টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলিখেলা

ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:

চট্টগ্রাম, ২৫ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস):  কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী ডিসি সাহেবের দুই দিনব্যাপী বলিখেলা দায়সারাভাবে চলছে। দুই দিনব্যাপী ‘বলিখেলা ও বৈশাখী মেলা’র ২৫ এপ্রিল শুক্রবার বিকাল চারটা ২০ মিনিটের দিকে খেলা উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। কক্সবাজার বীরশ্রেষ্ট রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে এ খেলার আজ শনিবার সমাপনী দিন।

এ দিকে দুই দিনব্যাপী ‘বলিখেলা ও বৈশাখী মেলা’র প্রথম দিনেই আয়োজকদের চরম অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা গেছে। এ কারণে অনেক নামকরা বলি আজকের ফাইনাল খেলায় অংশ না নেওয়ার কথা সংবাদকর্মীদের কাছে জানিয়েছে। যথাযথ সম্মান না পেয়ে ১২ বারের চ্যাম্পিয়ন দিদার বলিসহ অনেক বলি উদ্বোধনী খেলায় ক্ষোভ নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। ফলে জেলা ক্রিড়া সংস্থার আয়োজনে ৬০ তম আসরের আজকের ফাইনাল খেলা ‘ফ্লপ’ মারার আশঙ্কা করছে ক্রিড়ামোদিরা।

১৯৫৬ সাল থেকে ডিসি সাহেবের বলী খেলা শুরু। বাঙালীর লোকজ উৎসব ‘বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা’ তখন থেকে পরিণত হয় এই জনপদের অধিবাসীদের প্রাণের উৎসবে। এবার হচ্ছে ধারাবাহিক ৬০ তম আসর। দ্ইু দিনব্যাপী বলিখেলা শেষে চলবে পাঁচদিন ব্যাপী বৈশাখী মেলা। তবে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এবারের আয়োজনে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তুলেছে দর্শকরা।

অনেক দর্শকের অভিযোগ, ডিসি সাহেবের বলিখেলার নামে টাকা লুটপাটের জন্য আয়োজন করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী খেলায় চেনাজানা অনেক অতিথি আমন্ত্রণ পায়নি। গুটি কয়েক সীমাবদ্ধ লোকের জন্য আয়োজন করা হয় এ খেলা। শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই। যে কারণে অনেক দর্শক খেলা না দেখে ফেরত গেছে।

বলিদের অভিযোগ, তাদের কাঙ্খিত কোন সম্মানি দেওয়া হয়নি। অনেক বলি মাঠে নামলেও খেলায় অংশ গ্রহণ করেনি। যারা খেলেছন তারাও মূল্যায়িত হয়নি। এ নিয়ে অনেক বলিকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখো গেছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বার বারের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দিদার বলি অভিযোগ করেন, খেলায় কোন শৃঙ্খলা নেই। বলিদের সম্মান করা হয়নি। অনেক বলি খালি হাতে চলে যায়। একজন বলির ন্যুনতম সম্মানি ১০০০ টাকা। অথচ একজন বলিকে দেওয়া হয়েছে মাত্র দুইশ টাকা। দেশের নামকরা দিদার বলি মাঠে এসেও আয়োজদের অব্যবস্থাপনা দেখে খেলতে নামেন নি। অধিকন্তু আয়োজক কমিটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা বলতে বলতে তিনি মাঠ ছাড়েন। এ সময় এবারের ডিসির বলিখেলায় খেলবেন না বলে জানান দিদার বলি।

একই অভিযোগ সোলতান বলি, শহরের রুমালিয়ারছরার মুন্না বলি, কলিমুল্লাহ বলি, ছিদ্দিক বলি ও মোস্তাক বলিসহ অনেকেরই। তারা বলেন-‘আমরা অনেক বলি খেলেছি। কিন্তু এরকম খেলা খেলিনি। আয়োজকরা আমাদের জন্য যথাযথ সম্মানের ব্যবস্থা করেননি।’

দর্শকরা অভিযোগ করেন, নামে বলিখেলা হলেও এখানে চলছে রমরমা জুয়াখেলা। বাঙালী জাতির ঐতিহ্যের এ খেলা দেখতে প্রতি টিকিট নেওয়া হচ্ছে ৫০-১০০ টাকা। দর্শক বাইরে ভিড় করলেও চড়া দামের কারণে ভেতরে ঢুকেনি অনেকেই। যার কারণে স্টেডিয়ামের পুরো গ্যালারী শুন্য ছিল। ভিআইপ চেয়ারগুলোতে বসার কোন লোক ছিলনা। উদ্বোধনী খেলায় নামকরা বলিদের দেখা মেলেনি। যারা এসেছে তারাও অস্তুষের কথা জানান।

সরেজমিন দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠজুড়ে বসানো হয়েছে অন্তত ৮টির জুয়ার স্টল। চলছে ফ্রি স্টাইলে বলিখেলার বদলে জুয়াখেলা। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মুখে নানা কথা শুনা গেছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অনেক বলি ফাইনাল খেখায় খেলতে আসছেনা বলে শুনেছি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতিসহ অন্যান্যরা ব্যবস্থা নেবেন। প্রথম দিনেই চরম অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘বলিখেলা আয়োজনের দায়িত্ব ক্রিড়া সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। এরপরও খোঁজ নিচ্ছি, সমাপনী দিনটাতে কি করা যায়।’

গতকালের উদ্বোধনী দিনে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেড আব্দুস সোবহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা, এসএম শাহ হাবীবুর রহমান হাকীম, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ছত্রধর ত্রিপুরা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম, জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম চৌধুরী, জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক ও খেলা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল করিম মাদু, জেলা ক্রিড়া সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশীদ, পৌর কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

এ দিকে জেলা ঐতিহ্যবাহী ডিসি সাহেবের বলিখেলা অতীতে যথা সময়ে শুরু হলেও এবার প্রায় দেড়ঘন্টা পরে শুরু হয়। এমনকি ডিসি সাহেব নিজেই আসেন নির্ধারিত সময়ের একঘন্টা পরে। এ নিয়ে দর্শকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।  স্টেডিয়ামের চার পাশের গ্যালারী বলতে গেলে দর্শকশুন্য। অতিথিদের জন্য রাখা চেয়ারগুলোর অধিকাংশই খালি পড়ে থাকে। প্রশাসনের কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন আমন্ত্রিত অতিথি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা মেলেনি। এ জন্য ক্রিড়া সংস্থার দূর্বল প্রচারণাকে দায়ী করেছে দর্শকরা। অনেক ক্রিড়ামোদি ব্যক্তি বাঙালীর ঐতিহ্যের এ খেলা আয়োজনে কর্তাব্যক্তিদের দূর্বল নেতৃত্বকে দায়ী করেছে। এ বিষয়ে জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র এক নেতার অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিসি সাহেব তো আমাদের প্রয়োজন মনে করেননি। সে কারণে যাওয়া হয়নি।’  একই অভিযোগ জেলা সিনিয়র অনেক ক্রিড়ামোদি ব্যক্তিদের।

বলিরা ক্ষুব্দ হওয়ার বিষয়ে খেলা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল করিম মাদুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বলিদের তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তিনশ থেকে সাতশ টাকা পর্যন্ত সম্মানি দেওয়া হয়েছে। এসব ডকুমেন্ট আমাদের হাতে আছে। অতীতের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশী সম্মান করা হয়েছে তাদের। এরপরও অভিযোগের কারণ দেখছিনা।’ তবে অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ক্রিড়া সংস্থার সহ-সভাপতিও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ৮ জন ব্যক্তি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। তাদের অনুপস্থিতির কারণে আয়োজনে একটু বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আজকের সমাপনী দিনে এসব বিষয় মাথায় রেখে আমরা কাজ করব।’

মতামত