টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

হালাল সনদ কতটা ‘হালাল’

Halal-islamicচট্টগ্রাম, ০৮ মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) : কোনো বিধি-বিধান ছাড়াই ‘হালাল সনদ’ দিচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। শুধু তাই নয়, হালাল সনদ দিতে কোনো ল্যাবরেটরি কিংবা বিশেষজ্ঞও নেই এ সংস্থাটির।

তাই প্রশ্ন উঠেছে— হালাল সনদ আসলে কতটা ‘হালাল’। যেনতেনভাবে দেওয়া এ সনদ বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মহাসচিব হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, ‘এভাবে কোনো ধরনের পরীক্ষাগার বা নিজস্ব অবকাঠামো ছাড়া হালাল সনদ দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করি না। এর মাধ্যমে ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া আইন বা নীতিমালা ছাড়া সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে, তাও আমাদের বোধগম্য নয়। এভাবে যেনতেনভাবে সনদ নিয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছাড়া ভোক্তাদের কোনো কল্যাণ হবে না।’

গত ২১ এপ্রিল সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে খসড়া ‘হালাল খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, প্রসাধন সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের সার্টিফিকেট নীতিমালা’ ও খসড়া ‘হালাল খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, প্রসাধন সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের সার্টিফিকেট আইন’ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মো. আমজাদ আলী কে বলেন, ‘এ সভায় স্বাস্থ্য, অর্থ, খাদ্য, কৃষি, শিল্প, মৎস্য ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ১০ মের মধ্যে খসড়া আইন ও নীতিমালার বিষয়ে মতামত দিতে বলা হয়েছে।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা হালাল সনদ দেওয়া এবং খসড়া আইন ও নীতিমালার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানান। তবে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

এই কর্মকর্তা বলেন, আইন ও নীতিমালার খসড়াটি প্রথম ২০১২ সালে প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ সময় আবারও স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিতে বলে ধর্ম মন্ত্রণালয়। গত বছর এটি আরেক দফা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর পর আবারও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করতে বলে মন্ত্রণালয়। এভাবে সভা করে করে তিন বছর চলে গেছে।

তিনি জানান, ব্যবসায়ীদের চাহিদা ও চাপের কারণে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরের সভায় হালাল সনদ সিদ্ধান্ত হয়। ধর্মমন্ত্রী হচ্ছেন বোর্ডের সভাপতি। এ ছাড়া কয়েকটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সনদ দেবে।

২০০৭ সালে পাবনার বেঙ্গল মিটকে প্রথম হালাল সনদ দেওয়া হয় জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে হালাল সনদ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিকে ৬ মাসের জন্য দেওয়া হলেও এখন এক বছরের জন্য হালাল সনদ দেওয়া হচ্ছে। এক বছর পর সনদ নবায়ন করা যায়।’

প্রথম দিকে দেশের বড় বড় ৪০ থেকে ৪২টি কোম্পানি আবেদন করেছিল। মাঝখানে সনদ দেওয়া বন্ধ ছিল। এ পর্যন্ত ব্র্যাক চিকেন, কাজী এ্যান্ড কাজী টি, আফতাব পোল্ট্রি, নেসলের ম্যাগি নুডলসসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে সনদ দেওয়া হয়েছে। এখনো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পণ্যের হালাল সনদ নেওয়ার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে হালাল সনদ দেওয়া খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মালিক বিক্রয় মূল্যের শতকরা ৮ পয়সা হারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দিচ্ছে।

সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, হালাল সনদের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশাসন বিভাগ। আবেদনের সময় ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সনদ, ভ্যাট বা ট্যাক্সের সনদ আমরা দিতে বলি। বিএসটিআই সনদ, কারখানার পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র, ফুড এ্যান্ড নিউট্রিশনের কাগজপত্রও নেওয়া হয়।

‘পরে প্রয়োজন অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন), মৎস্য অধিদফতর, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে সনদ দিয়ে থাকি’- যোগ করেন তিনি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার নেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন বিষয়ের দক্ষ লোকবলের সঙ্কট রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে হালাল সনদ দেওয়ার কাজ করছে। একটি আইন ও নীতিমালা করার জন্য গত ৩ বছর ধরে চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন তা চূড়ান্ত হওয়ার পথে, শিগগিরই মন্ত্রিসভা বৈঠকে উঠবে।’

