টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পাহাড়ের মাটি দিয়ে বাঁকখালী নদী ভরাট

Bakkhali pic

ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর কিনারে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি ও স্থাপনা উচ্ছেদে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলনও কম করেনি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে কোন আলামতও দেখা যাচ্ছেনা। বরং নদীর দু’তীরজুড়ে দখলপ্রক্রিয়া আরো জোরালো হচ্ছে। প্রতিনিয়তই বাড়ছে দখলবাজদের তালিকা ও দখলের সীমানা। ‘প্রকৃতির পেরেক’ পাহাড়ের মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে খরস্রোতা বাঁকখালী নদী। নদীর কূলে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন বসতি ও স্থাপনা।

শহরের উত্তর নুনিয়াছড়া থেকে মাঝেরঘাট পর্যন্ত বাঁকখালী নদীর কিনারে দখলবাজের নখর তো দীর্ঘদিন ধরে আছেই। এরই মাঝে কস্তুরাঘাটস্থ বিআইডাব্লিওআইটি টামির্নাল সংলগ্ন বাঁকখালী নদীতে নতুন করে চলছে ভরাটের কাজ। সেই সাথে পৌরসভার বর্জ্য ফেলে দূষিত করা হচ্ছে পরিবেশ। আবার বর্জ্যরে উপর প্রলেপ দেয়া হচ্ছে পাহাড়কাটা মাটি দিয়ে। পৌরসভার পুরাতন ডাম্পিং স্টেশন থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলছে ভরাট প্রক্রিয়া। পরিবেশ বিধ্বংসি এ কাজে ব্যবহার হচ্ছে পৌরসভার অসাধু কিছু লোকও। যে কারণে বাঁকখালী নদী দখল-দূষণ কোনমতেই থামছেনা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাাজর পৌরসভার ট্রাক ও ডাম্পারে করে এখানে মাটি আনা হচ্ছে। আর মাটিগুলো সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীতে। প্রকাশ্যে পৌরসভার ডাম্পিং গাড়ি করে বিপুল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সেখানে।  আর তাৎক্ষণিক একটি স্ক্যাবেটর ওইসব মাটি ও আবর্জনা সমান করে দিচ্ছে। মোটর সােইকেল আরো তিন ব্যক্তি এসব তদারকি করছে। এসময় প্রশ্ন করা হলে এড়িয়ে গেছেন পৌরসভার পরিচ্ছন্নকর্মীরা।

সেখানকার পাশ্ববর্তী লোকদের কথা হলে তারা জানায়, ফরিদুল আলম নামে এক ব্যক্তি কয়েক মাস ধরে বাঁকখালী এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভরাট করে দখল কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি শহরের পেশকার পাড়ার মৃত ইয়াকুব আলীর পুত্র। তার সাথে গোপন আতাঁত রয়েছে পৌরসভার কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মীর সাথে। ওই পরিচ্ছন্নকর্মীরা প্রথমে বর্জ্য ফেলেছিল। এখন মাটি দিয়ে ভরাট করে দিচ্ছে এ অবৈধ দখলদারের জায়গা। ভরাটকৃত জায়গার কিছু অংশ প্লট বানিয়ে তিনি বিক্রিও করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সুত্র জানিয়েছে।

এদিকে উচ্চ আদালতে দায়ের করা বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা রীট পিটিশনে (৮৩২৫/২০১৪ইং) বাঁকখালী নদীতে বর্জ্য ফেলার উপর সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পৌরসভার কতিপয় পরিচ্ছন্ন কর্মচারীর সাথে আঁতাত করে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত রেখেছেন অভিযুুক্ত ফরিদুল আলম। তার সাথে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদী ভরাটের পাশাপাশি বর্জ্য ফেলায় মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটছে আশেপাশের। সেই সাথে ভরাট প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় সংকুচিত হয়ে আসছে বাঁকখালী। তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই পুরো এলাকা দখল হয়ে যাবে বলে স্থানীয়রা জানান।

সুত্র জানায়, গত বছরের শেষের দিকে প্রায় এক হাজার অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করে প্রশাসন। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২৪২ দখলদারের বিরুদ্ধে নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। তবে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বরং দখলদারেরা আরো বেপরোয়াভাবে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছে। এতে করে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী খরস্রোতা এ নদীর নাব্যতা যেমন হারাচ্ছে তেমনি ‘সুপেয় পনি’ শঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।

পানি বিশেষজ্ঞ ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, বাঁকখালী দখলের কারণে শহরে সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। বর্ষাকালে শহরে জলাবদ্ধতা তৈরী হয়। নদীর কিনার থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা না হলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাকঁখালী নদীর পানি মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। তবে এ নদীর মোহনায় এই দূষণের মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি। পরিবেশ অধিদফতরের সাম্প্রতিক মনিটরিংয়ে এ ভয়াবহ অবস্থা ধরা পড়েছে। বাকঁখালী নদীর তীরে তামাক চাষ, ডকইয়ার্ড স্থাপন, নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কিছু লোক মিলেমিশে ভাগবাটোয়ারা বসিয়েছে বাঁকখালী নদীর জমিতে। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে প্রতি রাতেই চলে নদী ভরাটযজ্ঞ। এতে ব্যবহার করা হয় ভাড়াটে লোকদের। সাথে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী’ রোহিঙ্গা শ্রমিক তো আছেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পৌর মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, ‘পৌরসভার কোন বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছেনা। নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশনে ময়লা ফেলা হচ্ছে। পৌসভায় কর্মরত কোন লোকও একাজে জড়িত নয়। এরপরও খোঁজ নিয়ে আমি দেখব। প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘জলাশয় ভরাট করা আইনগত অপরাধ। আইন অমান্য করে কেউ পার পাবেনা। নদীর ওপর মাঠি ফেলার বিষয়টি আমরা জেনেছি। এর সাথে জড়িত লোকদের বিরুদ্ধে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

তিনি এও বলেন, জমির মালিক জেলা প্রশাসন। তাছাড়া আমাদের লোকবল খুবই কম। এরপরও আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। আমাদের সাথে সর্বস্থরের লোকজনের সহায়তা দরকার।’

মতামত