টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মাসে ধর্ষণের মামলা গড়ে ৩০০টি!

darsanচট্টগ্রাম, ০১ জুন (সিটিজি টাইমস) : সারাদেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও নারী আন্দোলনকারীরা।

পুলিশ সদর দফতর হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৬৪২টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারাদেশে ৭৯৭টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে।

এ তথ্য অনুসারে, প্রতিমাসে অন্তত ৩০০টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হচ্ছে। তবে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা মামলার চেয়ে দ্বিগুণ হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ মে পর্যন্ত সারা দেশে ২৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি মতে, ২০১০ সাল থেকেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৭৮৯, ২০১৩-তে ৭১৯, ২০১২-তে ৮৩৬, ২০১১-তে ৬০৩ এবং ২০১১-তে ৪১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

নারী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা মনে করেন, তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্ক নারীরাও ধর্ষণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অভিযুক্ত ধর্ষকদের বেশিরভাগ সময়েই কোনও শাস্তি হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তারা।

ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর মাত্র ২ শতাংশ ধর্ষণ মামলার বিচার হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করার পর খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়।

ঢাকার ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের গত ১৪ বছরের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, কমপক্ষে ৫ হাজার ৩২১ জন নারী এই সেন্টারে সহযোগিতা চেয়েছেন। যারা মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনায় মাত্র ৪৩ জন সাজা পেয়েছেন।

চলমান আইনের প্রয়োগে শিথিলতা, কার্যকর পুলিশি তদন্তে ব্যর্থতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্ব ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করে মহিলা আইনজীবী সমিতি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী জানান, সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের ফলেই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। নির্যাতিতাকে সুরক্ষার নীতি না থাকা এবং পুলিশি তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ। পুলিশ মামলা নিতে দেরি করায় ধর্ষকরা পালানোর সুযোগ পেয়ে যায় বলেও তিনি মনে করেন।

সালমা আলী বলেন, ‘এ সংক্রান্ত অনেক আইন রয়েছে। আমাদের তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা দরকার। এ অপরাধ সম্পর্কে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব।’ তিনি জানান, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে অনেক সময় মামলা শেষ হয়ে যায়।

সূত্রাপুর থানায় দায়ের করার মামলা অনুসারে, ১৯ মার্চ রাজধানীর ধোলাইপাড় এলাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয়ে দলের দুই কর্মী এক তরুণীকে ধর্ষণ করে। পুলিশ আওয়ামী লীগের দুই কর্মীকে গ্রেফতারও করে। কিন্তু নির্যাতিতা মামলা চালিয়ে না চাওয়ায় মামলাটি বাতিল হয়ে যায়। গ্রেফতার হওয়া দুই অভিযুক্ত ছাড়া পেয়ে যান।

নারী আন্দোলনের এই কর্মী মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক চাপ ও সমাজে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কার ফলে ইতোমধ্যেই বিচারের জন্য লড়াই করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছেন নারীরা। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েও কিছু করে না বলেও তিনি দাবি করেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান ধর্ষণের মামলা তদন্তে পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সারাদেশে সব থানায় ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের সহযোগিতা দিতে, পর্যাপ্ত মনোযোগ ও সেবা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ ২০১৩ সালে ২ হাজার ৯২১ এবং ২০১৪ সালে ২ হাজার ৯১৮টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলেও এখন পর্যন্ত এসব মামলার একটিরও বিচার হয়নি। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৩৭ ও ১ হাজার ৫৬৪টি। মজার ব্যাপার হলো দাখিল করা অভিযোগপত্র গুলো ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালের নয়, তার আগের বছরের।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগের বছরের মামলার তদন্ত কাজ ঝুলে থাকায় প্রতিবছরের অভিযোগপত্র সময়মত দাখিল করা কঠিন হয়ে পড়ে।

২০১৪ সালের শেষ দিকে ১ হাজার ২৮০টি ধর্ষণ মামলার তদন্ত চলছিল এবং ১৮ হাজার ৬৬২টি মামলা বিচারাধীন ছিল। তার আগের বছরের শেষ দিকে ৯৮০টি মামলার তদন্ত চলছিল এবং বিচারাধীন ছিল ১৭ হাজার ৪১৪টি।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বেশিরভাগ ঘটনায় ধর্ষকদের শাস্তি না হওয়াতে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাহফুজা খানম জানান, আইনের ফাঁক গলে ধর্ষকরা জামিন পেয়ে বাইরে এসে ফের ধর্ষণ করছে। এটা একটা চক্রে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যদি যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ না হয় এবং বিচার নিশ্চিত করা না যায় তাহলে ধর্ষণের মতো অপরাধ একের পর এক ঘটতেই থাকবে।’

ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির ফলে নারীর প্রতি সামাজিক মনোভাবও বোঝা যায় বলেও তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান জানান, নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণেও যৌন সহিংসতার ঘটনার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। শৈশব থেকেই ছেলেরা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। নারীকে সম্মান করার বিষয়ে তারা খুব কম শেখার সুযোগ পায়। যৌন শিক্ষা নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তারাও পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেও ধর্ষণ বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।

পুলিশ সদর দফতরের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন) আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘ধর্ষণ মামলাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যদি কোনও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নেব।’-বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত