টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ছাত্র নির্যাতনঃ ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী দিয়ে নবশ্রেণীর শিক্ষার্থীর গালে চড় !

মমতাজ উদ্দিন আহমদ
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি

Johor-Sing_News-Alikadam-Piচট্টগ্রাম, ২৬ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস)::  পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের আলীকদম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে চারুকারু শিক্ষকের নানা অনিয়ম ও ছাত্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফুঁসছে এলাকাবাসী। বিদ্যালয়ের সম্পত্তিকে নিজের ওয়ারিশী সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রী নির্যাতন, অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বকালে বিদ্যালয়ের তহবিল আত্মসাত থেকে শুরু করে নানা অনিয়মের অভিযোগের তীর এখন চারুকারু শিক্ষক জহর কুমার সিংহের দিকে। সম্প্রতি ছাত্র নির্যাতনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এলাকার অভিভাবকমহল, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষানুরাগীমহল ও নাগরিক ফোরামের সদস্যরা।

জানা গেছে, বিগত ২০১০ সালের ১০ মে আলীকদম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের চারুকারু শিক্ষক জহর কুমার সিংহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। এরপর থেকে তিনি বিদ্যালয়ে নানা আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের অভিভাবক কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মোহসিন সর্দার ও সাতুল বড়উয়া জানান, এ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১২ সালের ৩ মে ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয় কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটিতে আমরা সদস্য আছি। তারা বলেন, স্কুলে শিক্ষক সংকটের অজুহাতে সে সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জহর কুমার সিংহের প্রস্তাবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা হারে অর্থ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সময় থেকে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী থেকে ৫০ টাকা হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অথচ বিগত প্রায় তিনবছরে উত্তোলিত লাখ লাখ টাকার কোন হিসেব এ কমিটির কাছে শিক্ষক জহর কুমার সিংহ প্রদান করেননি। বর্তমানে এ হাইস্কুলে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চারমাস পূর্বে নতুন প্রধান শিক্ষক যোগদান করার পরও ছাত্র-ছাত্রী থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করে চলেছেন শিক্ষক জহর কুমার সিংহ’। মুক্তিযোদ্ধা মোহসিন সর্দার বলেন, সে (সিংহবাবু) কারো কথার তোয়াক্কা করেন না’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক জহর সিংহ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালে পরপর তিন অর্থবছরে স্কুলের পুকুর লাগিয়তির কোন টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেননি। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার টাকায় পুকুর লাগিয়তি দেন একই স্কুলের ধর্ম শিক্ষক মৌ. ফিরোজ আহামদের কাছে। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে একইভাবে মৌ. ফিরোজের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকায় পুকুর লাগিয়তি দেন বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আতাউলের নিকট। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে স্কুল কমিটির অনুমোদন ছাড়া জালিয়তির মাধ্যমে পুকুর লাগিয়তি দেন জনৈক মৌ. শিব্বির আহমদের কাছে। বর্তমানে মৌ. শিব্বির অবৈধভাবে শিক্ষক জহর সিংহের যোগসাজশে পুকুর পাড়ে টিনসেট একটি ঘর তৈরী করেছেন।

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে সহকারী শিক্ষক পদে এ স্কুলে যোগ দেন জহর কুমার সিংহ। যোগদানের পর স্কুল ছাত্রাবাসের একটি কক্ষকে ভাড়া হিসেবে তিনি ব্যবহার শুরু করেন। ২০১০ সালের ১০ মে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি ছাত্রাবাসের আরো দুইটি কক্ষ নিজের বাসা হিসেবে দখলে নেন। অপরদিকে প্রধান শিক্ষকের ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বাসা ভাড়া মওকুপ করেন। বাসা ভাড়া মওকুপ করা ছাড়াও স্কুলের বৈদ্যুতিক মিটার ব্যবহার করলেও কোন বিল প্রদান করছেন না। অথচ তার বেতনের সাথে সরকার নির্ধারিত স্কেল মতে বাসা ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতাদি গ্রহণ করছেন। তার এহেন আচরণ একজন শিক্ষক হিসেবে নৈতিকতা পরিপন্থী বলে মনে করছেন ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবক মহল।

স্থানীয় ছাত্র অভিভাবক রবিদয় তঞ্চঙ্গ্যা প্রু জানান, স্কুলের শ্রেণীকক্ষে ব্যবহারের জন্য সরকারীভাবে ২টি ল্যাপটপ বরাদ্দ আছে। ল্যাপটপ দুটি জহর কুমার সিংহ ব্যক্তিগত কাজে নিজ বাসায় রেখে ব্যবহার করছেন। কোন ছাত্র-ছাত্রীই জানেনা তাদের ক্লাসের জন্য ল্যাপটপ বরাদ্দ করা আছে। এছাড়াও জহর সিংহ ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্কুলের একটি কম্পিউটার ও প্রিন্টার স্কুলের বাইরে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দায়িত্বকালীন সময়ে প্রতিবছর স্কুলের খাতওয়ারী বরাদ্দের নয়ছয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, স্কুলের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার তহবিল ব্যাংক হিসেবে জমা রেখে লেনদেন পরিচালনার নিয়ম রয়েছে। অথচ জহর কুমার সিংহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বকালে এসব অর্থ ব্যাংক হিসেবে জমা দেননি। গত এসএসসি পরীক্ষার আগে নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক স্কুলে যোগদান করলেও তাকে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব হস্তান্তর করেনি সহকারী শিক্ষক জহর কুমার সিংহ! অথচ বোর্ডের নির্দেশনা মতে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষকই ‘কেন্দ্র সচিব’ হওয়ার কথা।

২০১২ সালের ২০ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এ নীতিমালার ১নং অনুচ্ছেদের (চ) উপানুচ্ছেদে বলা হয়, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যনরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের নির্ধারিত ক্লাসের বাহিরে বা এর পূর্বে অথবা এর পরে শিক্ষকগণ কর্তৃক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে/বাহিরের কোন স্থানে শিক্ষকগণ কোচিং করাতে পারবেনা’। অথচ জহর কুমার সিংহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক থাকাকালে স্কুলে কোচিং বাণিজ্য চালু করেন।

এ বিদ্যালয়ের ২০০৩ সালের কৃতিছাত্র মোঃ জমির উদ্দিন বলেন, আমরা যখন এই স্কুলের ছাত্র তখনও শিক্ষক জহর কুমার সিংহ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্দয় আচরণ করতেন। কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রতিশোধপরায়ন হয়ে মারধর শুরু করতেন। ছাত্র দিয়ে ছাত্রী এবং ছাত্রী দিয়ে ছাত্রদের ওপর মারধর করাতেন। শিক্ষার্থীদেরকে তিনি ঝাড়– ও জুতা দিয়ে পর্যন্ত নির্দয়ভাবে প্রহার করতেন।

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সহকারী জহর কুমার সিংহের উগ্র আচরণের শিকার শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, আমি নিজেও। আমি যোগদানের পর থেকে এ শিক্ষক আমার সাথে বেয়াদবী করে আসছেন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত