টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কক্সবাজারেই নিখোঁজ শত শত, মাতম

manbচট্টগ্রাম, ২৩ মে (সিটিজি টাইমস) : সাগরপথে অবৈধভাবে স্বপ্নের মালয়েশিয়া যাত্রা কারো কারো জন্য আর্শিবাদ হলেও বেশির ভাগ মানুষের জীবনে এই যাত্রা বয়ে নিয়ে এসেছে অভিশাপ কিংবা করুণ পরিণতি। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে গণকবরের সন্ধান লাভ, থাইল্যান্ড উপকূল থেকে হাজার হাজার অভিবাসী বোঝাই ট্রলার ফের গভীর সমুদ্রে ফিরিয়ে দেয়ার মধ্যে দিয়েই সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির দৃশ্য ফুটে উঠেছে। অল্প খরচে আবার অনেকটা বিনা খরচে সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে কিংবা দালাল চক্রের খপ্পরে যেসব যুবক সাগরপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল তাদের অধিকাংশর’ই খোঁজ নেই।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস প্রিয়জনের মুখ দেখার অধির আগ্রহে এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিখোঁজ হওয়ার মানুষের স্বজনেরা। জেলার বিশেষ করে খুরুস্কুল, চকরিয়া, রামু, উখিয়া, মহেশখালী, টেকনাফসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে এখনও পর্যন্ত খোঁজ মিলেনি শত শত যুবকের। তারা কি এখনও বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন তাও জানেন না কেউই। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে কারো স্বামী, কারো সন্তান, কারো বাবা কিংবা কারো নিকটাত্মীয়ের কোনো সংবাদ না পেয়ে তাদের মাঝে এখন শুধু বিরাজ করছে উদ্বেগ আর উকন্ঠা। অনেকে আবার প্রিয়জনের সন্ধান চেয়ে কেঁদে চোখ ভাসিয়ে দিচ্ছেন।

এমনই এক দৃশ্য দেখা গেল কক্সবাজার সদরের খুরুস্কুল ফকিরপাড়ায় মালয়েশিয়ায় যেতে গিয়ে ছয় মাস ধরে নিখোঁজ ইসমাইল হোসেনের পরিবারে গিয়ে। ইসমাইলের স্ত্রী তাহেরা বলেন-দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে তার স্বামী আটক হন থাইল্যান্ডের কারাগারে। সেখান থেকে মুক্ত করার জন্য খুরুস্কুল তেতৈয়ার মামুন নামের এক দালাল বিকাশের মাধ্যমে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আদায় করে। পরে আরো ৮০ হাজার টাকা দাবি করে। তাহেরা টাকা দিতে না পারায় তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে বলে দালালেরা শাসিয়ে দেয়। বর্তমানে নিরুপায় হয়ে ক্ষুধার জ্বালা মিটাতে দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে পথে পথে ভিক্ষা করে দিন কাটাচ্ছেন।

মাতারবাড়ির নিখোঁজ ৫ যুবকের পরিবারে আহাজারি

দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী মাতারবাড়ির নিখোঁজ পাঁচ যুবকের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। দীর্ঘ সাত মাস ধরে আপনজনের কোনো খোঁজ না পেয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর মাতারবাড়ির উত্তর সিকদার পাড়ার মৃত দৌলত মিয়ার পুত্র নুরুল আলম প্রকাশ লেডুর নিয়োগকৃত দালালের মাধ্যমে অল্প টাকায় মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলে ওই পাঁচ যুবককে নিয়ে যায়। নিখোঁজ যুবকেরা হলেন-মাতারবাড়ির উত্তর সিকদার পাড়ার মোহাম্মদ পুতুনের পুত্র কাসেম, একই এলাকার আব্দু রহিমের পুত্র জোবাইর (২১), মোক্তার আহমদের পুত্র সুমন (২৫), মনির উদ্দিনের পুত্র রাশেল (২০) ও নুরুল ইসলামের পুত্র আজিজুর রহমান (২৮)। পরে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় এখনো পর্যন্ত কোনো খোঁজ মিলেনি ওই যুবকদের। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের গণকবরের সন্ধান লাভের পর থেকে মাতারবাড়ির ওই পাঁচ যুবককে থ্যাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটক করে রাখা হয়েছে বলে তাদের পরিবারের দাবি।

মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

খোঁজ নেই চকরিয়ার ২২ যুবকের

সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া চকরিয়ার ২২ যুবকের খোঁজ মিলেনি আদৌ। ফলে নিখোঁজদের পরিবারে এখন শুধুই আহাজারি।

