টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আ জ ম নাছিরকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে

nasir-albdচট্টগ্রাম, ০৭ মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) : সদ্যসমাপ্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নগরভবনের চাবি পেলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহ-সভাপতি আ জ ম নাছির উদ্দিন। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ও ভোটারদের নিজের জালে ভেড়াতে চট্টগ্রাম নগরীকে গ্রীন মেগাসিটি, জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, পানি সংকট নিরসন, নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ, করের হার হ্রাস, তথ্য প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ ডিজিটাল চট্টগ্রাম নির্মাণ, সিটি করপোরেশনের আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ, সচেতন ও পেশাদার নাগরিকদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠনসহ ব্যতিক্রমী ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলেন তিনি। দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন নগরবাসী একবার সুযোগ দিলে প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার।

গত ২৮ এপ্রিল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আ জ ম নাছির সেই সুযোগ পেয়েছেন। এখন নগরবাসীর দৃষ্টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে। চট্টগ্রাম নগরীর নতুন অভিভাবক কি পারবেন এবার নগরীকে একটি সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে? নাকি অতীতের মতো নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধান না করার ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে তার পূর্বসূরিদের ভাগ্যবরণ করবেন?। অবশ্য সদ্য নির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলছেন, ‘আমি কথার মানুষ নয়, কাজের মানুষ। কাজের মাধ্যমেই মানুষ আমাকে চিনতে পারবে, নগরবাসী যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাকে নগরভবনে পাঠিয়েছে, তাদের সে প্রত্যাশা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা আমার জন্য ফরজ কাজ।’ দায়িত্বপালনকালে চট্টগ্রাম নগরীর নতুন অভিভাবকের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বেশ কয়টি বিষয়।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান

এবারের চসিক নির্বাচনে আ জ ম নাছিরের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল মেয়র নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করা। মূলত ২০১০ সালের নির্বাচনে এই ইস্যুটিকে পুঁজি করেই প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন সদ্য বিদায়ী মেয়র এম মনজুর আলম। কিন্তু পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করে নগরবাসীকে এ সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতে না পারায় সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মনজুর আলমের ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। এর আগে তিন দফায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালনকারী মহিউদ্দীন চৌধুরীও নগরবাসীকে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিগত ২০ বছর ধরে চলমান এই সমস্যার পাঁচ বছরের মধ্যে স্থায়ী সমাধান করতে হবে নগরবাসীর নতুন অভিভাবক আ জ ম নাছিরকে। যেটি নাছিরের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নতুন মেয়রকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এজন্য ১৯৯৫ সালে প্রণীত সিডিএ’র মাস্টার প্লান দ্রুত বাস্তবায়ন চান নগর পরিকল্পনাবিদরা।

নির্বাচিত হওয়ার পর আ জ ম নাছির বলছেন, ‘শপথ নেওয়ার পর মেয়রের চেয়ারে বসে জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আশা করি এক বছরের মধ্যে নগরবাসী এর সুফল পাবেন।’

দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা হবে নগরভবনকে

নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছিরের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সিটি করপোরেশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। সদ্য বিদায়ী মেয়র মনজুর আলমের পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি ছিল তিনি সিটি করপোরেশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তার দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের তেমন দৌরাত্ম্য ছিল না নগরভবনে। অবশ্য অনেকে বলছেন, মনজুর আলম দলের সাংগঠনিক কোনো পর্যায়ের বড় দায়িত্বে না থাকায় নেতা-কর্মীদের তেমন ঘেঁষতে হতো না মনজুরের কাছে। তাই হয়ত নগরভবন কিছুটা দলীয় প্রভাবমুক্ত ছিল। কিন্তু নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করায় সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সংযোগ রয়েছে তার সঙ্গে। এমতাবস্থায় নগরভবন আদৌ দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয় কি না তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত নগরবাসী। অবশ্য আ জ ম নাছির বলছেন, ‘শতভাগ দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে কাউকে নগরভবনে আধিপত্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের জন্য নগরভবনের দরজা উন্মুক্ত থাকবে।’

