টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

১১৬ মালয়েশিয়াগামী হস্তান্তর: জবানবন্দিতে ওঠে আসে দুঃসহ যাতণার কথা

Teknaf pic 13.05.2015 (ml)-1ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার ১১৬ মালয়েশিয়াগামী জবানবন্দি শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা জবানবন্দি দেন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহিউদ্দিন মুরাদ, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাদুদ্দজ্জামান ও অরুণ পাল এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শফিউদ্দিন। এর পর থেকে তাদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়।

এদের মধ্যে ৭০ জনকে স্বজনের কাছে বাকীদের নিজ জিম্মায় দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের বাইরের জেলার বাসিন্দাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পুলিশ সহায়তা করেছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ।

এর আগে দুপুরের দিকে ১১৬ যাত্রীকে টেকনাফ থানা থেকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এরা সকলেই কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, ব্রাম্মনবাড়িয়া, নারায়নগঞ্জ, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, পাবনা, যশোর ও ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। আদালতে আনার পরে এদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এসময় তাদের অনেকেই ভালকরে নড়াচড়াও করতে পারেনি। এ সময় চারজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের তাৎক্ষণিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সুস্থ্য হয়ে সকলেই বাড়ী ফিরেছেন।

আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে তারা দালালদের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। এ সময় তাদের মুখে ওঠে আসে ১১৬ বাংলাদেশীর মরণযাত্রার করুণ কাহিনী। অকপটে বর্ণনা দিতে থাকে তাদের দুঃসহ কাহিনী। এ দিকে এ ঘটনায় জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট থানা সুত্রে জানা গেছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা রিপন বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধু মিলন খন্দকার একই বোটে ছিলাম। আমাদের এলাকার দালাল জাকির টেকাফের সাবরাং এলাকায় এনে ৪০ হাজার টাকায় আমাদের বিক্রি করে দেয়। আমরা আসতে চাইছিলাম না। জোর করে আনা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মাঝ সাগরে জীবন ঝুঁকি নিয়ে আমি একাই ট্রলার চালিয়ে কূলে নিয়ে আসি। এতে কোস্টগার্ডের কোন ভূমিকা নেই। বরং কোস্টগার্ড আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। মিয়ামনারের বাহিনীর গুলি উপেক্ষা করে আমরা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে ঢুবে পড়ি। এরপর বাহবাহ নেয়ার জন্য কোস্টগার্ড যায়।’ রিপন পেশাগত ৫ বছর মেরিন বিভাগে কাজ করেছেন বলে জানায়।

এ সময় কথা হয় ফিরোজপুর থেকে আসা মু. হাসিবুর রহমান নামে উদ্ধার হওয়া আরেক যাত্রীর। তিনি বলেন, ‘রিপনই নায়ক। তার কারণে আমরা প্রাণে বাঁচি। রিপন না থাকলে ১১৬ জনকেই হয়তোবা সাগরে ডুবে মরতে হতো। অথচ বাহবাহ নিচ্ছে কোস্টগার্ড।’

বগুড়া থেকে আসা আব্দুল খালেক নামে অপর যাত্রী জানান, ‘আমারে বোটে ৫৬ জন ছিলাম। মাঝি না থাকয় আামাদের বোট সাগরে ভাসছিল। কিছু দূর আসতে চায়লেও চালখের অভাবে পারছিনা। এ সময় একজন ডাক দিয়ে বলে, ‘সব বাংলাদেশী আমার বোটে ওঠে পড়ো।’ বাঁচতে চায়লে তাড়াতাড়ি আসো। তখন আমরা লাফালাফি করে ওই বোটে ওঠে পড়ি। এর পর কূলে পৌঁছি। পরে জানতে পারি ওই লোকটির নাম রিপন। কোস্টগার্ড আমাদের একবেলা খাবারও দেয়নি। বরং আমাদের সাথে অমানবিক আচরণ করেছে।’

এসব মালয়েশিয়াগামী যাত্রী ১২ মে মঙ্গলবার বিকাল ৪ টায় সেন্টমার্টিন থেকে পূর্ব-দক্ষিনের গভীর বঙ্গোপসাগরে আটকে পড়ে। ১৩ মে বুধবার সকাল ৭ টায় তাদেকে টেকনাফ উপকূলে নিয়ে আসে কোস্টগার্ড। এ ঘটনায় ৪০ দালালের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করেছে কোস্টগার্ড। ১৩ মে রাতে কোস্টগার্ড সেন্টমার্টিন স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ফিরুজ আহমদ বাদী হয়ে এ মামলাটি করেন। মামলা(নং-৩২/৩৩৯)।

এ দিকে মৃত্যুকূল থেকে জীবন ফিরে পাওয়া ১১৬ যাত্রীর সবাই সংবাদকর্মীদের কাছে তাদের কৃতজ্ঞতার কথা জানান। এ সময় অনেকেই নিজ এলাকায় পৌঁছে দালাল প্রতিরোধে শপথ করেন।

মতামত