জানা গেছে, সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন চকরিয়া কোনাখালীর মৌলভীপাড়ার আব্বাস আহমদের ছেলে মিজবাহ উদ্দিন (২১), ঈদমণি উত্তরপাড়ার জয়নাল আবেদিনের পুত্র আবদুল হামিদ (১৮), নুরুল আলমের পুত্র মোহাম্মদ মানিক (২০), আবদুল বাসুর পুত্র ভুট্টো (২৮), নুরুল আলমের পুত্র হাবিব উল্লাহ (১৮), সিরাজ উদ্দিনের পুত্র জসিম উদ্দিন (৩২), জহির আহমদের পুত্র জিয়াবুল হক (২৮) ও তার ভাই আবদু শুক্কুর (১৯), আবদুল গণির পুত্র শাহ আলম (৩০), বজল করিমের পুত্র আবুল কালাম (৪০), আলি আহমদের পুত্র মিজানুর রহমান (২০), আশেক মেম্বারের পুত্র জাহেদুল ইসলাম (২২), মৃত আমির হোসেনের পুত্র সাজ্জাদ (২৫), মনু ড্রাইভারের পুত্র কামাল হোসেন (২৮), সরওয়ার আলমের পুত্র রফিক উদ্দিন (২০), দেলোয়ার হোসেনের পুত্র মীরহান (৩০), ছৈনাম্মার ঘোনার জাফর আলমের পুত্র নাজেম উদ্দিন (২২), কৈয়াবিলের নুরুল আমিন (১৮), ইসলামনগরের আবদুচ ছালামের পুত্র জসিম উদ্দিন (১৮), মোক্তার আহমদের পুত্র মনির আহমদ (২১), আনোয়ার হোছাইনের পুত্র মোবারক (২০) ও বাহাদুরের পুত্র ছুট্টো (১৯)।

মানবপাচারে ২৯৭ জনের সিন্ডিকেট

পুলিশ হেডকোয়াটারের তদন্ত প্রতিবেদনে মানবপাচারের সাথে ২৯৭ জন পাচারকারী জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন আর্ন্তজাতিক চক্রের, ২৬ জন দেশীয় হুন্ডি ব্যবসায়ী ও ইয়াবা পাচারকারী। আর ২৬০ জন দেশের আনাচে কানাচে থাকা পাচারকারী চক্রের সংঘবদ্ধ সদস্য। এছাড়া কক্সবাজার জেলা পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও একটি তালিকা তৈরি করেছে। এতে রয়েছে কক্সবাজার জেলার সাড়ে তিন শতাধিক পাচারকারীর নাম। দুটি তালিকাতেই রয়েছে মানবপাচারের সাথে জড়িত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ অনেক রাঘব বোয়ালদের নাম। উভয় তালিকায় রয়েছে উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ভাই মুজিবুর, শফিক, ফয়সাল ও সাংসদের আত্মীয়-স্বজন ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম। রয়েছে জেলার অনেক রতি মহারথির নাম। তবে এ পর্যন্ত এদের কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে পুলিশ হেডকোয়াটারের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য মতে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রকে অর্থায়নে রয়েছে ২৬ জন। যার ২২ জনই টেকনাফের বাসিন্দা। এতে রয়েছে উখিয়া-টেকনাফের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নিকটজনেরাও। তারা হলেন, টেকনাফের চৌধুরীপাড়ার অং শ্যাং থা’র ছেলে মং মং সেন, টেকনাফের ডেইলপাড়ার কালো মো. আলীর তিন ছেলে নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আমিন, আবদুল আমিন, লামারবাজার এলাকার হুন্ডি আবদুল জলিল, তার ছেলে মো. ইসমাইল, বাজারপাড়ার হাজি আলী হোসেনের ছেলে বাট্টা আয়ুব ও মো, ইউনুচ, টেকনাফের জালিয়াপাড়ায় জাফর আলম ওরফে টিপি জাফর, একই এলাকার শাহজাহানের ছেলে জাফর সাদেক, শাহপরীর দ্বীপের মৃত আবু শামা প্রকাশ বাড়– হাজির ছেলে হেলাল উদ্দিন, ইমাম শরীফের ছেলে ফাইসাল, রহিম উল্লাহর ছেলে আবদুল্লাহ, মৃত নবী হোসেনের ছেলে মো. জামাল, সাবরাংয়ের আছারবনিয়ার মৃত হাকিম আলীর ছেলে মো. হারুল, সাবরাংয়ের সিকদারপাড়ার মুচা আলীর ছেলে আবদুস শুক্কুর, টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরী পাড়ার মো. ইসমাইলের ছেলে ও এমপি বদির ভাই মুজিবের সহযোগী মো, ইসলাম, টেকনাফ বাস স্টেশনের মুদির দোকানদার হামিদ হোসেন, সাবরাংয়ের আচারবনিয়া এলাকার বো আলীর ছেলে মুফিজুর রহমান, টেকনাফের আল জামিয়া মাদ্রাসার সামনের ফার্মেসির আবু বক্কর, নাইট্যংপাড়ার ফজল আহমদের ছেলে আবু বক্কর, টেকনাফের কুলাল পাড়ার শামসুল হুদার ছেলে নুরুল আবসার।

টেকনাফের পুলিশের এক সোর্স জানান, তালিকায় থাকা টেকনাফে শীর্ষ মানবপাচারকারীরা এলাকাতেই রয়েছেন।

মতামত