টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

২৫০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে সড়কপথ নির্মাণ, ব্যয় হয়েছে ১শ’ ২০ কোটি টাকা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি

Alikadam_Tanchi-Road-News-Pচট্টগ্রাম, ০২ মে এপ্রিল (সিটিজি টাইমস):  অন্তর্বিহীন মৌন নিস্তব্ধ সৌন্দর্য আর দিগন্ত বিস্তৃত গ্রন্থিল পাহাড়িকা। আকাশের নীলিমা আর পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। সবুজাভ পাহাড়ের বুকে পটে আঁকা ছবির মতন এক সরণি। তার নাম ‘আলীকদম-থানচি সড়ক’। এ সড়ক নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১শ’ ২০ কোটি টাকা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়া ও পাদদেশ বেয়ে নির্মিত এ সড়কটি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা। আর দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কপথ। চলতি মে মাসেই সড়কটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্প্রতি এ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি দেখতে এসে সেতু ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবাইদুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, চলতি মে মাসের কোনো এক সময় দেশের সবচেয়ে উঁচু এ সড়কপথের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সব ধরনের গাড়ি চলাচলের জন্য তা খুলে দেওয়া হবে। এরপর পাহাড় আর বন-বনানী ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহন করে গাড়ি ছুটিয়ে ঘুরে বেড়ানোর এ সুযোগ দেশের পর্যটন শিল্পকে করে তুলবে আরো সম্ভাবনাময়।

এ সড়কের আলীকদম-থানচি সীমান্তে রয়েছে ‘ডিম পাহাড়’। ডিম পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশে সবুজাভ অরণ্য আর নীলিমার লুকোচুরি দর্শকহৃদয়ে শিহরণ তুলে। উঁচু পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা সড়ক সর্পিল গতিতে বয়ে গেছে। যেন দক্ষ শিল্পীর আঁকা ছবির মতন। ডিম পাহাড় এলাকা থেকে থানচির পাহাড়ি গ্রামগুলোকে বড়ই মনোহর লাগে।

গাড়িতে চড়ে ডিম পাহাড় পর্যন্ত ঘুরে এসে সাংবাদিকদের কাছে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। একসময় বলা হতো, ডিম পাহাড়ের পরাজয় নেই। আমাদের সেনা জওয়ানরা সেই অসম্ভবকে আজ বাস্তবে পরিণত করলেন।’

আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংকালে ওবাইদুল কাদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশের সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কানেকটিভিটির আওতায় নিয়ে আসতে চান। আমরা তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছি।’

থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা (পিডি) লে. কর্নেল মনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এ রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ১২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ৩০ জুন প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই তা সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি জানান, কক্সবাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সড়কটি দুই পর্বে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্বে থানচি থেকে আলীকদম অংশের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় অংশ ছাড়াই আলীকদম থেকে চকরিয়া সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে কক্সবাজার যাওয়া যাচ্ছে। তবে আলীকদম থেকে বাইশারি-চাকঢালা-ঘুমধুম-উখিয়া অংশের কাজ শেষ হলে পথের দূরত্ব অনেক কমে যাবে।

টানা এক যুগের চেষ্টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকে সামনে রেখে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এ সড়ক পরিদর্শন করেছেন। বান্দরবানের থানচি থেকে আলীকদম হয়ে এ পথ চলে গেছে আরেক পর্যটন নগরী কক্সবাজারে।

সড়কমন্ত্রীর সঙ্গী হয়ে এ প্রতিবেদকসহ আরো কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক থানচির জিরো পয়েন্ট থেকে ২২ কিলোমিটার পয়েন্টের ডিম পাহাড় ঘুরে দেখেছেন। থানচির সাংবাদিক অনুপম মারমা জানান, আড়াই হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড় চূড়ার আকৃতি দেখতে ডিমের মতো হওয়ায় স্থানীয়রা একে ডিম পাহাড় নামেই চেনে।

বান্দরবানের প্রবীণ সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মনু জানান, স্থল যোগাযোগ না থাকায় বান্দরবান সদর থেকে নদীপথে থানচি যেতে দুই দিন লাগত। এখন পৌনে দুই ঘণ্টায় থানচি, আর পাহাড়ি পথ ধরে আলীকদম যেতে লাগছে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। রেমাক্রি জলপ্রপাত, তিন্দুর পাথুরে নদীপথ, নাফা খুম, শংখ নদীর উৎসমুখ আন্ধার মানিক, গহিন রিজার্ভ ফরেস্ট, পাহাড়িদের জীবনের বর্ণিল সৌরভ পর্যটকদের টেনে নিয়ে আসত প্রান্তিক জনপদ থানচিতে। এর সঙ্গে আড়াই হাজার ফুট উচ্চতার থানচি-আলীকদম সড়ক যোগ করল নতুন মাত্রা। বান্দরবানের থানচি-আলীকদমের কাছাকাছি মিয়ানমারের চিন প্রদেশের রাজধানী শহর হাখা। এর উচ্চতা প্রায় ছয় হাজার ফুট। সেখানে যেতে হলে বিমানের পাশাপাশি একটিমাত্র সড়কপথ রয়েছে। এ পথকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু রাস্তা বিবেচনা করা হয়। উচ্চতায় অর্ধেক হলেও থানচি-আলীকদম সড়কটি দখল করে নিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কের মর্যাদা।

জানা গেছে, মিয়ানমারের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র ‘হাখা শহর’ এর অবস্থান। যা বাংলাদেশের থানচি-আলীকদমের কাছাকাছি। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতার ভিত্তিতে থানচি-আলীকদম সড়কের সঙ্গে হাখা সড়ককে সংযুক্ত করা গেলে উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় রচিত হবে পর্যটন শিল্পে!

মতামত