‘খাদ্যের গুণগত মানের সনদ দেয় বিএসটিআই। বিএসটিআই ও পণ্যের অন্যান্য সংস্থার সনদ ও রিপোর্ট পর্যালোচনা করি, পণ্যের উপাদান দেখে হারাম-হালাল বিষয়গুলো দেখি, আমরা খাদ্যের গুণগত মান দেখি না’- বলেন মহাপরিচালক।

আইন-নীতিমালা ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন কীভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে- জানতে চাইলে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসান বলেন, ‘একটা আইনে সনদ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া আছে। আমরা এ বিষয়ে আইন ও নীতিমালা করার চেষ্টা করছি।’

কোন আইনে আছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। এটা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে জিজ্ঞাসা করুন। এত আইন আমার মনে থাকার কথা নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘খাদ্যের উপাদানের ওপরই হালাল-হারাম নির্ভর করে। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে এ বিষয়ে সনদ দেওয়া উচিত।’

খসড়া নীতিমালা ও আইনে যা আছে

নীতিমালা ও আইনের ভূমিকায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও বিশ্ববাজারে হালাল খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বহুজাতিক কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হালাল সনদ চেয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে আবেদন করেছে। হালাল সার্টিফিকেটের অভাবে বহু প্রতিষ্ঠান বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। হালাল সনদ দেওয়া চালু হলে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে। আলেম সমাজ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

‘হালাল খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, প্রসাধন সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের সার্টিফিকেট নীতিমালা’য় ইসলামী বিধান অনুযায়ী ‘হালাল’-‘হারাম’ এর বর্ণনা রয়েছে।

এ ছাড়া রয়েছে হালাল খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের উৎস, হালাল সনদ ও লোগো প্রাপ্তির আবেদন পদ্ধতি, গ্রহণযোগ্য দরখাস্তকারী, সার্টিফিকেট ফি, শিল্প এলাকা/কারখানা/কসাইখানা পরিদর্শন, পরিদর্শনের আওতা, কারখানা বা শিল্প এলাকায় যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

হালাল সনদ প্রদান প্রক্রিয়া, উৎপাদনকর্মীদের প্রতি আরোপযোগ্য বিষয়াদি, হালাল জবেহ পদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হ্যান্ডলিং, হালাল দ্রব্যাদি প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত উপকরণ, উপাদান বিশ্লেষণের বিষয়ে বলা হয়েছে নীতিমালায়।

খসড়ায় বলা হয়েছে, এক বছরের জন্য সার্টিফিকেট ফি নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রেও ছোট কারখানার জন্য ৫ হাজার টাকা, মধ্যম কারখানা ১০ হাজার টাকা ও বহুজাতিক কারখানার জন্য ২০ হাজার টাকা।

জবাইখানার ক্ষেত্রে ছোট জবাইখানার জন্য ৫ হাজার, মধ্যম জবাইখানার জন্য ১০ হাজার ও বড় জবাইখানার জন্য ২০ হাজার টাকা ফির কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ হোটেলের ক্ষেত্রে দেশী প্রতি ইউনিট এলাকার জন্য এক হাজার টাকা, আন্তর্জাতিক হোটেলের জন্য প্রতি ইউনিট রান্নার জন্য এক হাজার টাকা।

এ ছাড়া খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ফল, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য এবং অন্যান্য উপযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে লোগো ও সনদ প্রদান বাবদ কারখানা মূল্যের ওপর শতকরা ৮ পয়সা ফি নির্ধারণ করা হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরস সময় সময় এ ফির হার বৃদ্ধি করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।

খসড়া ‘হালাল খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, প্রসাধন সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের সার্টিফিকেট আইন’-এ নীতিমালার অনেকগুলো বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে।

এতে বলা হয়েছে, হালাল সনদ না নিয়ে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, প্রশাধন সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালস হালাল বলে বাজারজাত করলে দোষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্য প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে দু’জন বাংলাদেশী যোগ্য আলেমকে (ন্যূনতম ফাজিল বা দাওয়া পাস) নিয়োগ করতে হবে। বহুজাতিক ও মধ্যম মানের শিল্প কারখানায় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতের সময় কমপক্ষে একজন আলেমকে উপস্থিত থাকতে হবে।-দ্য রিপোর্ট

মতামত