টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

দাদনের জালে আবদ্ধ মিরসরাই উপকূলের জেলেদের জীবন

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি 

2012-08-13-18-18-23-502944ef89196-8চট্টগ্রাম, ১০  এপ্রিল (সিটিজি টাইমস): মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকার জেলে পরিবারগুলো দাদনের বোঝা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছেনা। গত বছর ইলিশের আকাল থাকায় মহাজনের দাদন খেলাপি রেখেই এ বছর নতুন করে দাদন নিতে হয়েছে জেলেদের। ফলে লাখ লাখ টাকার দাদনের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে উপকূলের প্রায় ৫ হাজার জেলে।

শাহেরখালী স্লুইসগেইট এলকার মৎস্য ব্যবসায়ী বাহার উদ্দিন জানান, ১০ বছর আগে ১৫ হাজার টাকার দাদন নিয়ে তার একটি বোট সাগরে নেমেছিল। এ বছরও তার ওই তিনটি বোট সাগরে যাচ্ছে, কিন্তু দাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের চাকা ঘোরার সঙ্গে দাদনের পরিমাণ বেড়েই চলছে। সুদিন আসবে Ñ প্রতি মৌসুমের শুরুতে এমনটি মনে হলেও সেদিন আর কোনো দিনই আসেনি।

বাহারের মতো মিরসরাই উপকূলের সব জেলের একই অবস্থা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার হাজার মাছ শিকারি জেলে রয়েছে। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা দ্বিগুণ। এদের মধ্যে ৩২ ভাগ সার্বক্ষণিক এবং ৬৮ ভাগ খন্ডকালীন ইলিশ আহরণে নিয়োজিত।

শাহেরখালী স্লইসগেইট এলকার শাহাব উদ্দিন জানান, সাগরগামী বড় বোট তৈরি করে জালসহ সাগরে যাওয়ার উপযোগী করতে ৩-৪ লাখ টাকা খরচ হয়। এমন একটি বোট সাগরে পাঠাতে ২০ জন মাঝি-মাল্লার প্রত্যেককে মালিকপক্ষ ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে থাকে। মালিকপক্ষ এই টাকার জোগান দিতে আড়তদার থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে থাকে। আড়তদার থেকে বোট মালিক এবং বোট মালিক থেকে মাঝি-মাল্লাদের এই অগ্রিম নেওয়া টাকাকেই জেলেরা দাদন বলে। মহাজনের তরফ থেকে নির্দিষ্ট সময় মেনে দাদন পরিশোধ করতে হবে Ñ এমন কোনো কড়াকড়ি নেই। দাদনের শর্ত হচ্ছে, দাদনভুক্ত বোটে ধরা মাছ দাদন প্রদানকারী মহাজনের আড়তের মাধ্যমে বিক্রি করতে হবে। বিক্রীত মাছের মূল্য থেকে মহাজন শতকরা পাঁচ থেকে আট টাকা হারে কমিশন কেটে নেবে। কমিশনের হার দাদনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়ে থাকে। বছরের পর বছর জেলেরা এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।

ক্ষুদিরাম জলদাশ, বিকাশ জলদাশ, ও সম্ভু জলদাশ জানান, সাগরে প্রত্যেক যাত্রায় অর্জিত লাভ থেকে আস্তে আস্তে জেলে, মাঝি ও বোট মালিকের দাদন কেটে দিয়ে কমাতে থাকে। এভাবে দিতে দিতে এক সময় দাদনের টাকা পরিশোধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দাদনের দায় পরিশোধ হয় না।

তারা আরো জানান, একটি বোট সাগরে যেতে ডিজেলসহ সোয়া লাখ টাকার বাজার নিতে হয়। ১০-১৫ দিন পর ঘাটে ফিরে আসার সময় কখনো কখনো খোরাকির মাছ নিয়ে আসতে পারে না। ফলে সাগরযাত্রার সোয়া লাখ টাকা খরচের দায় জেলেদের মাথায় বর্তায়। প্রাথমিক দাদনের সঙ্গে খরচটা নতুন দাদন হিসেবে যোগ হয়। এভাবে প্রতি ট্রিপে লোকসান দাদন হিসেবে গণ্য হতে থাকে। ফলে বাড়তে থাকে দায়। এভাবে জেলেরা দাদনের জালে বছরের পর বছর আবদ্ধ থাকে কি না Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে বোট মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, জেলেরা সাধারণত মহাজনের দাদন একসঙ্গে পরিশোধ করতে পারেন না। কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশামতো মাছ না পড়ায় জেলেদের খেয়েপরে বাঁচা দায় হয়ে যায়। ফলে দেনা পরিশোধ করার সুযোগ হয় না।

মতামত