টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অবাধে কাঠ পাচারের নিরাপদ রুট, মিরসরাই-ফটিকছড়ি, বারইয়ারহাট-রামগড় সড়ক!

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি

katচট্টগ্রাম, ১৩ মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :: মিরসরাই-ফটিকছড়ি ও বারইয়ারহাট-রামগড় সড়ক দিয়ে অবাধে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরকারী কাঠ। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতি রাতেই পাচার হয় এসব কাঠ। কাঠ পাচারে প্রতি রাতে অবৈধ লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ উঠেছে মাসোয়ারা পেয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকছে পুলিশ প্রশাসন।

মিরসরাই-ফটিকছড়ি ও বারইয়ারহাট-রামগড় সড়ক দিয়ে এসব কাঠ পাচার হয়। পুলিশ, বনবিভাগ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশে কাঠ পাচার হয় বলে জানান স্থানীয় সূত্রগুলো। পাচারের জন্য অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। গত এক দশকে চোরাই কাঠবোঝাই গাড়ি উল্টে অন্তত অর্ধশত নিরীহ লোক প্রাণ হারিয়েছে।

গত ৬ মে রাত ১২টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কের সোনাপাহাড় চৌধুরীহাট এলাকা থেকে পাচার কারার সময় ৪ লাখ টাকা মূল্যের কাঠ আটক করেছে হাইওয়ে পুলিশ।

জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ফরিদ উদ্দিন জানান, বুধবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বারইয়ারহাট থেকে অবৈধকাঠ নিয়ে দুটি ট্রাক (যার নং ফেনী ঢ ১১-৩৮৮,ফেনী ঢ ১১-৩৬৯) ধাওয়া করলে চৌধুরীহাট এলাকায় ট্রাক দুটি রেখে চালক-হেলপার পালিয়ে যায়। পরে কাঠবোঝায় ট্রাকদুটি উদ্ধার করে জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আটককৃত কাঠের পরিমান সাড়ে ৩শ ফিট। কাঠ আটকের ঘটনায় একটি মামলা (যার নং ৭/১৫) দায়ের করা হয়েছে। ১০ মে শেষ রাতে মিরসরাই-ফটিকছড়ি সড়ক দিয়ে পাচারের সময় কাঠসহ ৪টি ট্রাক আটক করে বনবিভাগ। কিন্তু এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কোন তথ্য দিতে রাজি হননি তারা।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন করেরহাট রেঞ্জের আওতায় করেরহাট বনবিট ও চেক স্টেশন, হিঙ্গুলী বনবিট, কয়লা বনবিট, হেঁয়াকো বনবিট, আঁধার মানিক বনবিট, বারৈয়াঢালা রেঞ্জের আওতায় খৈয়াছরা বনবিট, গোভনিয়া বনবিট, জোরারগঞ্জ বনবিট ফটিকছড়ি বনবিট, নারায়ণহাট রেঞ্জের আওতায় ধুরং বনবিট, নারায়ণহাট বনবিট, দাঁতমারা বনবিট এতদঞ্চলের বনজ সম্পদ উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রেঞ্জ ও বনবিটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতদঞ্চলের বনজ সম্পদ উন্নয়নের পরিবর্তে নিধনযজ্ঞ, সম্প্রসারণের পরিবর্তে সংকোচন এবং সংরক্ষণের পরিবর্তে নিধন মহোৎসবে নেমে পড়েছে এবং চেক স্টেশনগুলো পাহারাদারির পরিবর্তে কাঠ পাচারের মহোৎসবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এতে করে মিরসরাইয়ের বিশাল বনভূমি সম্পদ দিন দিন বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বনবিটগুলোর আওতাধীন এলাকায় সরকারি অর্থে ও প্রাকৃতিকভাবে সৃজনকৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে পাচারকারীরা দিনের বেলায় সেগুন, চাপালিশ, গামারি, কড়ই, গর্জন, হাইব্রিট, আকাশমণি, জামরুল, জামসহ নানা প্রজাতির ছোট-বড় গাছ কেটে সরকারি বাগান সংলগ্ন নিরাপদ জায়গায় স্তুপ করে রাখে। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব কাঠ গাড়ি ভর্তি করে রাতভর সড়ক পথেই বারইয়ারহাট, চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার ইটভাটা, জেলার বাইরের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ইটভাটাগুলোতে নির্বিঘেœ পাচার করা হয়। কাঠ পাচারকারীদের মধ্যে দ্বন্ধ সৃষ্টি হলে তখন কাঠভর্তি দুএকটি ট্রাক আটক করে বনবিভাগের কর্মকর্তারা। অনেকটা বনবিট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রক্ষকের পরিবর্তে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। শুধু এতেই শেষ নয় বন বিভাগের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি কোনোভাবে খবর পেয়ে বিশেষ অভিযানে নামে তখন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গাছ পাচারকারীদের কাছে দ্রুত খবর পৌঁছে দেয়। এতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অভিযান নিষ্ফল হয়। রাত ১০টা পেরুলেই শুরু হয় পাচার মিশন। এরপর পথে পথে চলে চাঁদাবাজি। চাঁদা আদায়ে এলাকাভিত্তিক নিয়োজিত রয়েছে আদায়কারী সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমে গাছ গুলো গাড়ি ভর্তি হয় রামগড়ের নাকাপা, পাতাছড়া,কালাডেবা এলাকা থেকে। ট্রাক বা পিকআপক যোগে এসব গাছ নাকাপা থেকে গোয়াইয়া পাড়া গুজা রোড হয়ে ফকিরটিলা হয়ে আসে দাঁতমারা বাজারের দক্ষিন পার্শ্বে এমমদাদ মেম্বারের স’মিল,মিল্লাতের স’মিল এবং দাঁতমারা বাজারের উত্তর পার্শ্বে নুরুল আলমের স’ মিলে। এসব গাছের গাড়ি থেকে প্রতি গাড়ি নাকাপা বাজারে নাকাপা পুলিশ ফাঁড়ি নেয়-৫০০ টাকা,নাকাপা ইউনিয়ন পরিষদের নামে নেয়-৩০০ টাকা,জনৈক জাহাঙ্গীর নামের এক লোক এসব টাকা আদায় করে। নাকাপা থেকে এসব গাড়ি দাঁতমারা আসার পথে গুজাপাড়া চামনি ছড়া এলাকায় মানিকছড়ি থানা পুলিশের নামে ৩০০ টাকা, বাইন্নাঘর এলাকায় শান্তি বাহিনীর নামে(ইউপিডিএফ) ১২০০ টাকা, গোয়াইয়া পাড়া স্কুলের সামনে একটি বাঁশের ব্যারিকেড করা হয়েছে সেখানে স্থানীয় সরকার,রামগড় পুলিশ এর নামে আদায় হয় ১০০০ টাকা। (জনৈক সোহেল পিতা আবু তালেব ওরফে তেল তালেবের ছেলে এসব টাকা আদায় করে। )নিউ দাঁতমারা চা বাগানের পার্শ্বে চাপাতলি দোকানের সামনে রামগড়ের কালাডেবা এলাকা থেকে আগত গাড়ী থেকে প্রতি গাড়ী ২০০ টাকা আদায় করে( জনৈক আওয়ামীলীগ নেতা বাচ্চু ও তার লোকজন)। ফকির টিলা এলাকায় ছোট একটি ব্রিজের সামনে মোস্তফা ও তার লোকজন আদায় করে প্রতি গাড়ি ৫০/১০০ টাকা করে ।এর পর দাঁতমারা থেকে লোড হওয়ার পর প্রতিটি গাছের গাড়ি থেকে দাঁতমারা বিটের ক্যাশিয়ার আলমগীর নেয় ছোট গাড়ি ১০০০ আর বড় গাড়ি ২০০ টাকা। দাঁতমারা পুলিশ কনস্টেবল কচি আলী পুলিশের জন্য নেয় ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। এ ছাড়া দাঁতমারা,শান্তিরহাট,নারায়নহাট এলাকা থেকে লোড হওয়ার পর গাড়ি গুলো মূলত দুটি সড়ক দিয়ে মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট বাজারে চলে যায়। এ দুটি রোডের মধ্যে রয়েছে বারইয়ারহাট-রামগড় সড়ক আর অপরটি হচ্ছে নারায়নহাট থেকে পশ্চিমে শ্বেতছড়া হয়ে মিরসরাই-ফটিছড়ি সড়ক হয়ে বারইয়ারহাট।

