টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আলীকদমে এমডিজি-২ প্রকল্পে হরিলুট : কাজ না করেই শতভাগ বাস্তবায়নের প্রতিবেদন!

 মমতাজ উদ্দিন আহমদ
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ০৭ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস):: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা পরিষদের এমডিজি-২ এর আওতায় গৃহীত প্রকল্পের সময়সীমা উত্তীর্ণ হলেও অনেক প্রকল্পের কাজই শুরু হয়নি। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অনুসরণ করা হয়নি ‘উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ব্যবহার নির্দেশিকা’। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই শতভাগ কাজের প্রতিবেদন দাখিল করে বরাদ্দকৃত অর্থ হরিলুট করার অভিযোগ উঠেছে।

বিলম্বে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল-এমডিজি-২ এর আওতায় আলীকদম উপজেলা পরিষদে গত ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ১৫ লক্ষ টাকার অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এসব অর্থ দিয়ে উপজেলার কয়েকটি সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ সংস্কার, বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণ, টয়লেট সংস্কার, পানির ফিল্টার ক্রয়, শৌচাগার নির্মাণ, ফ্লোর সংস্কার, হাই ও লো বেঞ্চ তৈরীর জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এমডিজি-২ এর আওতায় প্রাপ্ত অর্থে গৃহীত প্রকল্পসমুহ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের নভেম্বর ২০১৪ তে জারীকৃত ‘উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ব্যবহার নির্দেশিকা’ অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প কমিটি করা হয়েছে মনগড়া। নির্দেশিকায় যেখানে প্রকল্প কমিটি ৭-৯ জনের কথা রয়েছে সেখানে কমিটি করা হয় ৫ সদস্যের। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া প্রকল্প সভাপতি না করার নির্দেশনা থাকলেও এসব প্রকল্পে সভাপতি করা হয় সরকারী কর্মকর্তা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের।

জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী ফজল আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের জারী করা নির্দেশনামতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। তবে এসব প্রকল্প গ্রহণের সময়কাল এ উপজেলায় আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধুমাত্র ১নং প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে বলে জেনেছি। অন্যান্য প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়নি। তাই কাজ শেষে উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে যে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা ছিল আমি তাতে স্বাক্ষর করিনি। তিনি আরো বলেন, এমডিজি-২ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কোন কাগজপত্রও এ পর্যন্ত আমার দপ্তরে কোন মহল দেয়নি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গতমাসে এসব প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে মর্মে ইউএনডিপিতে উপজেলা পরিষদ থেকে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এমডিজি-২ খাতে প্রাপ্ত ১৫ লক্ষ টাকা দিয়ে আলীকদম উপজেলা পরিষদ গতবছর ৪টি প্রকল্প গ্রহণ করে। একেকটি প্রকল্পের মধ্যে ২ থেকে ৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্প বরাদ্দ দেখানো হয়।

গৃহীত প্রকল্পের ১নং ক্রমিকে রয়েছে ৩টি প্রকল্প; যথাক্রমে- ৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১টি করে পানির ফিল্টার সরবরাহ ২ লক্ষ টাকা, ৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২টি ডিসপ্লে বোর্ড ও ১টি আয়না সরবরাহ ৬০ হাজার টাকা এবং ৬৭ জোড়া হাই ও লো-বেঞ্চ সরবরাহ ২ লক্ষ ১৫ হাজার ৫২৪ টাকা। এই একটি প্রকল্পে সর্বমোট বরাদ্দ দেখানো হয় ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার, ৫২৪ টাকা।

এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের নভেম্বর ২০১৪ তে জারী করা ‘উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ব্যবহার নির্দেশিকা’ অনুসরণ করা হয়নি। এ নির্দেশিকার ১১ পৃষ্ঠার ৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়, ২,০০,০০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা মূল্যমানের অধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা পরিষদ অনুমোদিত প্রাক্কলন অনুযায়ী উপজেলা প্রকৌশলী উপজেলা পরিষদ (চুক্তি) বিধিমালা এবং পিপিএ ও পিপিআর অনুসরণে দরপত্র আহ্বান করবেন। ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য তিনি প্রাপ্ত দরপত্রসমুহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তুলনামূলক বিবরণ দরপত্র মূল্যয়ন কমিটির সভায় পেশ করবেন।

এ নির্দেশিকার ১২ পৃষ্ঠার ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ২,০০,০০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের প্রকল্পসমুহ প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে। এ নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২ লক্ষ টাকার অধিক মূল্যের ৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে ‘দরপত্র আহ্বান’ ছাড়াই।

১০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রকল্প কমিটির চেয়ারম্যান হবেন স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’। এ অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটিযে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই ৩টিতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও একটিতে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ‘প্রকল্প সভাপতি’ করা হয়েছে।
আলীকদমে এমডিজি-২ এর দুই নম্বর প্রকল্প হচ্ছে ‘নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউ-ারী ওয়াল নির্মাণ ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ও নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট ২ লক্ষ টাকা। সম্প্রতি এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পার হয়েছে। মাঠটিও সমতল রয়েছে। এ স্কুলের সমতল মাঠ ভরাটে ২ লক্ষ টাকার প্রকল্প গ্রহণও প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন এলাকার সচেতন মহল।

এ প্রকল্পের সভাপতি প্রধান শিক্ষক ফোরকানারা বেগম (জ্যোৎ¯œা) জানান, ‘আমাকে কেন প্রকল্প সভাপতি করা হয়েছে জানি না। জানুয়ারী মাসে ১ম কিস্তির টাকা উত্তোলনের পর উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রকল্প কমিটির সদস্য সচিব শফিউল আলমকে দেড় লক্ষ ১ লক্ষ টাকা প্রদান করেছি। তবে শফিউল আলম টাকা গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, এ বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যানই ভাল বলতে পারবেন’।

অপরদিকে, তিন নম্বর প্রকল্পভূক্ত চম্পট পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়রা বেগম বলেন, ১ম কিস্তিতে ২ লক্ষ টাকা উত্তোলনের পর উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রকল্পের সদস্য সচিব আবু বক্করকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেছি। পরে উপজেলা চেয়ারম্যান নিজে ৫০ হাজার টাকা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অনেক মানসিক কষ্টের পর টাকা প্রদান করেছি। তবে এ ব্যাপারে এসএমসির সভাপতি ফজলুকে অবহিত করে রেখেছি।

এ প্রকল্পের আওতায় মেনকিউ মেনকক পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টয়লেট সংস্কারে বরাদ্দ থাকলেও গত বুধবার সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার রেংরই মুরুং জানান, টয়লেট সংস্কারের কোন কাজ এ বিদ্যালয়ে হয়নি। এ প্রকল্পের বিষয়ে তিনি জানেন না।

একইভাবে ৪নং প্রকল্পভূক্ত রোয়াম্ভু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, রেপারপাড়া কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শৌচাগার নির্মাণে ৪৫ হাজার টাকা ও ডুপ্রু ঝিরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফ্লোর সংস্কারে ৪০ হাজার টাকা সর্বমোট ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। এ প্রকল্পের সভাপতি প্রধান শিক্ষক অঞ্জলী রানী শীল বুধবার বিকেলে জানান, প্রথম কিস্তিতে আমাকে ১ লক্ষ ৫০ টাকা ব্যাংক থেকে তোলার পর উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে জনৈক ঠিকাদার শফি আলম টাকা নিয়ে গেছে। অপর এক প্রশ্নর জবাবে তিনি বলেন, তার স্কুলে আনুমানিক ৪৪/৪৫ হাজার টাকার মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠিত কমিটির সদস্য পিসি আবুল কাসেম বলেন, আমাকে এ কমিটিতে সদস্য করার বিষয়টি জানতাম না। জানার পর খোঁজ খবর নিয়েছি। প্রকল্পে আমার এলাকার দুইটি স্কুলের নামে বরাদ্দ থাকলেও এ পর্যন্ত কোন কাজ হয়নি।

একই অভিযোগ করেন, প্রকল্পভূক্ত রেপারপাড়া কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রুবেল ও ডুপ্রু ঝিরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাইগ্যা মার্মা। তাঁরা বলেন, শুনেছি বিদ্যালয়ের নামে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কেউ প্রকল্পের কাজ করতে আসেনি’।
আলীকদম উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান কাইনথপ ¤্রাে জানান, ‘ভাইস চেয়ারম্যানরা উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় আমাদেরকে বলা হয় না। এসব প্রকল্পের বেলায়ও তাই ঘটেছে’।
ইউএনডিপি’র বান্দরবান ডিস্ট্রিক্ট গভর্নেন্স অফিসার (ডিজিও) চারু বিকাশ ত্রিপুরা জানান, এ প্রকল্পের মেয়াদ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ছিল। মেয়াদ শেষে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদন দিতে হয়। তবে প্রতিবেদন দিলেই কাজ শেষ না। ফিজিক্যালি দেখা হবে কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা দেখবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদের ম্যানুয়েল মতে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হওয়া কথা। এলাকার লোকজন সচেতন হলে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ কেউ না করে পারবেনা। শীঘ্রই তিনি এসব প্রকল্প পরিদর্শন ও উপজেলা পর্যায়ে অবহিতকরণ সভা আহ্বানের ব্যবস্থা করবেন।

মতামত