ধরে রাখতে হবে দলীয় ঐক্য

’৭৫-পরবর্তী দলের কঠিন সময়ে পরপর দুই দফা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন আ জ ম নাছির। এরপর দীর্ঘদিন দলের মূল নেতৃত্বের বাইরে থেকেও দলের জন্য কাজ করে গেছেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে আ জ ম নাছিরকে দলের মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হলে মহানগর রাজনীতির মধ্যমণি হয়ে উঠে অপেক্ষাকৃত তরুণ এই সংগঠক। এবার দু বছরের মাথায় দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবারের মতো বন্দর নগরীর মেয়র নির্বাচিত হলেন আ জ ম নাছির। মূলত নগর আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকভাগে বিভক্ত থাকলেও এবারের সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিবদমান সব গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। ফলে নির্বাচনে জয় পেতে সহজ হয়েছে আ জ ম নাছিরের। বিশ্লেষকরা বলছেন, আ জ ম নাছিরের জন্য দলের এই ঐক্য ও তার প্রতি নেতা-কর্মীদের আনুগত্য ধরে রাখতে পারাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়। সাবেক মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরী প্রথম যখন মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন তিনিও আ জ ম নাছিরের মতো দলের মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক ও বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ ছিলেন। কিন্তু মহিউদ্দীন নগরভবনের চাবি পাওয়ার পর কার্যত তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। তাকে ঘিরে দলের সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীদের একটি বলয় গড়ে উঠেছিল, সুবিধাবাদী এই নেতাদের ভিড়ে তৃণমূলের পোড় খাওয়া নেতা-কর্মীরা তার কাছ থেকে অনেকটা দূরে ছিলেন। ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যান মহিউদ্দীন চৌধুরী। যার প্রভাব পড়ে ২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সে নির্বাচনে প্রায় দলীয় নেতা-কর্মীবিহীন ছিলেন তিনি। ফলে মেয়র পদ হারানোর পাশাপাশি দলে দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যেও ভাটা পড়ে মহিউদ্দীন শিবিরে। তাই পূর্বের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিশ্লেষকরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাতে আ জ ম নাছিরও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যান এবং তাকে ঘিরে দলের মধ্যে যাতে কোনো সুবিধাবাদী বলয় গড়ে ওঠতে না পারে সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। দলের প্রাণশক্তি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের আনুগত্য যদি তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেন তাহলে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের কিংবদন্তী মরহুম এম এ আজিজ, এম এ হান্নান ও জহুর আহমদ চৌধুরীর যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারবেন নতুন এই মেয়র।

নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সহযোগী সংগঠনগুলোকে

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করায় নগরের মূল দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন আ জ ম নাছির। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সরকারি কমার্স কলেজ, আইন কলেজ, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আ জ ম নাছিরের অনুসারী ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষ, মহানগরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দরপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে আ জ ম নাছিরের অনুগত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের কর্মকা- নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ফলে আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর দলে তার অনুসারী সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ভবিষ্যৎ কর্মকা- নিয়ে শঙ্কিত নগরবাসী। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, কঠোর হস্তে দমন করতে হবে দলের বেপরোয়া সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের। যেকোনো মূল্যে তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। অবশ্য মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আ জ ম নাছির বলছেন, তার নাম ব্যবহার করে কেউ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি করলে তা কিছুতেই বরদাশত করবেন না তিনি। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকা-ে লিপ্ত হলে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বাস্তবায়ন করতে হবে অন্য প্রতিশ্রুতিগুলোও

চট্টগ্রাম নগরে যানজটমুক্ত যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নগরী গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট স্থাপন, নারীদের জন্য স্বতন্ত্র পরিবহনের ব্যবস্থা করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট নিরসন, ক্রীড়া ও বিনোদন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের দিকেও দ্রুত নজর দিতে হবে তাকে। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করাটাও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন নগরবাসী। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আ জ ম নাছিরের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানে নগর পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করলে নতুন নগর পিতার পক্ষে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।

জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে প্রথমবারের মতো নগরপিতার আসনে বসতে যাচ্ছেন আ জ ম নাছির। পাঁচ বছর তাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে নগরবাসীর অভিভাবকের। নগরবাসী আশা করছেন আ জ ম নাছিরের দেওয়া ৩৬ দফা ইশতেহার বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত বন্দরনগরী হবে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক শহর। আর সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা আ জ ম নাছিরের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে চট্টগ্রামের ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন নগরবাসীর নতুন এই অভিভাবক।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত