টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চসিক নির্বাচন: প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘প্রেস রিলিজ’!

cccচট্টগ্রাম, ২০ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস):  চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকুরী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সংক্রান্ত প্রকাশিত একটি প্রেস রিলিজকে ভিত্তি ধরে, এ বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।

এতে বিপাকে পড়েছেন করপোরেশনের বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

অভিযোগ উঠেছে, করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি পক্ষ আরেকটি পক্ষকে ঘায়েল করতে ‘সিটি নির্বাচনকে’ কাজে লাগাচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে চসিকের কিছু কর্মকর্তাকে জড়িয়ে পত্রিকায় প্রেস রিলিজ পাঠানো হচ্ছে এবং এসব প্রেস রিলিজকে ভিত্তি করে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করা হচ্ছে করপোরেশনের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে।

জানা গেছে, গত ১৫ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার পক্ষ থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় বিবৃতি পাঠিয়ে চসিকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকুরী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়।

এতে চসিকের কিছু কর্মকর্তা বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলমকে ভোট দিতে অধঃস্তন কর্মচারীদেরকে অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

সংগঠনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম প্রেরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার সাথে সাথে চসিকের উপ-সচিব সাইফুদ্দিন মাহমুদ কাতেবী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আহমেদুল হক, প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা সাইফুদ্দিনসহ আরো কয়েক জন জোট বেঁধে মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনের ‘হাতি’ মার্কায় ভোট না দিতে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।’

চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এসব কর্মকর্তারা প্রধান কার্যালয়ে অফিস চলাকালীন সময়ে মনজুর আলমের পক্ষে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সিবিএ নেতৃবৃন্দ ও ঠিকাদারদের সাথে নিয়মিত বৈঠক করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

এদিকে গত ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের স্থানীয় একটি দৈনিকে বিবৃতিটি প্রকাশিত হলে এর কপি সংযুক্ত করে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার নেতারা।

এরপর একইদিন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন।

এরপর গত ১৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার বিবৃতিটির নিন্দা জানিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবাদ পাঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আহমেদুল হক, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন, তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইন এবং উপ-সচিব সাইফুদ্দীন কাতেবী।

এ বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদটিকে মিথ্যা, উদ্দেশ্যমূলক এবং ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, মেয়র প্রার্থীদের কাছে বিতর্কিত ও চক্ষুশূল করার হীন মানসে এই ধরনের মিথ্যা ও আজগুবি অভিযোগের সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রতিবাদপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরা কোন রাজনৈতিক দলের বা মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা বা কাউকে ভোট দেয়া না দেয়ার পক্ষে বলার প্রশ্নই উঠে না। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি বিধি-বিধান মেনেই অফিসে কাজ করছি। কোন প্রার্থীর সঙ্গে কোন ধরনের যোগাযোগ করছি না। অফিসের কাজে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগও বানোয়াট। প্রকাশিত সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মকর্তারা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্যই এই ধরনের মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

এদিকে এসব বিষয় নিয়ে রোববার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উচ্চ পদস্থ একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তবে তারা পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। নির্বাচনে কর্মকর্তাদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তারা বলেন, ‘নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দিতে কর্মচারীদেরকে যদি কর্মকর্তারা চাপ দেয় তাহলে বিষয়টি কর্মচারীরা অভিযোগ করতেন। এখানে তৃতীয় কোন কেউ অভিযোগ করায় বিষয়টার সত্যতা কতটুকু তা যে কেউ বুঝতে পারবে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাথে করপোরেশনের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যে অভিযোগটি করা হয়েছে সেটি অবাস্তব। ভোট প্রয়োগ করা হয় নির্দিষ্ট একটি কক্ষে, যেখানে একের অধিক অবস্থান করতে পারে না। এছাড়া একেক কর্মচারীর ভোট কেন্দ্র একেক এলাকায়। এখানে কে কাকে ভোট দিল না দিল, এসব বিষয় অন্য কেউ কিভাবে জানবে? সুতরাং কাউকে জোর করে ভোট দিতে বলার অভিযোগটি অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। এটা যে কেউ বুঝতে পারবে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আরেকজন কর্মকর্তা  বলেন, ‘একটি মহলকে খুশি করার জন্য অন্য আরেকটি মহল উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ এনেছে। এতে করপোরেশনের একটি অংশও জড়িত রয়েছে। মূলত পূর্বের দ্বন্ধকে কেন্দ্র করে কিছু কর্মকর্তাকে বেকায়দায় ফেলার জন্য সিবিএ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ গোপনে এসব কাজে যুক্ত রয়েছেন। আর একাজে তারা সাংস্কৃতিক জোটের মাধ্যমে ইসিকে ব্যবহার করেছে।’

এছাড়া চসিকের পদস্থ একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলামেইলকে বলেন, ‘অবাস্তব ও কোন সঠিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ সংক্রান্ত একটি বিবৃতি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ছাড়া কিভাবে দায়িত্বশীল একটি পত্রিকায় ছাপানো হল, তা আমার বোধগম্য নয়। এছাড়া কোন প্রকার নিজস্ব তদন্ত ছাড়া শুধুমাত্র প্রেস রিলিজ আকারে প্রকাশিত এই বিবৃতিকে আমলে নিয়ে ইসির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি ইস্যু করা দুঃখজনক।’

তবে নিজেদের করা অভিযোগে অটল থেকে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বাংলামেইলকে বলেন, ‘চসিকের যে সব কর্মকর্তা চাকুরী বিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী কাজে জড়িত রয়েছেন, তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে আমরা পত্রিকার ছাপানো প্রেস রিলিজসহ শুক্রবার নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনের ‘হাতি’ মার্কায় ভোট না দিতে বিভিন্নস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এদের মধ্যে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আখতার চৌধুরীসহ আরো বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে রোববার চিঠি দেয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাতেন  বলেন, ‘চসিকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শফিউল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য ইসির পক্ষ থেকে আমাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত শেষে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারব।’

মতামত