টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ভূমিকম্প: কতটা ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

vomiচট্টগ্রাম, ১৬ মে (সিটিজি টাইমস) ::ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সম্প্রতি নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃদু ভূকম্পনে শঙ্কিত চট্টগ্রামের অধিবাসী ও বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ কারণে যে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ বর্ডারের যে তিনটি ফল্ট লাইন আছে সেখান থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব খুবই কম। যেখানে ৮.৫ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হলে মারাত্মক ক্ষতি হবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসসহ কয়েক লাখ লোকের প্রাণহানির আশঙ্কা আছে।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, চট্টগ্রামের অনেক সরকারি স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু বিল্ডিং ভূমিকম্প সহনশীলভাবে তৈরি করা হয়নি। অনেক ভবন-জলাশয় ও পুকুর ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। অনেক ভবনেরই মাটির গুণাগুণ সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তাছাড়া বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) নীতিমালা থাকলেও চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড না মেনেই তৈরি করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামে যদি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি একটি গবেষণা জরিপে দেখা গেছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের ফল্ট জোনে ৮.৫ মাত্রার ভূকম্পন হলে চট্টগ্রামের ১ লাখ ৭০ হাজার ভবনের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ভবনই ধ্বংস হয়ে যাবে। জরিপে আরো দেখা গেছে, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১ হাজার ৩৩টি বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে ৭৪১টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে ভূকম্পন হয় তাহলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মারা যাবে। ২৭টি হাসপাতাল ও ১৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, একটিতেও ভূমিকম্প প্রতিরোধক কোনো ব্যবস্থা নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম এই সময়কে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর, তেল শোধনাগার কেন্দ্র, ইস্টার্ন রিফাইনারী, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ চট্টগ্রামের প্রায় দেড় লাখ স্থাপনা ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন বন্ধ করার পদ্ধতি থাকলেও আমাদের দেশে তা নেই। ভূমিকম্পের কারণে বৈদ্যুতিক ও গ্যাস লাইন ভেঙে পড়লে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুন লেগে যেতে পারে। দেশের অন্যতম তেল শোধনাগার কেন্দ্র ইস্টার্ন রিফাইনারী যেটি চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে অবস্থিত সেখানে ভূমিকম্প হলে ট্যাংক ফেটে আগুন ধরে এটিসহ পুরো চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যেহেতু আমাদের দেশে বিকল্প কোনো বন্দর নেই, তাই চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস হলে দেশের অর্থনীতিরও মারাত্মক ক্ষতি হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারকে চট্টগ্রাম নগরীতে ভূমিকম্প সহনীয় নয় এমন ভবনগুলোর শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য প্রকল্প হাতে নিতে হবে। যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো অতিসত্বর পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ভূমিকম্প সহনীয় নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকার কম সুদে আবাসন লোন দিতে পারে।’

এদিকে ভূমিকম্পে সৃষ্ট ভয়াবহতা থেকে চট্টগ্রাম নগরীকে রক্ষার জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, সিডিএ’র খামখেয়ালিপনার কারণে চট্টগ্রাম নগরে অপরিকল্পিতভাবে ভূমিকম্প সহনশীল উপযোগিতা ছাড়াই বহুতল ভবন গড়ে ওঠছে। তাছাড়া নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট তৈরি হওয়ায় যেকোনো দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কাজও অত্যন্ত দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ হবে। ভূমিকম্পের ফলে দুর্যোগের সময় শহরের সরু রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে আশপাশের আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

তারা আরো বলেন, চট্টগ্রামে দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নেই। যে জনবল রয়েছে তারাও তেমন প্রশিক্ষিত নয়। ফলে অতীতেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় হিমশিম খেতে হয়েছে। তাই এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে সরকারকে এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করার দাবি জানান তারা। না হলে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত