টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মা-মেয়ে হত্যায় সন্দেহের তীর স্বামীর দিকে

ma-mayaচট্টগ্রাম, ০৭ মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) : চট্টগ্রামের সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়া এলাকার ছয়তলা ভবনের চারতলার ভাড়া ফ্ল্যাটে মা-মেয়েকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় পুলিশের সন্দেহের তীর গৃহকর্তা স্বামীর দিকে। স্বামী শহ আলম (৫০) পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তার মুরগী ও খাসির মাংসের দুটি দোকান রয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত রহস্য খুঁজে বের করতে পুলিশ শাহ আলম ও গৃহশিক্ষক আমিনুল ইসলাম রকিকে (২৪) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভির আরাফাত জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সকাল সাড়ে ১১টায় পুলিশ নিজ বাসার শয়নকক্ষ থেকে শাহ আলমের স্ত্রী নাসিমা আক্তার (৩০) ও মেয়ে রিয়া আক্তারের (৯) লাশ উদ্ধার করে।

এস এম তানভির আরাফাত আরও জানান, শয়নকক্ষ থেকে হত্যাকারীদের ব্যবহৃত দুটি মাস্ক ও ছুরি জব্দ করা হয়। ছুরিটি মাংস কাটার কাজে ব্যবহৃত। ছোরায় ছাগলের লোমও রয়েছে। আর ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে শাহ আলমের মাংসের দোকান।

এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে শাহ আলমের দেয়া তথ্যও সন্দেহজনক বলে জানান তানভির আরাফাত। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পরকিয়া সম্পর্কিত কারণে ক্রোধের বশেই মা-মেয়েকে নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

স্থানীয় লোকজন জানান, সকাল সোয়া নয়টার দিকে শাহ আলমের বড় দুই ছেলে রিয়াজ (১৪) ও হৃদয় (১২) স্কুলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। সাড়ে নয়টার দিকে গৃহকর্মী ঘরে ঢুকে মা-মেয়ের লাশ দেখে চিৎকার শুরু করলে লোকজন এগিয়ে আসে। স্থানীয়রা আরও জানান, শাহ আলমই প্রতিদিন দুই ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যায়। কিন্তু আজ তারা একা স্কুলে যায়।

ভবনের মালিক শমশের হোসেন জানান, প্রায় ৪ মাস আগে চারতলার মধ্যখানের ফ্লাটটি ভাড়া নেয় স্থানীয় মাংস বিক্রেতা শাহ আলম। তবে ফ্লাটে একাধিক ব্যক্তির যাতায়াত ছিলো। ঘটনা জানাজানি হওয়ার ৫ মিনিট আগেও ওই ভবন থেকে দুই তরুণকে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

তিনি জানান, শাহ আলমের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানার পূর্বধলা গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে সে স্থানীয় আবদুর রশিদের ভাড়া দোকানে মাংস বিক্রি করে আসছে।

শাহ আলমের বিলাপ: ঘটনার পর পুলিশ ও সাংবাদিকদের সামনে বিলাপ শুরু করে শাহ আলম। এ সময় স্ত্রী-সন্তানকে কারা খুন করতে পারে জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, আলমারী ভেঙে আমার ৮-১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। ওরা ডাকাতি করার জন্য এসেছিল। আমার সঙ্গে তো কারও কোন শত্রুতা নেই।

নগর পুলিশের কোতয়ালি জোনের সহকারি কমিশনার শাহ মো. আব্দুর রউফ এ প্রসঙ্গে বলেন, আলমারীর ভেতরে স্বর্ণালংকার রাখার একটি কাপড়ের ছোট ব্যাগ পাওয়া গেছে। তবে এর ভেতরে স্বর্ণ নেই। বাসার অন্য কোন আসবাবপত্রের কোন সমস্যা আমরা পাইনি।

তিনি বলেন, যদি ডাকাতি হত, তাহলে শুধুমাত্র স্টিলের আলমারী খুলে টাকা পয়সা-স্বর্ণ নিয়ে দুজনকে খুন করে চলে যেতনা। মোটিভ দেখে মনে হচ্ছে খুনীরা ডাকাতির জন্য আসেনি, খুন করার জন্যই এসেছিল।

ছেলে রিয়াদের সাক্ষ্য: শাহ আলমের ছেলে মো. রিয়াদ হোসেন (১২) মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। তাকে প্রায় এক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঘটনাস্থলে যাওয়া টিমের সদস্য বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন রিয়াদ।

রিয়াদের জবানিতে তিনজনের নাম পাওয়া গেছে যারা তাদের বাসায় নিয়মিত যেত। এরা হলেন, কমল দাশ, মো. আইয়ুব এবং রকি।

রিয়াদ জানায়, রকি সরকারি সিটি কলেজে লেখাপড়া করে। রকি তাদের গৃহশিক্ষক। সে তাদের বাসায় এসে দুই বেলা ভাত খেয়ে যায় আর দুই ভাইকে পড়ায়। আর কমল দাশ তার বাবা শাহ আলমের বন্ধু। সে নিয়মিত বাসায় আসত, আর মাঝে মাঝে ভাত খেত এবং ঘুমাত। আর আসত তার মামা আলালের বন্ধু মো. আইয়ুব। আইয়ুব পেশায় প্রাইভেটকার চালক।

রিয়াদ বলেন, আইয়ুব তার গাড়ির মালিকের মেয়েকে মাদারবাড়িতে কোচিং সেন্টারে দিয়ে তাদের বাসায় চলে আসত। তার বাবা-মামা বাসায় না থাকলেও আইয়ুব আসত। মাঝে মাঝে ক্ষুধা লেগেছে বলে নিজেই প্লেটে ভাত নিয়ে খেয়ে ফেলত। আর প্রায়ই সোফায় ঘুমিয়ে পড়ত। এদের মধ্যে কমল এবং আইয়ুব নিয়মিত মাদক সেবন করত বলেও জানায় রিয়াদ। এছাড়া পুলিশ তদন্ত করে রাসেল ও জাহাঙ্গির নামে আরও দুজনের নাম পেয়েছে। এদের মধ্যে রাসেল শাহ আলমের আত্মীয়। সে আগেও দুবার গ্রেপ্তার হয়েছে। জাহাঙ্গিরের বিষয়ে পুলিশ অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

রকির দরজায় রক্তমাখা হাতের ছাপ: ভবনের চতুর্থ তলায় থাকত শাহআলমের পরিবার আর নিচতলায় ব্যাচেলর হিসেবে থাকত রকি। রকিকে পুলিশ ঘটনার দুই ঘণ্টার মধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে সদরঘাট থানায় নিয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শাহ আলমকেও আটক করে পুলিশ সদরঘাট থানায় নিয়ে যায়।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এস এম তানভির আরাফাত বলেন, শাহ আলমের মুভমেন্ট সন্দেহজনক। তার কথাবার্তা, কললিস্ট সবকিছুই সন্দেহজনক। সেজন্য তাকে আটক করা হয়েছে। রকির বাসার দরজায় রক্তমাখা একটা হাতের ছাপ দেখা গেছে। এখন শাহআলম কিংবা অন্য কেউ রকিকে ফাঁসানোর জন্য এই কাজ করেছে কিনা তদন্ত করে দেখতে হবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত