টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

নগরীতে ডিবির বেশ ধরে ছিনতাই চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম, ২০ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস):  গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম, নেম প্লেট, হাতে বেতার যন্ত্র, কোমরে কালো রঙয়ের বেল্ট, হ্যান্ড কাপ, মাথায় নেভী ব্লু রঙের ক্যাপ, পায়ে কালো রঙের সু। দেখে বুঝার উপায় নেই, যে এরা নকল পুলিশ। নগরীতে এভাবেই পুলিশের পোশাক পড়ে অভিনব কৌশলে ছিনতাই করে যাচ্ছিল ১০জনের একটি চক্র।

নগর পুলিশের কোতয়ালী জোনের সহকারি কমিশনার শাহ মুহাম্মদ আব্দুর রউফের নেতৃত্বে একটি টিম এই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি ও পুলিশের ইউনিফর্মসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামাদিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নগরীর পাহাড়তলী থানার সরাইপাড়া, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজারের মহেশখালী ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গত কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার ও ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিএমপি কমিশনার আব্দুল জলিল মণ্ডল এ তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা বিলার বাড়ির রশিদ আহাম্মদের ছেলে মো. খালেদ (৩০), কক্সবাজারের মহেশখালীর আলী হোসেন এর বাড়ির মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে মো. আলী হোসেন (৩৫) ও কুমিল্লার লাকসামের পোর্সকোর্ট হাজী বাড়ির মৃত মোসলেম মিয়ার ছেলে মো. জামাল হোসেন (৪০)।

এছাড়া চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতে এই চক্রের সদস্য আনিছ ও আব্দুল হক নামে আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

পুলিশ জানায়, ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা খালেদ হোসেনের বিরুদ্ধে নগরীর পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও সীতাকু- থানায় অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন আইনে চারটি মামলা রয়েছে।

তাদের কাছ থেকে জব্দকৃত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে- মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ব্যবহার করা তিনটি জ্যাকেট, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ব্যবহ্যার করা একটি জ্যাকেট, পিস্তল সদৃশ কালো রঙয়ের পিস্তল লাইটার, দুইটি বেতার যন্ত্র, বেতার যন্ত্রের একটি চার্জার, লোহার তৈরী একটি বেটন, বেতার যন্ত্রের কভার, পুলিশ লেখা চাবিসহ হ্যান্ড কাপ, পুলিশের মনোগ্রাম যুক্ত হ্যাংগিং ব্যাজ ও বাঁশি, সিএমপি পুলিশের এসআই পদমর্যাদার র‌্যাং ব্যাজ, নেম প্লেটসহ একসেট পোশাক, পুলিশের মনোগ্রাম যুক্ত একটি পি-ক্যাপ, পুলিশের ব্যবহার করা কোমড়ের কালো রঙয়ের কাপড়ের বেল্ট, তিন জোড়া জুতা, পুলিশের মনোগ্রাম যুক্ত একটি আইডি কার্ড ইত্যাদি।

এছাড়া ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করা একটি নোয়া মাইক্রোবাস ও একটি সিএনজি অটো রিকশাও জব্দ করা হয়েছে।

ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শাহ মুহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখলাম ছিনতাইকারী চত্রের তিনটি অংশ পৃথক পৃথক দায়িত্ব পালন করে একটি ছিনতাই কাজ সফলভাবে শেষ করে। একটি পক্ষ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা বহনকারীদের তথ্য প্রদান করে, আরেকটি পক্ষ পুলিশের অবস্থান রেকি করে তাদেরকে তথ্য দেয় এবং আরেকটি পক্ষ গাড়ি ম্যানেজ করে মূল কাজে অংশ নেয়।’

শাহ মুহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, ‘তৃতীয় গ্রুপের সদস্যরা সিএনজি অটোরিক্সায় এসে মাইক্রোবাসে উঠে যায়। এর মধ্যে তারা পুলিশের পোশাক গায়ে দিয়ে ওই সিএনজি অটোরিক্সা চলে যায় আগে থেকে নির্ধারিত স্থানে। টার্গেটকে ধরে মাইক্রোবাসে তোলার পর তাকে নিয়ে রওনা দেয়া হয় সিএনজি অটোরিক্সা রাখার স্থানে। এর মধ্যেই তার কাছ থেকে টাকাপয়সাসহ যা যা কেড়ে নিয়ে তাকে ফেলে দিয়ে মাইক্রোবাস ছেড়ে অটোরিক্সায় উঠে পালায় ছিনতাইকারীরা।’

