টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকটে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা

bandarচট্টগ্রাম, ২৮ মে (সিটিজি টাইমস) ::  চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকটে বহির্নোঙ্গরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এতে জাহাজের অপেক্ষমাণ কাল বাড়ছে। সময়মতো ফিরে যেতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসব জাহাজের কোম্পানিও। এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বন্দরের বহির্নোঙরে এ মুহূর্তে ১৯টি জাহাজ কমপক্ষে আট লাখ টন পণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। সেই সাথে প্রতিটি জাহাজকে দৈনিক কমপক্ষে ১০ হাজার ডলার করে ডেমারেজ গুণতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ঘাটে ঘাটে আমদানিকারকদের পণ্য বোঝাই ৫৫৭টি লাইটার জাহাজ রয়েছে। যেগুলোকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে আমদানিকারকরা। আর এতেই সংকট তৈরি হয়েছে লাইটারেজের।

সূত্র জানায়, বন্দরে প্রতিদিন ৪০টি লাইটারেজ জাহাজের চাহিদার বিপরীতে গড়ে ২৫টির বেশি সরবরাহ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর জেরে বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাস বিলম্বিত হচ্ছে। সাধারণত পাঁচ দিনে মাল খালাস করে যে (মাদার ভেসেল) জাহাজের নোঙ্গর তোলার কথা সেটি ১৫ দিনেও ফিরে যেতে পারছে না।

কয়েকজন আমদানিকারক জানান, মাসাধিককাল ধরে বন্দরে লাইটার জাহাজের সংকট বিরাজ করছে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) নামক যে সংস্থাটি লাইটার বরাদ্দ দেয় তারা প্রয়োজন অনুসারে জাহাজ সরবরাহ দিতে পারছে না। ফলে কোনো মাদার ভেসেল থেকে সময়মতো পণ্য খালাস করা যায়নি। এর ফলে বিশাল অংকের ডেমারেজ গুণতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

অথচ কিছুদিন আগেও লাইটার মালিকরা হৈ চৈ করেন যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা নিজস্ব ব্যবস্থায় লাইটারিং করায় তাদের জাহাজসমূহ অলস বসে আছে। কিন্তু এখন বাস্তব অবস্থা হলো যে আমদানিকারকদের প্রয়োজন অনুসারে তারা লাইটার জাহাজ সরবরাহে শোচনীয় ব্যর্থ হচ্ছে।

আর তাতে শিল্প-কারখানার কাঁচামাল এবং বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী খালাসে এক প্রকার অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বহির্নোঙ্গরে ১৯টি জাহাজ পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এগুলোতে রয়েছে অপরিশোধিত চিনি, গম, ক্লিংকার, লবণ, কয়লা, স্ল্যাগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশ কার্গো ভেলেস ওনার্স এসোসিয়েশন (বিসিভোয়া) র সিনিয়রসহ সভাপতি মোহাম্মদ খুরশিদ আলম এবং চট্টগ্রাম বন্দর লাইটারেজ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হাজি সফিক আহমদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা স্বীকার করেন যে বন্দরে লাইটার জাহাজের সংকট রয়েছে। তবে তা সাময়িক এবং আমদানিকারকরাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

তারা জানান, আমদানি পণ্যভর্তি সাড়ে পাঁচশ জাহাজ একযোগে আটকে রয়েছে বিভিন্ন ঘাটে। আমদানিকারকরা এসব জাহাজ থেকে মাল খালাস করছেন না বা ধীরগতিতে করছেন। তারা গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছেন লাইটার জাহাজকে। পণ্যের এজেন্টদের দফায় দফায় পত্র দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে জাহাজ খালি করার জন্য। কিন্তু আমাদের অনুরোধকে তারা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কোনো কোনো জাহাজ ৪০দিন, আবার কোনো কোনো জাহাজ ৭০ দিন পর্যন্ত আটকে রয়েছে। এতে লাইটার জাহাজের হাহাকার চলছে। প্রতিটি জাহাজ মালিকও বিপুল আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে। অতিরিক্ত সময় অবস্থানের জন্য ডেমারেজ দেয়া হয়, কিন্তু তা তো আর ফ্রেইট নয়।

বিসিভোয়ার যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম জানান, ২০ লাখ টন কয়লা একযোগে আমদানি হওয়া এবং তা মজুদের জন্য ইয়ার্ড না থাকায় সংকট হয়েছে। কারণ আমদানিকারকদের নিজস্ব ইয়ার্ড নেই। তারা আমাদের জাহাজে কয়লা রেখে বিক্রি করছে। তাতে আটকে রয়েছে ১০৮টি লাইটার। কতিপয় প্রতিষ্ঠান তাদের মজুদ ক্ষমতার অতিরিক্ত গম আমদানি করেছেন। তারাও জাহাজ আটকে রেখেছেন। ১৪৩টি জাহাজ গমের বোঝাই নিয়ে ভাসছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গ্রিক পতাকাবাহী কমন স্প্রিট জাহাজটি গত ১০ মে ৩৫ হাজার টন কয়লার বোঝাই নিয়ে বহির্নোঙ্গরে পৌঁছে। স্থানীয় এজেন্ট সীকম শিপিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক জানান, নিয়মমাফিক লাইটারিং হলে এই কয়লা খালাস সম্পন্ন হওয়ার কথা চার দিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো দুই সপ্তাহ পরেও হয়নি।

ডব্লিউটিসি চাহিদা অনুসারে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিতে পারছে না। অপর একটি জাহাজ ৩১ হাজার টন গম নিয়ে এসেছে গত ১৪ মে। পাঁচ দিন থেকে ছয় দিনে এই পরিমাণ গম বহির্নোঙ্গরে লাইটারিং হয়। কিন্তু ১০ দিনে হয়েছে ১৮ হাজার টন। গম বোঝাই এই জাহাজ বা কয়লা বোঝাই গ্রিক পতাকাবাহী জাহাজটি কেবল নয়, গত দেড় দুমাস ধরে সব জাহাজের পণ্য লাইটারিংয়ে একই পরিস্থিতি হচ্ছে।

ডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, সিটি গ্রুপ, এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপের ঘাটে পণ্যভর্তি লাইটার জাহাজ আটকে রয়েছে। রূপসী, স্ক্যান, এস আলম ঘাট, বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াপাড়া, নগরবাড়ি, মিরপুর, আলীগঞ্জ, শাহ সিমেন্ট, আকিজ এবং হোলসিম ঘাটে ৫২১টি লাইটার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পণ্য খালাস হচ্ছে ৫০টি থেকে। ৪০৯টি নোঙ্গর করে আছে। এগুলোর পণ্য খালাস হচ্ছে না।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৪৮টি জাহাজ রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পণ্যের এজেন্ট মেরিন এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে। চিনি, গম, ভুট্টা, সয়াবীজ, কয়লা, ক্লিংকার ইত্যাদি নিয়ে ২১৭টি জাহাজ পড়ে আছে। কখন এসব পণ্য খালাস হবে এবং জাহাজগুলো নিয়মিত বহরে এসে যোগ দিতে পারবে তা অনিশ্চিত।

প্রসঙ্গত, প্রায় ২০ লাখ টন কয়লা আমদানি হওয়া, গম আমদানি বেড়ে যাওয়া, আমদানিকারকদের ঘাটে ঘাটে পণ্যবোঝাই জাহাজ আটকে থাকা, এর উপর বর্তমানে সমুদ্র উত্তাল থাকায় অনেক জাহাজের বে-ক্রসিংয়ের অনুমতি না থাকায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

মতামত