টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে পাড়াকেন্দ্র

dচট্টগ্রাম, ১০মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :: ছোট্ট হ্লা মং স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার। তার মতো অনেক পাহাড়ি শিশু এখন সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখে। আশা করে কিছু একটা করে দেখানোর। তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে বান্দরবানের পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা।আর তাদের এমন সুন্দর স্বপ্ন এবং উন্নত জীবনের দেখতে শেখাচ্ছে পাহাড়ে গড়ে ওঠা পাড়াকেন্দ্র।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে জীবনযাত্রা বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নে। পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছে এসব পাড়াকেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থা সহায়তা করছে এ কাজে । ইউনিসেফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউনিসেফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ৩ হাজার ৮০০ পাড়াকেন্দ্র পরিচালনা করছে। এর মধ্যে শুধু বান্দরবানেই পরিচালিত হচ্ছে ১ হাজার পাড়াকেন্দ্র।

বান্দরবানে প্রায় ১৩টি নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের প্রত্যেকের আছে নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষার এই পার্থক্যই তাদেরকে মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। ইউনিসেফের চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা কর্মকর্তা লাইলা ফারহানা বলেন, এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে পাড়াকেন্দ্রগুলোয় ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে বাংলা ভাষা ও নিজ নিজ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, পাড়াকেন্দ্রগুলোয় সব শিক্ষার উপকরণ ইউনিসেফ সরবরাহ করে। শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে খেলার উপকরণও রাখা হয়।

পাড়াকেন্দ্রের কার্যক্রম সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয়। প্রথমে জাতীয় সংগীত এবং কিছু সহজ শরীর চর্চা হয়। এরপর শুরু হয় পাঠদান। পাঠ্যক্রমে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিষয় নির্বাচন করা হয়ে থাকে। বর্ণমালা পরিচিতি ও লিখন, জীবজন্তুর নাম, ফুল-ফলের নাম, সহজ গণিত, ছড়া, গান এবং গল্প শেখানোর পাশাপাশি ছবি আঁকা এবং দলগতভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণাও দেওয়া হয়। পাড়াকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার আগে পাড়াকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে কর্মীর সহায়তার জন্য থাকে একটি সহায়ক গাইড।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক পাহাড়ের কোলে টংকাবতী ইউনিয়নের শান্ত সুন্দর গ্রাম এম্পুপাড়া। এই গ্রামের মোট ৪৪ পরিবারের শিক্ষাসেবা প্রদানের জন্য পরিচালিত হচ্ছে এম্পুপাড়া পাড়াকেন্দ্র। কেন্দ্রে মোট শিক্ষার্থী ১৭জন।

পাড়াকর্মী শংকুং ম্রো জানান, কিছু শিক্ষার্থী পরিবার ও নিজের ইচ্ছাতে কেন্দ্রে আসলেও বেশিরভাগ শিশুকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে, কখনও বা ঘুম থেকে তুলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে আসতে হয়। তার নিজের সন্তানের পড়াশোনারও হাতে খড়ি হয়েছে এই পাড়াকেন্দ্রে।

শংকুং ম্রোর মতে, এই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা স্বচ্ছল না হওয়ায় মা-বাবা দুজনকেই খুব ভোরে উঠে ছুটতে হয় জীবিকার সন্ধানে। আর তাই বাচ্চার পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ একটু কম। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ বাড়ছে। ২০০৯ সাল থেকে পাড়াকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু করে এ পর্যন্ত মোট ১৮জন শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছেন তিনি। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ভর্তি করেছেন ৩ জনকে।

বান্দরবান জেলা সদরের কাছেই আরেকটি কেন্দ্র রেইছা থলি পাড়াকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের চিত্র একটু ভিন্ন। পাড়াকর্মী নাইনু চিং মারমা বলেন, এখানে অভিভাবকরা নিজ দায়িত্বেই বাচ্চাদের নিয়ে আসেন। এমনকি অনেকেই কেন্দ্রের বারান্দায় অপেক্ষা করেন পাঠদান শেষ হওয়া পর্যন্ত।

প্রতি ৮টি পাড়াকেন্দ্রের জন্য একজন সিনিয়র পাড়াকর্মী থাকেন। তাদেরই একজন নিনিউ মারমা। তিনি বলেন, জেলা সদরের কাছে হওয়ায় এই পাড়াকেন্দ্রগুলোয় শিশু উপস্থিতির হার বেশি। রেইছা থলি পাড়াকেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৮০জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

শিশু ও নারী উন্নয়ন কার্যক্রম প্রকল্প, বান্দরবান উপজেলা প্রকল্প অফিসার আলু মং জানান, পাড়াকর্মীরা শুধু শিক্ষিকার দায়িত্বই পালন করেন না, কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলোয় পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কর্মীরা পরিবারগুলোর কাছে সচেতনতামূলক তথ্য ও জ্ঞান পৌঁছে দিয়ে থাকেন। কিছু কিছু পাড়াকেন্দ্র থেকে টিকাদান কর্মসূচিও পালন করা হয়।

এম্পুপাড়ার বাসিন্দা চিংলাউ খিয়া বলেন, পাড়াকর্মীরা তাদের খুবই কাছের। পরিবারের মানুষের মতো। যে কোনও সমস্যায় তারা প্রথমে পাড়াকর্মীদের সঙ্গেই আলোচনা করেন। কর্মীরাও নিজ উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সমস্যা মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং কার্যকর পরামর্শ দেন। তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং তাদের জীবন যাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে।

রেইছা থলি পাড়াকেন্দ্রের পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রেইছা থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক রতন কুমার দাশ পাড়াকেন্দ্রের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, তার স্কুলের প্রথম শ্রেণির ৫৬ শিক্ষার্থীর ৩৫ জনই পাড়াকেন্দ্র থেকে আসা। পড়াশোনা ও বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ এবং পারদর্শিতা খুবই সন্তোষজনক।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক মো. মিজানুল হক চৌধুরী বলেন, পার্বত্য এলাকার মানুষের সার্বিক উন্নতিতে সহায়তা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ সরকার ও জেলা প্রশাসন। অনগ্রসর পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার জন্যও কাজ করছে সরকার ও জেলা প্রশাসন।

তিনি জানান, তিনি নিজেও সময় পেলেই পরিদর্শন করেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন সব কার্যক্রম। তিনি পাড়াকেন্দ্রেরও প্রশংসা করেন।-বাংলা ট্রিবিউন

মতামত