তিনি আরো বলেন, ‘ছিনতাইকারীরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে এ পর্যন্ত তারা ১০০টিরও বেশি ছিনতাই করেছে। গত মাসে তারা বড় ধরনের দুইটি ঘটনা ঘটিয়েছে। এই চত্রের মূল হোতা খালেদ ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। তার ২০ লক্ষ টাকা এফডিআর আছে। এছাড়া ছিনতাইয়ের টাকায় ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছে সে। এছাড়া পুলিশ পরিচয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের এক ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ছিনতাইকারীদের দলনেতা খালেদ।’

পুলিশের ইউনিফর্ম এর কাপড় যে কোন জায়গায় পাওয়া যায় জানিয়ে আব্দুর রউফ বলেন, ‘ছিনতাইকারীদের একজনের আত্নীয় তাদেরকে পুলিশের ইউনিফর্ম বানিয়ে দিয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

গ্রেপ্তারকৃত আলী হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, গত ১এপ্রিল দেওয়ানবাজারে ছিনতাইয়ের পর তাকে ৪০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল। আগে তাকে প্রতিটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫হাজার টাকা দেওয়া হলেও এখন বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে সে ২০-২৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় অংশ নিয়েছি।’

ছিনতাইকারী চক্রের প্রধান খালেদ হোসেন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি পাথরের ব্যবসা করেন বলে জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘গত ১ এপ্রিল নগরীর সিরাজউদ্দৌল্লা রোডে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭ লক্ষ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পেয়ে আমাদেরও ষষ্ট ইন্দ্রিয় জাগ্রত হয়েছিল। ওই ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়ার সময় খালেদ নিজেকে এস আই মাহিদ পরিচয় দিয়েছিল ছিনতাইকারীদের একজন। এই নামে আমাদের একজন এসআইও আছেন। এতে আমরা দ্বিধায় পড়ে যাই। আমরা তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় নিশ্চিত হয়ে আমরা একটি টিম গঠন করে অভিযান শুরু করি। এরপর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের সাথে যুক্ত এই চক্রটিকে আমরা সনাক্ত করেছি। পাঁচজন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। আরও পাঁচজন সদস্য পলাতক আছে।’

তিনি বলেন, ‘নগরীতেএই চক্রটি পুলিশের ইউনিফর্ম, আইডি কার্ড ও পুলিশের পিস্তল সদৃশ পিস্তল লাইটার ব্যবহার করে ছিনতাই করে যাচ্ছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আসল। অন্যসব ফেইক।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে পঞ্চ ইন্দ্রিয় কাজ করলে, অপরাধীদের মধ্যে ষষ্ট ইন্দ্রিয় কাজ করে। তারা পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে এত চতুরভাবে এসব অপকর্ম করছে যে, সাধারণ মানুষ ভাবছে যে পুলিশই এসব করছে। কিন্তু আজকের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, সব অপকর্মের সাথে পুলিশ জড়িত না।’

তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পেয়ে আমি অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, অপরাধী যেই হোক তাকে ধর, পরে দেখা যাবে। পরে দেখা গেল, সৌভাগ্য আমাদের, ছিনতাইকারীদের কেউ আমাদের না। পুলিশের মধ্যে এই ধরনের খারাপ মানসিকতা কমে যাচ্ছে দিন দিন। ইনশাআল্লাহ আগামীতে আরো কমে যাবে। কিন্তু এই সব খারাপ লোকের কারণে মানুষ মনে করছে পুলিশই এসব খারাপ কাজগুলো করছে।’

এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কেউ যদি আপনার বাসায় যায়, তুলে আনতে চায়। তাহলে তার পরিচয় নিশ্চিত হবেন। এখনতো মোবাইলের যুগ, যে কারো মোবাইল আমরা রিসিভ করি। সিনিয়র অফিসারদের নাম্বারে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হবেন, আসলেই আমরা টিম পাঠিয়েছি কিনা। আমাদেরকে না জানিয়ে কোন টিম অপারেশনে যায় না।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত