টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে সক্রিয় বনখেকোরা নিষ্ক্রিয় রক্ষীরা, উজাড় হচ্ছে সবুজ বেষ্টুনি

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি

unnamedচট্টগ্রাম, ৩০ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস)::মিরসরাই উপকূলে সৃজিত বিশাল এলাকায় বনায়ন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বনরক্ষীদের দুর্বল অবস্থানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্রের যোগসাজসে দিনের পর দিন উপকূল উজাড় হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপর দিকে উপকূলীয় বনা ল ধ্বংস করে প্রভারশালী কয়েকটি চক্র চরা লে দীঘি খননের জন্য প্রায় ৫০একর এলাকা জুড়ে বাঁধ নির্মান করেছে। দেশের অন্যান্য অ লের মত মিরসরাইও বন্যা কবলিত উপকূলীয় এলাকা। উপকূলীয় বন ধ্বংসের ষোলকলা পূর্ণ হলে দুর্যোগ থেকে রেহাই পাবে না এ উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।

জানা গেছে, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। এসব উপকূলীয় এলাকায় সাগর ও নদীর পশ্চিম তীরে রয়েছে বিশাল এলাকার উপকূলীয় বনা ল। এর বাইরে এসব নদী ও সাগরকে ঘিরে ব্যাপকভাকে সবুজ বনায়ন গড়ে তোলা হয়। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার মত শক্তিশালী যেকোন বন্যার করাল গ্রাস থেকে মিরসরাইকে রক্ষা করতে এসব উপকূলীয় বনায়নের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। উপজেলার সাহেরখালী, ইছাখালী এবং ওসমানপুর ইউনিয়নে অবস্থিত উপকূলীয় বনায়ন ঘুরে দেখা গেছে বন উজাড়ের নানা চিত্র। স্থানীয় এলাকাবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এক শ্রেণীর মানুষ বন উজাড়ের সাথে জড়িত।

স্থানীয় লোকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড় হতে থাকলেও বন বিভাগ কিংবা থানা প্রশাসন এসব বন্ধে কোন অভিযান চালায়নি। ফলে নির্ভয়েই চলছে উজাড় কার্যক্রম। এক প্রকার মহোৎসবে পরিণত হয়েছে গাছ কাটা।

ওসমানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, ‘উপকূলীয় বন উজাড় অব্যাহত থাকায় এই ইউনিয়নের প্রায় ২৫ সহস্রাধিক মানুষকে সবসময় ভয় আর আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। সর্বনাশা বন্যার কবল থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে না বন উজাড়ের ফলে।’ তিনি আরও জানান, ‘এই ইউনিয়নের পাশ্ববর্তী ইছাখালী ইউনিয়নেও উপকূলীয় বনা ল রয়েছে। সমানতালেই উজাড় হচ্ছে বন। অথচ বিশাল এলাকাজুড়ে কোন রেঞ্জ অফিস নেই। ফলে বনদস্যুদের ঠেকানোর কোন উপায়ও নেই।’ ওসব এলাকায় রেঞ্জ অফিস স্থাপনের দাবী জানান এলাকাবাসী।

উপজেলার সাহেরখালী ও বামনসুন্দর স্লুইচ গেইট উপকূলীয় এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি বনদস্যু সিন্ডিকেট। দিনের বেলা নৌকা নিয়ে দা, কুড়াল হাতে বনদস্যূরা গভীর বনা নে ঢুবে পড়ে। গাছ কাটা শেষ হলে জোয়ারের সময় নৌকার করে আর ভাটার সময় পানিতে ভাসিয়ে কাঠ গুলো নিয়ে আসে। এরপর প্রকাশ্যেই গাছ গুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়। উপকূলীয় বনের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সরু সড়কটির দু’পাশের অসংখ্য গাছগুলোও রেহাই পাচ্ছে না।
উপজেলার সাহেরখালী, মঘাদিয়া, গজারিয়া, দমদমা, ঘোনা, বদি উল্যাহ পাড়া, খূড়াখালী, কাজীর তালুক, সারেং পাড়া, মিয়া পাড়া, সোনাপাড়ার বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্র উপকূলীয় বন নিধনে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গাছ স্থানীয় নামার বাজার, মঘাদিয়া, আবুতোরাব বাজারে এনে বিক্রি করে। কিছু গাছ দেশের অন্যান্য অ লে পাচার করে দেয়। সন্দ্বীপ, সোনাগাজীর গাছ চোরেরা ট্রলার (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) করে গাছ কেটে নিয়ে যায়।

সাহেরখালী এলাকার বাসিন্দা বাহার মিয়া জানান, ‘এই এলাকায় একটি বিট অফিস থাকলেও কর্মকর্তারা বনদস্যুদের দমন করতে পারেন না। ফলে বাধাহীনভাবেই এগিয়ে যায় সংঘবদ্ধ গাছ চোরচক্র।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বনরক্ষীরা অভিযান চালালে বনদস্যুদের আক্রমণের মুখে বাধাগ্রস্থ হয়। প্রতিদিন গাছ কেটে বনদস্যুরা পিকাপ, ভ্যান, ঠেলাগাড়ী এবং সন্দ্বীপ চ্যানেল দিয়ে ট্রলার ও নৌকায় করে গাছ পাচার করে। পাশ্ববর্তী সোনাগাজী উপজেলা থেকে এসেও বনদস্যুরা গাছ কেটে নৌকায় ভরে নিয়ে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের মধ্যে বাউল, কেওড়া, বাইন, গড়ান, কাকরা, গেওয়া, ঝাউ, আকশমনি, বাবলা, নীম, ইপিল-ইপিল, নারিকেল, খেজুর, তালগাছ বেশি নিধন করছে। বড় গাছগুলো ভ্যানে করে নিয়ে এসে বিভিন্ন করাতকলে কেটে ফার্নিচারের কাঠ তৈরী করা হয়।

উপকূলীয় রেঞ্জ অফিস সূত্র জানায়, আগে রাতের বেলা এসব ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি দিনে গাছ কাটার ঘটনা বেড়ে গেছে। বিশাল এলাকাটির জন্য একমাত্র বিটে মাত্র ৪জন বনরক্ষী রয়েছে। সামান্য অস্ত্র দিয়ে গাছ চোরদের মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না।

উপকূলীয় বন বিট কর্মকর্তারা জানান, ‘এই বিটে জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত হাতিয়ারের অভাব রয়েছে। ফলে উদ্যোগ নিলেও জোরালো কোন অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত