছেলে দুইডারে যে আর ফিরে পেলাম না। কয়েক দিন আগে মংকেও ফোন দিয়ে জানিয়েছে, সেসহ অনেকে এখন ইন্দোনেশিয়ার ইমিগ্রেশনে বন্দী আছে। মানবপাচার নিয়ে থাইল্যান্ডসহ আন্তর্জাতিকভাবে তৎপরতা শুরু হলে দালালরা দ্রুত থাই উপকূল ত্যাগ করে সাগরে জাহাজ ভাসিয়ে দেয়। এর পর ওই জাহাজ ইন্দোনেশিয়া উপকূলে পৌঁছলে পুলিশ সবাইকে আটক করে বন্দীশিবিরে নেয়।’
পানচিমং চাকমার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে আসেন অন্য আদিবাসীরাও। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানচিমং চাকমার মতো একই সঙ্গে দুই ছেলে অপহরণের শিকার না হলেও উখিয়া উপজেলার তেলকুনা গ্রামে মংচাঅং চাকমার ছেলে মনতাজ চাকমা (২৫), লইক্যা চাকমার ছেলে কেলাচিং চাকমা (৩৩), চৈমংছা চাকমার ছেলে ক্যউবুমং চাকমা (২৪), কেউচিমং চাকমার ছেলে চুপাইংগ্য চাকমা (২৫), মংফুচিং চাকমার ছেলে লোকচামং চাকমা (২৫), চৈপুছিং চাকমার ছেলে স্নেহ কুমার চাকমা (১৭) ছাড়াও অন্তত ২০-২৫ জন অপহরণের শিকার হয়ে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় বন্দী রয়েছেন। যাদের পরিবার দালালদের বড় অংকের টাকা দিলেও সন্তানরা বাবা-মার বুকে ফিরে আসেননি।
মংফুচিং চাকমার স্ত্রী এবং অপহৃত লোকচামং চাকমার মা চৈমাদি চাকমা ছেলের কথা বলতে গিয়ে মুষড়ে যান। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমার ছেলেডারে এনে দেন। থাইল্যান্ডের বন্দীশালায় ও খুব কষ্টে আছে।’ একই অবস্থা ভুক্তভোগী অন্য পরিবারগুলোরও। তারা সন্তানদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়ের সংসার পানচিমং চাকমার। বড় ছেলে ক্যউ চাকমা হালচাষ করতো। মেজো ছেলে মংকেও চাকমা স্থানীয় বাজারে দর্জির কাজ করে সহযোগিতা করছিলেন সংসার চালনায়। বাকি তিন ভাই-বোনের মধ্যে দু’জন স্থানীয় স্কুলে পড়ে। তারা চলছিল সুন্দরভাবে। কিন্তু মানবপাচারকারীরা লন্ডভন্ড করে দেয় পানচিমং চাকমার সাজানো সংসার। একেক করে তার জোয়ান দুই ছেলেকে অপহরণ করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে মানবপাচারকারীরা। পণ দেওয়া হলেও মুক্তি মেলেনি দুই ছেলের। বরং মুক্তিপণের টাকা পেয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে দালালচক্র। বর্তমানে বড় ছেলে এক বছরের বেশি সময় ধরে থাইল্যান্ডে আর মেজো ছেলে দুই মাস ধরে ইন্দোনেশিয়ার ইমিগ্রেশন জেলে বন্দীজীবন কাটাচ্ছেন।

মতামত