নারায়নহাট থেকে শ্বেতছড়া হয়ে যে সব গাড়ি যায় সে গুলো থেকে ইদ্রিস, আলাউদ্দিন, আনোয়ার,আইয়ুব, মামুন নেয় প্রতি গাড়ি থেকে ভূজপুর থানার জন্য ১৫০০ টাকা, নারায়নহাট বিটের জন্য ১২০০ টাকা, বালুখালী বিটের জন্য ১২০০ টাকা, রাস্তার জন্য ২০০ টাকা। দাঁতমারা, নারায়নহাট, শ্বেতছড়া হয়ে বারইয়ারহাট যায় সে গুলো থেকে প্রতি ট্রাকে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ১৫০০, মিরসরাই পুলিশ ১০০০, গোভনিয়া বিটের কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ ৫০০, গোভনিয়া বিটের বিট কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ১০০০ টাকা নেয়। মিরসরাই পৌরসভার কয়েকজন সরকারী দলের নেতা এ লাইন নিয়ন্ত্রন করে।
এ বিষয়ে গোভনিয়া বিটের কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, আমাকে টাকা দেয়ার বিষয়টি সত্য নয়। আমাদের লোকবল খুবই কম। তারপরও আমরা কাঠ পাচার রোধে চেষ্টা করি। মাঝে-মধ্যে কাঠবোঝায় ট্রাক পার হয়ে গেলে তারপরে খবর পায়। তখন কিছুই করার থাকেনা।

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোহাম্মদ হেসাইন বলেন, এ বিষয়ে আমি কি বলবো। আমি কিছুই জানিনা। আপনার রেঞ্জের আওতাধীন এলাকা দিয়ে কাঠ পাচার হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ওইসব এলাকার আমার রেঞ্জের আওতায় নেই।

এ বিষয়ে জানতে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ এমকে ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি এ প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি।

জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী বলেন, কাঠ পাচারের বিষয়টি বনবিভাগের। এখানে আমাদের টাকা দেবে কেন? জোরারগঞ্জ থানায় কোন টাকা দেয়া হয়না।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, কাঠ পাচারের অভিযোগ পাওয়ার পর গত ১১ মে অভিযান চালিয়ে ৪ট্রাক কাঠ আটক করেছি। দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে স্থানীয় বনকর্মকর্তাদের কৈফিয়ত তলব করেছি। আমার বিশ্বাস এরপর থেকে আর কাঠ পাচার হবেনা। তারপরও যেহেতু সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগানও রয়েছে তাই একেবারে পাচার বন্ধ করা কঠিন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত