টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাই সরকারি স্টেডিয়াম দখল করে চলছে গাছ আর ঠিকাদারির জমজমাট ব্যবসা

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি

unnamedচট্টগ্রাম, ২১ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস): মিরসরাই সরকারি একমাত্র স্টেডিয়ামটি দখল করে চলছে অবৈধ চোরাই গাছ, পাথর, বালির জমজমাট বিকিকিনি। উপজেলা স্টেডিয়ামটি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও)। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকির অভাবে সরকারি এই স্টেডিয়ামটি দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাঠ, পাথর এবং বালির ব্যবসা করে চলেছেন। শিল্পায়ন ও কৃষি জমি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণের ফলে উপজেলাতে কমে এসেছে খেলার মাঠের সংখ্যা। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসা, কলেজের মাঠ সংস্কার না করা এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কোন কার্যক্রম না থাকার ফলে উপজেলাতে ক্রীড়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোন উন্নয়নই হচ্ছে না।

বিভিন্ন সময় উপজেলার রেজিষ্ট্রেশন ও রেজিষ্ট্রেশন ছাড়া ক্লাবগুলো থেকে ক্রীকেট, ফুটবল টুর্ণামেন্ট ছাড়া হলেও সঠিক পৃষ্টপোষকতা না পাওয়া এবং মাঠ না থাকার ফলে তা আর বেশীদূর এগোয় না। উপজেলার একমাত্র মাঠটিকে বাজার হিসেবে ব্যবহার করলেও স্থানীয় প্রশাসন অদৃশ্য কারণে এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছে। প্রতি বছর খেলাধুলার জন্য ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও এডিবি থেকে উপজেলাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্ধ আসে ক্রীড়া সংস্থার কাছে তার সঠিক কোন হিসাব নেই। এছাড়া সর্বশেষ ২০০৬ সালে উপজেলা ক্রীড়া উন্নয়ন সংস্থার নির্বাচনের পর দশ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোন নির্বাচন হয়নি। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান হাবীব থাকেন চট্টগ্রাম শহরে। তাই তিনি নিয়মিত আসেন না উপজেলাতে। ক্রীড়া সংস্থার কোন কার্যক্রম না থাকাতে ঝিমিয়ে পড়েছে উপজেলার ক্রীড়া কার্যক্রম।

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলা স্টেডিয়াম মাঠের উত্তর পশ্চিামাংশে প্রায় ১ একরেরও অধিক এলাকাজুড়ে বিক্রির জন্য সেগুন, শাল, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, আকাশিসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রজাতির বড় বড় গাছের গুঁড়ি আর বালুর স্তুপ রাখা হয়েছে, উত্তরের এক অংশে রোপন করা হয়েছে কচু গাছ, পূর্বপাশে ছন, লাকড়ি, দক্ষিণ পাশে সিলেটি পাথর রাখা হয়েছে। দক্ষিণ পার্শ্বে সীমানা প্রাচীরের বাহিরে থাকা জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট বড় ১৩টি দোকানঘর। গাছ, পাথর, বালি ছাড়াও প্রতি বছর ঈদুল আযহার সময় মাঠটিকে ব্যবহার করা হয় মিরসরাই পৌরসভার গরুর বাজার হিসেবে। গরুর বাজারে পশু বাঁধার জন্য মাঠ গর্ত করে খুটি পুঁতলেও পরবর্তীতে তা আর ভরাট করা হয় না। ফলে বর্ষাকালে ওইসব গর্তে পানি জমে মাঠ কাদায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর-গোবনীয়া-নারায়ণহাট (মিরসারাই-ফটিকছড়ি) সড়ক দিয়ে প্রতিরাতে ২০-২৫ ট্রাক চোরাই কাঠ এনে স্টেডিয়ামে রাখা হয়। সেখান থেকে গভীর রাতে ছোট মিনি পিকআপ, নছিমন-করিমন ভটভটি করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কাঠগুলো উপজেলার বিভিন্ন স’মিল সহ অন্যান্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এক্ষেত্রে স্টেডিয়ামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। যে কোনো সময় প্রশাসন ও বনবিভাগ অভিযান চালালে এসব কাঠ উদ্ধার করতে পারে কিন্তু রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। প্রতিদিন স্টেডিয়ামের অবৈধ এই হাটে প্রায় অর্ধকোটি টাকার চোরাই গাছ বেচাকেনা হয়। এসব কাঠের অধিকাংশই পাহাড়ের সামাজিক বনায়ন থেকে চুরি করে কেটে আনা গাছ। উপজেলা প্রশাসন শুধুমাত্র জাতীয় দিবসগুলোতে (২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর) মাঠ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়লে ব্যবসায়ীদের স্টেডিয়াম থেকে অবৈধ কাঠ সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলে তারা মাঠ খালি করে দেয়। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার অল্প সময়ের ব্যবধানে মাঠ আবার আগের অবস্থায় ফিরে এলেও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় স্টেডিয়ামের বিশাল একটি অংশ বর্তমানে অনেকটা বেদখল হওয়ার উপক্রম। এদিকে সরকারি স্টেডিয়াম চোরাকারবারীদের দখলে চলে যাওয়ায় পার্শ্ববর্তী ঈদগাহ ময়দানকে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করছে শিশু-কিশোররা। এ সময় ঈদগাহ ময়দানে ক্রিকেট খেলারত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা বলে, ‘স্টেডিয়ামে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখায় আমাদের বাধ্য হয়ে ঈদগাহে খেলতে হচ্ছে। কেউ মাঠ থেকে গাছ সরিয়ে নিতে বললে পার্শ্ববর্তী কাঠ ব্যবসায়ীরা তার উপর চড়াও হয়। তাই ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি এই স্টেডিয়ামটিতে প্রভাবশালীদের দৌরাত্য বাড়ায় উপজেলা সদরে বসবাসরত শিশু-কিশোররা তাদের খেলাধুলা ও বিনোদনের সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বি ত হচ্ছে। অন্যদিকে, সন্ধ্যার পর পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে বসে ভ্রাম্যমাণ মাদক সেবীদের আস্তানা। ফলে সূর্য ডোবার পর থেকে স্থানীয়রা স্টেডিয়ামের পার্শ্ববর্তী সড়ক দিয়ে চলাফেরা করতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন বলে জানান একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা।

স্টেডিয়াম পার্শ্ববর্তী গিয়াস উদ্দিন ও জয়নাল উদ্দিনের স’মিলের লোকজনের সাথে কথা বললে গাছ রাখার বিষয়টি তারা স্বীকার করে বলেন, প্রশাসন বাধা না দেয়ায় ও স্টেডিয়ামটি খালি পড়ে থাকায় ব্যবসায়ীরা এটিকে ব্যবহার করছে। কোনো অনুষ্ঠানের সময় প্রশাসন নির্দেশ দিলে ব্যবসায়ীরা গাছ সরিয়ে নিয়ে মাঠ খালি করে দেয় বলে জানান তিনি।

মিরসরাই পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুর নবী জানান, স্টেডিয়ামটি পৌরসভার মধ্যে পড়লেও এটির দেখবালের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের। দীর্ঘদিন ধরে স্টেডিয়ামটি কাঠ, পাথর, বালি ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেলেও; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এছাড়াও মাঠের দক্ষিণ দিকে জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকান ঘর। ঘরগুলো যদি সরকারী ভাবে তৈরী করে করা হতো তাহলে ভাড়া বাবদ বছরে অনেক টাকা রাজস্ব পেতো সরকার। কিন্তু প্রশাসনের সঠিক তদারকি না থাকার ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বি ত হচ্ছে।

উদীয়মান ধারাভাষ্যকার এবি ব্যাংকের সাইদুল ইসলাম সাবেক ক্রিকেট খেলেয়াড় মফিজুল করিম জুয়েল, বলেন, গ্রামে জমি ভরাট করে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করার ফলে খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। এছাড়াও উপজেলার স্কুল, মাদরাসা, কলেজের মাঠগুলো সংস্কার না করার কারণে ক্রীড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। মিরসরাই স্টেডিয়ামকে উন্নত প্রযুক্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন যাতে সারা বছর টুর্ণামেন্ট খেলানো যায়। খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে তরুণ সমাজ মাদক সহ খারাপ কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান হাবীব বলেন, ‘আমি ব্যবসায়িক কারণে বিভিন্ন সময় ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে থাকি। তাই উপজেলার ক্রীড়া কার্যক্রমে সব সময় থাকতে পারি না। তবে না থাকলেও আমি সব সময় ক্রীড়ার জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা দিই। উপজেলার ক্রীড়ার উন্নয়নের জন্য শীঘ্রই আন্ত:উপজেলার টুর্ণামেন্ট ছাড়া হবে। সম্প্রতি সময়ে মিরসরাইয়ের একটি টিম উপজেলাতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চট্টগ্রাম জেলা পর্যন্ত গেছে।’

তিনি আরো বলেন, উপজেলা ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও এডিবি থেকে প্রত্যেক বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আসলেও সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয় তা আমি জানি না। হয়তো বিভিন্ন স্কুল কিংবা কলেজে খেলার জন্য দেওয়া হয়। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটির নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০০৬ সালে কমিটি নির্বাচন হয়েছিল ৫বছরের জন্য। তারপর ওই কমিটি পুনরায় নবায়ন হয়ে যায়; কেউ প্রার্থী না থাকায়। আসলে কমিটির বিষয়টি হলো পলিটিক্যাল; যখন যে গভমেন্ট থাকে তখন ওই দলের লোকজন কমিটিতে আসে।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মুহম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘সরকারি স্টেডিয়ামে চোরাই গাছ, বালি, পাথরগুলো গত ২৬ মার্চ খেলার সময় উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পুনরায় তারা ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রীঘই ষ্টেডিয়াম দখলমুক্ত করার জন্য অভিযান চালানো হবে। আমরা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকেও মিটিং করব কিভাবে উপজেলার ক্রীড়ার উন্নয়ন করা যায়। স্টেডিয়ামের জায়গা দখলকারী সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দখলদার উচ্ছেদ ও পশ্চিম দিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, উপজেলায় স্কুল, কলেজ সহ বিভিন্ন ক্লাবে সরকারী ক্রীড়ার জন্য যে অনুদান দেওয়া হয় তার কোন ফলাফল এখনো পাওয়া যায় নি। তাছাড়া মিরসরাইতে ক্রীড়া বান্ধব অর্থ্যাৎ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগীতায় অনুদান দেওয়ার মতো লোকের অভাব।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত